ঢাকা, শুক্রবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২২ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-০১ ১১:৩২:৫৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-০১ ১১:৩২:৫৯ এএম

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন পয়লা মে। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের সংহতির দিন। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দেন এ দিনে।। আগে শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা ছিল না। তারা দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতেন। মালিকপক্ষের ইচ্ছানুযায়ী নামমাত্র মজুরিতে তারা কাজ করতে বাধ্য হতেন। তখন দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন শ্রমিকরা। তাদের সমাবেশে পুলিশ গুলি চালিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। গুলিতে মারা গিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু তাতে শ্রমিকদের আন্দোলন থেমে যায়নি। 

শেষ পর্যন্ত আট ঘণ্টা শ্রমসময়ের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল কর্তৃপক্ষ। শুধু তাই নয়, ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক ঐক্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই থেকে সারা দুনিয়ার শ্রমিক সমাজ আজকের দিনটিকে পরম শ্রদ্ধাভরে পালন করে আসছে। নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টার সঙ্গে পরে বেতন বৈষম্য দূর করা, ন্যূনতম মজুরি, নিয়োগপত্র প্রদানের মতো বিষয়ও শ্রমিকদের জোরালো দাবিতে পরিণত হয়। উন্নত দেশে এখন শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি কাজের পরিবেশও হয়েছে উন্নত। তাই মে দিবস শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তবে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশা পুরোপুরি ঘোচেনি।

বাংলাদেশে বর্তমানে শ্রমবাজারের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দেয়া হয়েছে। তবে বাস্তব অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টসহ সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দোষী ব্যক্তিদের বিচার এখনো হয়নি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকার মতো দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার দিকেও আমাদের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

বিশ্বে মানবসভ্যতা গড়ে উঠেছে মানুষের শ্রমের বিনিময়ে। এক্ষেত্রে এক পক্ষের দিক নির্দেশনায় অপর পক্ষের কায়িক শ্রমে গড়ে ওঠে শিল্প, উৎপাদিত হয নানা সামগ্রী। শ্রমিক ছাড়া উৎপাদন হতে পারে না। আবার শ্রমিকের আয়-রোজগারেরও উৎস তাদের এই শ্রম। মালিকরা শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মুনাফা ও আয়-উপার্জনের জন্য। কিন্তু শ্রমিক ছাড়া কারখানা অচল। তাই শ্রমিক-মালিক স্ব-স্ব স্বার্থে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক যত উন্নত ও দৃঢ় থাকবে, উৎপাদনও তত ভাল হবে। এতে উভয় পক্ষেরই লাভ। শিল্প-কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন চালু থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ে, অর্থনীতি গতিশীলতা লাভ করে।

কিন্তু মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক ভাল না হলে কোনো পক্ষের জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না। তাই যে কোনো কাজ বা শ্রমের মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন।  সমাজের অন্যান্য পেশার মানুষের মতো শ্রমিকদের একটি মর্যাদাসম্পন্ন শ্রেণি হিসেবেই দেখা উচিত আমাদের। আর নারী-পুরুষ কোনো ভেদাভেদ করা যাবে না। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, শ্রমিক স্বার্থসংরক্ষণ ব্যতীত যেমন শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়, তেমনি অহেতুক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা শিল্পের ক্ষতিসাধন শ্রমিকের ভাগ্য বিড়ম্বনা বাড়ায়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মানবিক সুযোগ-সুবিধা, কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকদের দায়িত্ব। আর শ্রমিকদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে, সততার সঙ্গে শ্রম দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা।

মে দিবস পালন তখনই সার্থক হবে, যখন শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মস্থলের নিশ্চয়তা পাবেন। মহান মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে। মহান মে দিবসে সব শ্রমজীবী মানুষের প্রতি রইল আমাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। তাদের সবার জীবন আরো সুন্দর ও আনন্দময় হোক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ মে ২০১৯/আলী নওশের

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন