ঢাকা, রবিবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘কেউ ফোন করে সমবেদনাও জানায়নি’

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০৭ ৫:১৩:৩৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-১১ ৬:০৮:১৭ পিএম
‘কেউ ফোন করে সমবেদনাও জানায়নি’
খলিল উল্লাহ খান ও মুসা খান

রাহাত সাইফুল : ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা খলিল উল্লাহ খান। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় রুপালি জগৎ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। অভিনয় ক্যারিয়ারে ছোটপর্দার পাশাপাশি বড়পর্দায় আট শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। পেয়েছেন নানা সম্মাননা।

জীবদ্দশায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন অভিনেতা খলিল। ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। আজ তার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। দিনটিতে পরিবার ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।

রাইজিংবিডির এই প্রতিবেদক কথা বলেন খলিল উল্লাহ খানের মেজ ছেলে মুসা খানের সঙ্গে। আলাপচারিতায় তিনি তার বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ ও চলচ্চিত্র অঙ্গনের মানুষদের নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। রাইজিংবিডি পাঠকদের জন্য আলাপচারিতার বিশেষ অংশ তুলে ধরা হলো।

রাইজিংবিডি : বাবাকে নিয়ে আপনার স্মৃতিচারণ…
মুসা খান : বাবার মৃত্যুর চার বছর পর আপনার ফোন কল পেয়ে আমার চোখে পানি চলে এসেছে (স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে)। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি-বাবা গম্ভীর একজন মানুষ। তার কড়া শাসনে আমরা পাঁচ ভাই বড় হয়েছি। আমাদের সবচেয়ে ছোট ভাইটা মারা যায় ১৯৯৩ সালের ৩ মে। বাবার সামনে তার সন্তান মারা যাওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে আমরা কখনো আন্তরিকভাবে মিশতে পারিনি। আমরা ভাই-বোনরা তাকে ভয় ও শ্রদ্ধা করতাম। এভাবেই আমরা বড় হয়েছি।

২০১৩ সালে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। ১৩-১৪ দিন পরে আমরা আশা ফিরে পেলাম বাবা হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন। এরপর বাবা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেও আসলেন। তারপর দশ-এগার মাস বাবা বেঁচে ছিলেন। ২০১৪ সালের ৩ মে বাবা আজীবন সম্মাননা পেয়েছিলেন। বাবার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনটাতেই সন্ধ্যাবেলায় আমার বড় ভাইটা মারা গিয়েছিলেন। সেই দিন থেকেই বাবা দুই ছেলের দুঃখের ঘানি টানা শুরু করেন। আমাদের সঙ্গে তিনি নানা স্মৃতিচারণ করতেন। আমি তখন সব ভয় ভীতি ছেড়ে বাবার খুব ক্লোজ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সময় বাবা তার চাকরি ও শুটিং জীবনের অনেক কথাই বলেছেন। বাবার সঙ্গে যখন মিশতাম তখন দেখতাম তার সব রাগ নকল, তার গম্ভীরতা সব মিথ্যে। দেখলাম তিনি তার ছেলে মেয়েদের এত ভালোবাসতেন তা বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের ভালোর জন্য, লেখাপড়া করানোর জন্য এই শাসন করতেন। আমার বাবা একজন গ্রেট বাবা।

খলিল উল্লাহ খানের সঙ্গে মেজ ছেলে মুসা খান


আমি দেখেছি, বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিস এবং সন্ধ্যায় টিভিতে চলে যেতেন। সেখান থেকে ফিরে রাতে ঘুমাতেন। এভাবেই তিনি ব্যস্ত সময় পার করতেন। সারাদিন তিনি কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটাতেন। ভাইবোনদের বেঁচে থাকার জন্য এই কষ্টটা করতেন। শেষদিকে এসে দেখতাম তিনি একজন ভালো বাবা, ভালো অভিভাবক। তার মৃত্যুতে আমাদের পরিবারের একটা ছায়া হারিয়েছি।

রাইজিংবিডি : আপনার বাবা অসুস্থ থাকা অবস্থায় চলচ্চিত্রের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতেন?
মুসা খান : বাবার কোনো সমস্যা হলে প্রথমেই আমি আলমগীর আঙ্কেলকে (চিত্রনায়ক আলমগীর) ফোন করতাম। তিনিই একমাত্র আমার ফোনে উত্তর দিতেন এবং ঘটনাস্থলে চলে আসতেন। সব সময় তাকে পেয়েছি।

রাইজিংবিডি : চলচ্চিত্রাঙ্গনের মানুষদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আছে কি?
মুসা খান : বাবা অসুস্থ অবস্থাতেই যোগাযোগ খুব একটা ছিল না। শুধু সাংবাদিকরাই খোঁজ নিয়েছেন। রাজ্জাক আঙ্কেল (নায়করাজ রাজ্জাক), আলমগীর আঙ্কেলসহ কয়েকজন সিনিয়র শিল্পীরা খোঁজ নিতেন। আর কেউ আমাদের খোঁজ নিতেন না। বাবা অসুস্থ অবস্থায় মৌসুমী (চিত্রনায়িকা) এসেছিলেন। এছাড়া মিশা সওদাগর (খল অভিনেতা) একবার বাবাকে দেখতে এসে শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। তখন আমরা নিইনি। বলেছিলাম, এখন নিব না পরে প্রয়োজন হলে নিব। পরে বাবার কাছে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। এর পরেই তাদের দায়িত্ব শেষ। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো-ছেলে হিসেবে বাবা আমাকে বলে গিয়েছিলেন এফডিসিতে তার মরদেহ না নেয়ার জন্য। তারপরও আমি বাবার অভিমানের কথা না ভেবে তার লাশ এফডিসিতে নিয়ে গেলাম। কিন্তু সেখানে সিনিয়র কয়েকজন শিল্পী বাদে অন্যরা কেউ তাকে শেষবার দেখতে আসেনি। রাজ্জাক আঙ্কেল, আলমগীর আঙ্কেলসহ কিছু সিনিয়র শিল্পী ছিলেন। অনেকেই ছিলেন না। অনেক শিল্পীকেই আমরা পাইনি। আমি নাম বলব না। এটা অনেক দুঃখজনক। কেউ ফোন করে সমবেদনাও জানায়নি। আজ পর্যন্ত এফডিসির পক্ষ থেকে ‘কেমন আছেন’ এই শব্দটা পাইনি (আবার কান্না)। কেউ আমাদের খোঁজ নেন না। তার মৃত্যু দিবসে তারা কিছু করেন কিনা সেটাও আমরা জানি না।

রাইজিংবিডি : এবার শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
মুসা খান : এটা ভালো। আমরা এসব জানি না।

রাইজিংবিডি : পরিবারের পক্ষ থেকে আজ আপনারা তাকে কীভাবে স্মরণ করছেন?
মুসা খান : আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া এতিম খানায় খাবার বিতরণ করেছি।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ ডিসেম্বর ২০১৮/রাহাত/মারুফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন