ঢাকা, শনিবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘‘আবদুস’ বাদ দিয়ে ‘টেলি সামাদ’ রাখতে চাই’’

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-০৬ ৫:০৫:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-০৯ ৬:০০:৪২ পিএম
‘‘আবদুস’ বাদ দিয়ে ‘টেলি সামাদ’ রাখতে চাই’’

অভিনয়শিল্পী টেলি সামাদ। ‘কৌতুক অভিনেতা’ হিসেবেই যার ব্যাপক পরিচিতি। শুধু অভিনয় নয়, গান ও ছবি আঁকাতেও ছিল তার সমান পারদর্শিতা। ১৯৭৩ সালে নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘কার বৌ’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।   নানা অসুখে ভুগছিলেন বরেণ্য এই অভিনেতা। সম্প্রতি স্কয়ার হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ তিনি মারা যান। ২০১৫ সালের ২৭ মে রাইজিংবিডিতে টেলি সামাদের এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। মৃত্যুদিনে তাকে স্মরণ করে সাক্ষাৎকারটি পুনরায় প্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহাত সাইফুল

রাইজিংবিডি : শুনেছি প্রধানমন্ত্রী আপনাকে অভিনয়ে ফিরতে বলেছেন। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
টেলি সামাদ :
প্রধানমন্ত্রী যখন আমাকে অভিনয়ে ফিরতে বললেন, তখন আমি ম্যাডামকে প্রথমে বলেছি, ‘আমি আর অভিনয় করব না।’ তখন ম্যাডাম বললেন, ‘আমি চীন মৈত্রীতে তোমার অভিনয় দেখে হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছিলাম। কী সুন্দর তোমার অভিনয়। তুমি শিগগির আবার অভিনয় শুরু করো।’ আমি তখন বলছি, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম আমি অভিনয়ে ফিরব।’

 



রাইজিংবিডি : বাংলা চলচ্চিত্রে কমেডিয়ান অভিনেতা তৈরি হচ্ছে না কেন?
টেলি সামাদ :
নতুন অনেকে বলে আমি টেলি সামাদের মতো হবো, অথবা অন্য কারো মতো হবো- এটা ঠিক না। কারো মতো হতে চাইলে কিছুই হওয়া যাবে না। নিজের মতো হতে হবে। নতুন কিছু সৃষ্টি করতে হবে।

রাইজিংবিডি : মানুষকে হাসাতে কোন বিষয়টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
টেলি সামাদ :
মানুষকে কথা দিয়ে হাসাতে হবে। কথা দিয়ে হাসাতে না পারলে অঙ্গভঙ্গি দিয়ে হাসানো যায় না। মানুষের মনের মধ্যে ঢুকতে হবে। মানুষ পর্দায় দেখলেই যেন কথা শোনার জন্য মনোযোগ দেয়। তাহলেই মানুষকে হাসাতে পারবেন।

রাইজিংবিডি : আপনি কেন কমেডিয়ান অভিনেতা হলেন, অন্য কিছু তো হতে পারতেন?
টেলি সামাদ :
আমার যখন বয়স কম ছিল, তখন আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছে, তুই কি নায়ক হবি? আমি সব সময় বলেছি, আমি হিরো হবো না, আমি হবো কমেডিয়ান অভিনেতা। কারণ একজন কমেডিয়ান অভিনেতা যদি একবার মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারে, তাহলে আর তার মন থেকে বের হয় না। একজন নায়ককে সবাই পছন্দ করে না। কারো ভালো লাগে, আবার কারো ভালো লাগে না। কিন্তু একজন কমেডিয়ানের কোনো ভাগ নেই, সবাই তাকে পছন্দ করেন। তার কথায় সবাই হাসেন।

 



রাইজিংবিডি : আপনাকে তো কয়েকটি সিনেমায় নায়কের চরিত্রে দেখা গেছে?
টেলি সামাদ :
কাজী হায়াৎ আমাকে নায়ক বানানোর জন্য অনেকবার বাসায় এসেছেন। আমি রাজি হইনি। শেষ পর্যন্ত আমাকে দিয়ে যেন কাজ না করায় এ জন্য আমি টাকা বেশি চেয়েছি। কিন্তু কাজী হায়াৎ তাতেও রাজি হয়ে গেছেন। এরপর ‘দিলদার আলী’ সিনেমায় কাজ করি। এতে আমার বিপরীতে নায়িকা ছিলেন জুলিয়া।  সিনেমাটি হিটও হয়েছিল। এরপর আরো তিনটি সিনেমায় কাজ করি।

রাইজিংবিডি : আপনাদের সময় চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ ছিল। এরপর চলচ্চিত্রের অনেক খারাপ একটা অবস্থা তৈরি হয়। এখনো বাংলা চলচ্চিত্র সেই স্বর্ণযুগে ফিরে যেতে পারেনি। এর কারণ কী?
টেলি সামাদ :
আমি দেখেছি কাজী জহির সাহেব, মোস্তাফিজ সাহেব, মোস্তাফা মাহমুদের মতো বিখ্যাত পরিচালকেরা একটা গল্প লিখতে ভাবতেন। তারা সময় নিতেন ছয় মাস-একবছর পর্যন্ত। বারবার রিভাইস দিতেন। যেমন কাজী ভাই আমাকে ডাকতো। বলতো- এই সিকোয়েন্সটা কেমন হয়েছে? টেলি এবার তুই তোর মতো করে বল। আমি আবার আমার মতো বলতাম। এভাবে একটি সিনেমার সিকোয়েন্স করা হতো। এখন এ সব কিছুই করা হয় না। এক মাস থেকে দেড় মাসে সিনেমার গল্প লেখা, এমনকি শ্যুটিং শেষ করে ফেলে। এভাবে হলে কীভাবে ভালো কিছু নির্মাণ হবে?

রাইজিংবিডি : এখন যে সব সিনেমা নির্মাণ হচ্ছে- এদের অধিকাংশ মান ভালো হচ্ছে না কেন?
টেলি সামাদ :
যেসব সিনেমার মান ভালো হচ্ছে না, সেসব সিনেমার গল্পে যে রকম অভিনয়শিল্পী প্রয়োজন, সে রকম শিল্পীদের নেওয়া হচ্ছে না। কম পয়সার যে সব শিল্পী পাওয়া যায় এবং পরিচালক ও প্রযোজকের কাছের লোকদেরকে নেওয়া হয়। যারা অভিনয় জানে না।  এখন সিনেমা নির্মাণ করতে ক্যামেরা স্ট্যার্ট, ওকে, এভাবেই সিনেমা নির্মাণ করা হয়। একটা শট একবারেই টেক করে ফেলে। আগের নাম করা নির্মাতারা একটা শট ৫০ বার নিয়েছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত পরিচালকের মনের মতো না হবে, ততক্ষণ শট নেবেন। তাদের সিনেমা কেন হিট হবে না? তখন টাকার দিকে তাকায়নি। ভালো কিছু নির্মাণ করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। স্ক্রিপটে ডায়লগ নেই, কিন্তু আমরা অনেক সময় সেখানেও ডায়লগ দিয়েছি। তাও অনেক সুন্দর হয়েছে।

 



রাইজিংবিডি : এমন দু-একটা ঘটনা শুনতে চাই।
টেলি সামাদ :
১৯৭৫ কাজী জহির বাবু ভাই ‘অবাক পৃথিবী’ সিনেমা নির্মাণ করেন। এতে রাজ্জাক ভাই, কবরী ছিলেন। শট চলছে। আমি আর রাজ্জাক ভাই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছি। এ সময় পাহাড়ি কয়েকটা মেয়ে আমাদের সামনে বল্লম ফেলে। তাদের হাতে তীর ছিল। তীর আমাদের পিঠে লাগিয়ে ঠেলে ঠেলে বলতেছে আগে যা। এ সময় আমার কোনো ডায়লগ ছিল না। কিন্তু আমি তখন ডায়লগ দিলাম- ‘পাহাড়ি বৈনেরা গো তীর দিয়ে না খোচাইয়া শরীর দিয়ে খোচালে হয় না’। আমার ডায়লগ শুনে কাজী ভাই, রাজ্জাক ভাই দুজনই খুব প্রশংসা করেন।

রাইজিংবিডি : আপনার নামের পূর্বে টেলি উপাদিটা কেন দেওয়া হয়েছে এবং কে দিয়েছেন?
টেলি সামাদ :
একদিন সকাল ১০টায় আমাকে বিটিভি থেকে টেলিফোন করে ডাকলেন। বিটিভি অফিসে যাওয়ার পর বিটিভির জি এম, পরিচালকসহ টেলিভিশনের বেশ কয়েকজন আমাকে নিয়ে বসলেন। তারা আমাকে বললেন, তোমার বাবা তোমার নাম রেখেছেন আবদুস সামাদ। ‘আবদুস’ টাকে বাদ দিয়ে ‘টেলি সামাদ’ রাখতে চাই। এই টাইটেল তুমি ছাড়া আর কাউকে দিতে পারি না। তুমিই এই নামের যোগ্য। তোমার ভিতরে এ রকম ট্যালেন্ট আছে।

রাইজিংবিডি : আপনার জীবনে সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি কী বলে আপনি মনে করেন?
টেলি সামাদ :
বাংলাদেশের যেখানেই যাই, সেখানেই আমার নাম শুনলে আলাদা সম্মান পাই। এটাই আমার জীবনের বড় পাওয়া। তা ছাড়া অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছি।

 



রাইজংবিডি : নতুন যে সব অভিনয় শিল্পীরা আসছেন, তাদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
টেলি সামাদ :
এখন অনেক নতুন নতুন নায়ক নায়িকারা আসছেন। যারা নাচ, অভিনয় ভালো জানে না। সেই সময়ের কবরী, রাজ্জাক, শাবানা তাদের অভিনয়, নৃত্য দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন। এরা কত সুন্দর অভিনয় করতেন, কতটা চমৎকার নাচ করতেন, যা দেখলেই অনেক ভালো লাগে।

রাইজিংবিডি : বয়সের এ পর্যায়ে এসে আপনার কী এমন কোনো ইচ্ছে আছে, যা পূরণ হয়নি?
টেলি সামাদ :
আমার তিনটি ইচ্ছে আছে। অনেক আগে গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। আমার খুব ইচ্ছে টেলিভিশনে আবার গান করার। নিজের গানের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের জনপ্রিয় শিল্পীদের গানগুলো করব। একটি সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করব। এ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শককে বিস্মিত করতে চাই। এ ছাড়া আত্মজীবনীমূলক একটি বই লিখব।

রাইজিংবিডি : এখন তো আপনার অনেক বয়স। এ অবস্থায় আপনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে পারবেন?
টেলি সামাদ :
সিনেমাটির গল্প এমনভাবে লেখা হবে, যে আপনি দেখলে বুঝতে পারবেন এ সিনেমায় নায়কের চরিত্রে টেলি সামাদকেই দরকার। এ সিনেমার গল্প আমি লিখব। এতে আমার বিপরীতে কম বয়সি রোমান্টিক নায়িকা থাকবে।

 



রাইজিংবিডি: আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
টেলি সামাদ :
আপনাদেরও ধন্যবাদ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ এপ্রিল ২০১৯/রাহাত/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন