ঢাকা, সোমবার, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২২ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ডিএসএলআর তাদের একমাত্র পুঁজি

খায়রুল বাশার আশিক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০১ ৫:৫১:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-০২ ৭:৫৯:৪৯ এএম
ডিএসএলআর তাদের একমাত্র পুঁজি
Voice Control HD Smart LED

খায়রুল বাশার আশিক : প্রতিদিন সকাল হলেই তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে ক্যামেরা হাতে হলুদ পোশাকে দেখা যায় একদল ভ্রাম্যমাণ মানুষকে। এরা ছবি কারিগর বা ফটোগ্রাফার। পর্যটকদের স্মৃতির সাক্ষী হতে তারা ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। আনন্দদায়ক সৈকত ভ্রমণকে স্মৃতিময় করে রাখতে এরা ক্যামেরায় হাত চালায়।

পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মাদক নির্মূল, সৈকত রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যটকদের দেখাশুনা করে সৈকতের অঘোষিত রক্ষক হিসেবে কাজ করে কুয়াকাটার ফটোগ্রাফার পেশাজীবিরা। তারা বলছেন, জীবিকার প্রয়োজনে এ কাজে এলেও এই সৈকত তাদের কাছে এখন জীবন।

কুয়াকাটাতে ফটোগ্রাফি একটি জীবিকার নাম। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে আগত পর্যটকদের ছবি তুলে প্রতিদিন জীবিকা নির্বাহ করে শতাধিক ফটোগ্রাফার। এমনকি শিক্ষিত অনেক বেকাররাও বেছে নিয়েছে এই পেশা। সাগরকন্যা কুয়াকাটায় বর্তমানে নিবন্ধিত ফটোগ্রাফার আছেন ১১০ জন। এদের অধিকাংশই কুয়াকাটার স্থানীয় তরুণ। রয়েছে বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মের সন্ধানে আসা ফটোগ্রাফার। তবে পার্শবর্তী বা দূরবর্তী এলাকা থেকে আগত পেশাদার ফটোগ্রাফারদের সংখ্যা খুব কম। পেশাদারিত্বের প্রয়োজনে তারা সৃষ্টি করে নিয়েছে তাদের কর্ম পরিবেশ।
 


ফটোগ্রাফারদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় গঠন করা হয়েছে সমিতি। রয়েছে একটি ফটোগ্রাফারদের কমিটিও। সেই কমিটিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় সভাপতি ও সম্পাদক। এছাড়াও কমিটিতে আছে অসংখ্য পদ পদবী। শৃঙ্খলার মাধ্যমে পেশাদারিত্বের উন্নয়নের লক্ষেই এত সব কিছুর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন এই ছবির কারিগররা।

একই ধরনের কাজের কারণেই একে অন্যের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে তারা। পারস্পরিক সহমর্মিতা আর একে অন্যের জীবনবোধে প্রভাবিত হয় একসময়। সৃষ্টি হয় বন্ধুত্ব। আবার বন্ধুত্ব থেকে আত্বীয়তে পরিণত হবার গল্পও আছে এদের জীবনে। ক্যামেরা চালানোর দক্ষতা অনুযায়ী এরা একে অপরের শিক্ষক হয়ে ওঠে। এরা সবাই সবার বন্ধু, এরাই এদের হাসি কান্নায় সাক্ষী।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে গল্পছলে পেশাদারিত্বে বন্ধুত্বের অনুভূতি জানালেন ফটোগ্রাফার হাবিব। অনেককে তিনি আসতে দেখেছেন এ পেশায়। আবার সময়ভেদে তারা অনেকেই চলে গেছেন পেশা পরিবর্তন করে। আবার নতুন কাউকে তার পাশে পেয়েছেন ফটোগ্রাফার নামক একই পেশাজীবি হিসেবে। এমন আসা-যাওয়া বা কাজের সুবাদের পরিচিত হবার মাধ্যমে এই পেশাজীবিদের অনেকের সঙ্গেই তৈরি হয়েছে বন্ধুত্ব। সেসব বন্ধুরাই জীবনের একটি অংশ হয়ে লেগে আছে জীবনের সঙ্গে।
 


এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মো. আলো, মো. আয়নাল, আবু হানিফ, আলমাস খান, সম্রাট সহ আরো কয়েকজন ফটোগ্রাফারের। কুয়াকাটার এই ছবি কারিগররা জানালেন, এখানে ছবি তোলার নিয়ম ও রেট নির্দিষ্ট করাই আছে। প্রত্যেক ফটোগ্রাফারকে এসব নিয়ম মেনে চলতে হয়, নিয়ম না মানলে সমিতির নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা গুনতে হয়। তারা আরো জানান, আগত দর্শনার্থীর অনুমতি ক্রমে অসংখ্য ছবি ক্যামেরায় তোলা হলেও তা থেকে গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী ছবি ডেলিভারি নেবার সুযোগ আছে। উদাহরণস্বরূপ একজন গ্রাহকের ১০০ ছবি তোলার পর তা থেকে যদি মাত্র ২০টি ছবি পছন্দ হয় তবে সেই ২০টি ছবিই গ্রাহক নিতে পারবে। এজন্য ২০টি ছবির ধার্যকৃত টাকা প্রদান করতে হবে ফটোগ্রাফারকে। গ্রাহকের পছন্দ না হওয়া বাকি ৮০টি ছবির জন্য কোনোরূপ টাকা দিতে হবে না। গ্রাহক যদি ছবি প্রিন্ট করে নেয় তাহলে প্রতিটি ছবির জন্য দিতে হবে ২৫ টাকা। আর প্রিন্ট না করে শুধুমাত্র মেমোরি কার্ড বা পেনড্রাইভে ছবি নিলে প্রতিটি ছবির জন্য দিতে হয় ১০ টাকা করে। এই নির্ধারিত দামের বেশি কিনবা কম রাখার কোনো সুযোগ নেই।

নাইকন বা ক্যাননের একটি ডিএসএলআর এদের একমাত্র পুঁজি। এই পুঁজিকে কাজে খাটিয়ে তারা প্রতিদিন সংগ্রহ করে তাদের জীবিকা। একটি ক্যামেরাকে বুকে জড়িয়ে ভালো একটু রোজগারের আশার এদের প্রতিটি দিন কাটে। পর্যটক আগমন যখন বেশি থাকে তখন ছবি তোলার চাপ থাকে বেশি, সেদিন রোজগার হয় ভালো। বিচ ফটোগ্রাফিতে রোজগার বেশি হলে সেদিন একে অপরকে নাস্তা করায় তারা। আবার কখনো বা দিনভর ভালো আয় না হওয়ায় এক কাপ চা অন্য এক ফটোগ্রাফার বন্ধুকে নিয়ে ভাগ করে খেতে হয়। তারা জানান, দর্শনার্থী আগমন আশানুরূপ থাকলে একজন ফটোগ্রাফার দিনে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় করতে পারে। আবার এমন সময় আসে যখন সারাদিনে মাত্র ৫০ টাকাও রোজগার হয় না।

ফটোগ্রাফার আলমাস খান বলেন, কুয়াকাটাতে ফটোগ্রাফার আছেন ১১০ জন, আর এই ফটোগ্রাফারদের ছবি ডেলিভারি দিতে গড়ে উঠেছে ২৪/২৫টি স্টুডিও। মোটের ওপর এখানে ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান করেছে প্রায় দেড়শ’ যুবক। এদের পরিবারের মানুষ নিয়ে ফটোগ্রাফির ওপর নির্ভরশীল প্রায় এক হাজার মানুষ।
 


সমুদ্র ভাঙন, পেশাগত প্রতিযোগিতা সহ আরো কিছু কারণে আগের তুলনায় ফটোগ্রাফারদের আয় কমে এসছে। গ্রাহকের অভাবে প্রায়ই অলস আড্ডায় সময় কাটে ফটোগ্রাফারদের। কুয়াকাটা সৈকতে একজন ফটোগ্রাফার আবু হানিফ। ছবি তোলার কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি জানালেন, বিগত তিন বছরের মাঝে নতুন ফটোগ্রাফার বেড়েছে দ্বিগুণ, তাই পেশায় এসেছে প্রতিযোগিতা। এছাড়া সমুদ্র ভাঙনের কারণে ইদানিংকালে দর্শনার্থী কমে যাচ্ছে, এর ফলে রোজগার কম হচ্ছে আমাদের।

কুয়াকাটার ফটোগ্রাফারদের সঙ্গে আলাপের এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে দু-চারজন বলে ওঠে, তারা অনেকেই ইন্টারনেট ও ফেসবুক ব্যবহার করে, রাইজিংবিডির নিউজ বা লেখা তারাও পড়ে। তাদের অনেকের কাছেই রাইজিংবিডি পরিচিত একটি পোর্টাল। এ সময় কুয়াকাটার সমুদ্র ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে রাইজিংবিডিকে তাদের পাশে থাকার অনুরোধ জানায় উপস্থিত সকল ছবি কারিগররা।

পেশাদারিত্বের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই পর্যটকদের সহায়ক হয়ে কাজ করে এই ছবিয়ালরা। মাদককে ঘৃণা করে কুয়াকাটার অধিকাংশ ফটোগ্রাফার। তারা চায় একটি সুগঠিত সমাজ। সরকারের কাছে তাদের দাবি, সমুদ্র ভাঙন রোধে সরকার এগিয়ে আসুক। তারা জানে ও বোঝে, কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকত বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে ফটোগ্রাফি নামক শৈল্পিক এই জীবিকা।
 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ সেপ্টেম্বর ২০১৮/ফিরোজ

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge