ঢাকা, রবিবার, ৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন উপকূল

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-১৯ ৮:১৩:৪১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-০৪ ১:৫৫:৩১ পিএম

রফিকুল ইসলাম মন্টু: ‘আমার বাড়ি ছিল ঐখানে। এখন আমার কিছু নাই। একদিন ফজর নামাজ পড়তে যাই (গিয়ে) দেখি সব নিচের দিকে তলাই (তলিয়ে) যাইতেছে। কোনো রকম চলিফিরি খাচ্ছি। মন্ত্রী-এমপি আইয়ে (আসে)। কেউ সমাধানের কথা বলে না।’- কথাগুলো বলতে বলতে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার কালকিনি ইউনিয়নের তোফাজ্জল হোসেনের (৫২) চোখ ভিজে ওঠে। ভোলার ইলিশার রিজিয়া, ঢালচরের রঙমেহের, চরমোন্তাজের নাছিমাসহ আরও বহু মানুষের একই অবস্থা। প্রতি বছর নদীভাঙনে এভাবেই নিঃস্ব হচ্ছে উপকূলের হাজারো মানুষ। এর ওপর আছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততার প্রভাব। মৎস্যজীবীর কাজের সময় কমে গেছে, কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছে না। জীবিকার প্রয়োজনে দ্বীপ থেকে বহু মানুষ ছুটছে শহরের বস্তিতে।

কোথাও নদী ভাঙন, কোথাও লবণাক্ততা। কোথাও আবার জোয়ারের পানি বৃদ্ধি কিংবা জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব বৃদ্ধি। বড় দ্বীপগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে। জমিতে আগের মতো আবাদ হয় না। ফসলি মাঠে লবণের আস্তরণ। অনেক স্থানে সবুজ হারিয়ে গেছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বহু মানুষ সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। জীবিকায় প্রভাব পড়েছে, আয় রোজগার কমে গেছে। স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা স্কুল ছেড়ে কাজে নেমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশে দুর্যোগের মাত্রা বেড়ে চলেছে। আগামীতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

কালাবগির বিপন্নতা: সুন্দরবন লাগোয়া গ্রাম কালাবগির বিপন্নতা বাড়িয়েছে দুর্যোগ। লবণ পানি, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকছে মানুষগুলো। দশ-কুড়ি বছর আগের জীবনধারার কথা এখানকার মানুষেরা এখন আর ভাবতেও পারেন না। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর আর ২০০৯ সালের আইলার প্রলয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ার পর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। নিজের বসতভিটা হারানোর পর এদের ঠাঁই হয়েছে বাঁধের ধারের জমিতে। সেখানেও ঘর বানানোর মতো এক টুকরো মাটি অবশিষ্ট নেই। ফলে জোয়ারের পানির সমান উঁচু খুঁটির ওপর মাচা পেতে বানানো হয়েছে ঘর। নদীর তীরে ঝুলন্ত ঘরের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘরত হলেও ঠিক ভেতর অংশেই আবার ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। বাঁধের ভেতরে অবস্থাপন্ন মানুষেরা জমিতে ধানের আবাদ করেছে। তবে ঘূর্ণিঝড় আইলার ধাক্কা এখনও অনেকেই সামলে উঠতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে জল-জঙ্গলে কালাবগির মানুষের জীবিকা নির্বাহ হলেও অনেক আগেই তাতে ভাটা পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় আইলায় সব কেড়ে নেওয়ার পর প্রতিনিয়ত এখানকার মানুষের সংকট বেড়েই চলেছে। প্রধানত কাজের সংস্থান হারিয়েছে, এরসঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবন-জীবিকার নানান বিষয়। শেষ বসতভিটাটুকু হারানোর পর আবাসনের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। শুধু কালাবগি নয়, উপকূলের গাবুরা, ঢালচর, লুধুয়া, শাহপরীর দ্বীপ, চরমোন্তাজ, মদনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষের জীবনযাপনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব লক্ষ্যণীয়।

সুপেয় পানির সংকট: পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন স্থানে পানির যে উৎসগুলো কেড়ে নিয়েছে ঘূর্ণিঝড় আইলা। নদীতে আসা তীব্র লবণ পানি ঢুকেছে পুকুর-ডোবা-খালে। ফলে এলাকায় পানি সংগ্রহের উৎস একেবারেই কমে গেছে। যা আছে, তাতে আবার সকলের প্রবেশাধিকার নেই। উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি উপজেলায় পানি সংকট তীব্র। অতিথিদের একবেলা ভাত খাওয়াতে পারলেও এই এলাকার অনেক পরিবার অতিথির জন্য এক জগ পানি ব্যয় করতে কষ্ট পান। কারণ সুপেয় পানি আনতে হয় অনেক দূর থেকে। দাকোপের ঝুলন্ত পাড়ার কাঁচা রাস্তায় হাঁটার সময় চোখে পড়ে অসংখ্য প্লাস্টিকের ড্রাম। এগুলোতে এই পাড়ার মানুষেরা দূর থেকে আনা পানি সংরক্ষণ করে রাখেন। ঝুলন্ত পাড়ার জালাল মীরের স্ত্রী বাসিন্দা সকিরন বিবি (৪৫) বলছিলেন, অনেক কষ্ট করে তিনবেলা ভাত হয়তো পেট ভরে খেতে পারি। কিন্তু প্রায়োজনমত পানি পান করতে পারি। অন্যান্য কাজেও পানি ব্যবহার করতে হয় মেপে। বর্ষাকালে পানির কষ্ট কম থাকে। কারণ, তখন বৃষ্টির পানি পাই। তখন পানি ব্যবহার করি এবং সংরক্ষণ করেও রাখি। তবে ধরে রাখা বৃষ্টির পানিটুকু শেষ হয়ে গেলে শুকনো মৌসুমে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। খুলনার দাকোপের কালাবগি, সাতক্ষীরার গাবুরার বাসিন্দারা একই সংকটের কথা জানান।

জোয়ারের সমান ঘরের পাটাতন: দুর্যোগ একটি ভূখণ্ডের গ্রামকে ঝুলন্ত গ্রামে পরিণত করেছে। আইলায় যতখানি পানি উঠেছিল, ততখানি উঁচু মাচা পেতে ঘর বানানো হয়েছে। সেই ঘরেই বসবাস করছেন দাকোপের কালাবগির ঝুলন্ত পাড়ার মানুষেরা। আইলার মত বড় জলোচ্ছ্বাস আর আসেনি, তবে জোয়ারের পানিও ঘরের পাটাতন প্রায় ছুঁয়ে যায়। খুঁটির ওপরে মাচা পেতে বানানো হয়েছে ঘর। জোয়ারের পানি ছুঁয়ে যায় ঘরের সেই মাচা। যতদূর হাঁটছি, ঘরের চেহারা একই রকম। ঘরের বৈশিষ্ট্যের কারণে এপাড়ার নাম হয়েছে ঝুলন্ত পাড়া। কালাবগির মূল ভূখণ্ডের মানুষজনের জীবনধারা থেকে এদের জীবনধারায় বেশ পার্থক্য। পথে দেখা হতেই গ্রামের বাসিন্দা ছকিনা বেগম বলেন, ‘ঝড়ের সময় বাড়িঘর পানিতে ডুবে যায়। জোয়ারের সময় পানি ওঠে ঘরে। সিগন্যাল পড়লে আল্লারে ডাকি। শুকনো সময় বাইরে রান্না করি, বর্ষায় ঘরের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই। শীতকালে বাঘের ভয়। গরম কালে সাপের ভয়। দস্যু আর কুমিরের ভয় তো বছরের সব সময়। এখন বুঝতে পারছেন- আমরা কীভাবে বেঁচে আছি।’ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তর্জনী তুলে শিবসায় প্রথম বেড়িবাঁধের স্থানটি বোঝানোর চেষ্টা করলেন কালাবগির আরেক বাসিন্দা মনিরুজ্জামান। সে অনেক দূরে প্রায় সুন্দরবনের কাছাকাছি। এপার থেকে সুন্দরবন বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। বাসিন্দারা জানালেন, নদী নাকি অনেক ছোট ছিল। আর এই নদীতেই ছিল তাদের জীবিকা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ শিবসা নদীতে চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করলেও সেদিন ফুরিয়েছে। চিংড়ির পোনা ধরায় নিষেধাজ্ঞা, পাশাপাশি সুন্দরবনের কাজেও রয়েছে নানামূখী সমস্যা।



জীবিকায় সংকট: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীবিকায় সংকট দেখা দিয়েছে। একটি ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা সামাল দিতে না দিতেই আসে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়। একদিকে নদী ভাঙ্গনের কারণে সহায় সম্পদ হারানো, অন্যদিকে জীবিকার পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এখানকার মানুষের সংকট বেড়ে যায়। খুলনার দাকোপের কালাবগি এসে প্রথম যার সঙ্গে কথা বলি, সেই রুহুল আমীন বাড়ি বদল করেছেন ৯বার। মনিরুজ্জামান বাড়ি বদল করেছেন দু’বার। আর মনিরুল সানা জানালেন তিনি বাড়ি বদল করেছেন ১২ বার। ভাঙন এদের জীবন বদলে দিয়েছে। অন্যদের মত এখানকার মানুষেরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। সময়ের বদলে এখন তাদের বসবাস ঝুলন্ত ঘরে। কথাগুলো বলতে গিয়ে ক্ষোভ ঝরে বাসিন্দাদের কণ্ঠে। তারা বলেন, ‘ভোটের আগে বলে সব করে দিব। ভোটের পরে আর ফস করে না।’ বাসিন্দারা জানান, আইলার পরে যে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছিল, সেটিও ভাঙনের মুখে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সুতারখালী ইউনিয়নের চারিদিকে নতুন বাঁধ হচ্ছে। কিন্তু সে বাঁধের বাইরে থাকছে কালাবগির অন্তত ৫শ’ পরিবার। গ্রামবাসী মনিরুজ্জামান জানান, সে সময় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলের হাতেই বেশ টাকা পয়সা ছিল। সেই সচ্ছল গ্রাম এখন ম্রিয়মান। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর এখানকার মানুষের জীবনধারা বদলাতে শুরু করে। আইলার প্রবল জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে বাড়িঘর ভেসে যায়। শেষ অবধি কারও কোন ভিটে অবশিষ্ট ছিল না। আবার জীবিকার তাগিদে এলাকাও ছাড়তে পারছে না মানুষগুলো।

ক্ষতবিক্ষত ঢালচর: জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতবিক্ষত উপকূলীয় দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচর। গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এখানকার বাসিন্দারা বহুমূখী ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখানে বছরে বছরে দুর্যোগের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়েছে। আগে ঢালচরে জোয়ারের পানি এতটা বাড়ত না, জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব এতটা ছিল না। কিন্তু এখন বর্ষাকাল আসতে না আসতেই জোয়ারের পানিতে বিপন্ন হয়ে পড়ে দ্বীপের জনজীবন। ঘূর্ণিঝড় এই দ্বীপের মানুষ আগে এতটা দেখেনি। ঢালচরবাসীর কাছে প্রতীয়মান, দুর্যোগের সময়কালটা অনেকখানি বেড়ে গেছে। আগে বছরে ২-৪টি নিন্মচাপ হতো, এখন তো বছরে অন্তত ১২-১৪বার নিন্মচাপ হয়। আর এটা জনজীবনে, বিশেষ করে জেলেদের জীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে। এখানকার পানিতে লবণাক্ততাও বেড়েছে। অক্টোবর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত লবণ পানির প্রভাব থাকে। এক সময় এই দ্বীপের জমিতে কৃষকেরা ইরি ধান আবাদ করতো। কিন্তু এখন ইরি আবাদ তো দূরের কথা; রবিশস্য পর্যন্ত আবাদ করতে পারেন না কৃষকেরা। ফলে বহু জমি পতিত থেকে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাবের কারণে অনেক কৃষক জমিতে চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছে। কৃষিতে নির্ভরশীল মানুষেরা পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে মাছ ধরায় বিনিয়োগ করেছে; অনেকে আবার ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছেন।  

গবেষণা তথ্য: বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনে মারাত্মক দুর্যোগ ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূল বাংলাদেশ। কয়েক দশকে দেশে ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে ঘন ঘন বন্যার প্রবণতা বেড়েছে। ক্রমেই বেড়ে চলেছে বন্যার ভয়াবহতা। লবণাক্ততা, নদীভাঙ্গনসহ বহুমুখী দুর্যোগের কবলে পড়ছে উপকূলের মানুষ। সমুদ্র্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে উপকূলের ২ কোটি মানুষ নিঃস্ব হবে। আইপিসিসি প্রতিবেদন সতর্ক করে দিয়েছে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। এদেশে বহুমূখী দুর্যোগের মাত্রা বাড়বে। এসব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে উপকূলের মানুষ। অন্যদিকে ইউএনডিপি’র ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো : উন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিশ বছরে বিশ্বের ঘূর্ণিঝড়ে মৃত আড়াই লাখ মানুষের মধ্যে ৬০ শতাংশই বাংলাদেশের। ফিলিপাইন বাংলাদেশের চেয়ে তিনগুন বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ফিলিপাইনের চেয়ে বাংলাদেশে ১০ গুন বেশি।

কয়েক দশকে দেশের উপকূল জুড়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বেড়ে চলেছে। এর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সমুদ্র উপকূলের সরুপার্শ্বে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় ভৌগলিকভাবেই এই এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘূর্ণিঝড় প্রবণ এলাকা। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ১৪টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে উপকূলে। এরমধ্যে মধ্যে ৫টিই আঘাত হেনেছিল ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে। ২৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সাধারণত ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় না। এক গবেষণা তথ্যমতে, ১৮৭৭ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মোট ৩৬৫টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির রেকর্ড আছে, যা মূল ভূ-খণ্ডে আঘাত হানার আগেই দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব ঘূর্ণিঝড় মূল ভূ-খণ্ডে আঘাত হানতে পারে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলাসহ ঘনঘন নিন্মচাপের পূর্বাভাস জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। 

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের বাৎসরিক বিস্তরণ পর্যালোচনা করে দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ মোঃ শামসুদ্দোহা গবেষণায় দেখিয়েছেন, মৌসুমি-পূর্ব ও মৌসুমি-উত্তর ঋতুতে এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে সর্বাধিক সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় সংগঠিত হয়েছে। ১৮৯১-১৯৯০ সময়কালে ১০০ বছরে সংঘটিত ছোট বড় প্রায় ৭০০টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ৬২টি মৌসুমি-পূর্ব এবং ১৯২টি ঘূর্ণিঝড় মৌসুমি উত্তর ঋতুতে ঘটেছে। উপকূল অঞ্চলে সৃষ্ট নিন্মচাপ শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬-৯ কিলোমিটার উপর দিয়ে উপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে এগিয়ে আসে।



গবেষণা সূত্র বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের গোটা উপকূল। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রায় ৩২ শতাংশ জুড়ে রয়েছে উপকূল। ২০০১ সালের জনজরিপে দেখা গেছে, ৪৭ হাজার ২১১ বর্গ কিলোমিটারের উপকূল এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ হার চলতে থাকলে ২০২০ সাল নাগাদ এখানকার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে চার কোটিতে। ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-আইপিসিসি’র হিসেবে দেখা যায়, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগ এবং ৪০ ভাগ উপকূল অঞ্চলের যথাক্রমে ৩০ কিলোমিটার এবং ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। নদীভাঙন, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এইসব কারণে উপকূলের জনজীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

গবেষণা বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি বৃদ্ধিতে মানবসৃষ্ট ঝুঁকির কারণ ৫৮ ভাগ, ১৯ ভাগ ঝুঁকির কারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ১৬ ভাগ কারণ রাষ্ট্রশাসন কাঠামোগত বিপর্যয় এবং ৭ ভাগ অন্যান্য কারণ। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, আগামী ১০০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের ১৫-১৭ ভাগ এলাকা ২২১৩৫ থেকে ২৬৫৬২ বর্গকিলোমিটার এলাকা তলিয়ে যাবে। পরিবেশ দুর্যোগে উদ্বাস্তু হবে প্রায় ২ কোটি মানুষ। এদের আশ্রয় দেয়ার মতো জায়গা থাকবে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৪৫ সেন্টিমিটার ও তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়লে নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার বিপদ প্রায় ২৯ শতাংশ বাড়বে। ফলে সম্পূর্ণ ডুবে যেতে পারে উপকূলের ১৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেলাভূমি। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস-সিইজিআইএস’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর নদী ভাঙনে প্রায় ১ লাখ লোক সর্বস্ব হারাচ্ছে। নদীভাঙন ও উপকূল অঞ্চলের জমি বিলীন জাতীয় সমস্যা ও অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণা সূত্র বলেছে, উপকূলীয় মোহনা কুতুবদিয়া চ্যানেলের প্রান্ত, হাতিয়া চ্যানেল, সন্দীপ চ্যানেল, কর্ণফুলি দিয়ে জোয়ারের সময় প্রায় ৩০ হাজার ৮৬৮ ঘনমিটার জোয়ারের জল বঙ্গোপসাগর হতে উর্ধ্বগামী হয়। আবার এ মোহনা দিয়েই নিম্ন উপকূলীয় ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ৩৮ হাজার ৮৯৬ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের উজান প্রবাহ নিম্নগামী হয়। এরফলে নদীভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে। ভাঙ্গনে ভোলা জেলায় অন্তত ৫ হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর অনেকেই ভাসমান জীবন কাটাচ্ছে। ষাটের দশকের শুরুতে ভোলা জেলার আয়তন ছিল ৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার। ৪০ বছরে ৩ হাজার বর্গকিলোমিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙ্গনের এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৪০ বছরে ভোলা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। সমুদ্রদ্বীপ কুতুবদিয়া ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিলীন হওয়ার পথে। ১০০ বছরে দ্বীপটির প্রায় ৬৫ ভাগ বিলীন হয়েছে।

নাগরিক অভিমত: এলাকায় কর্মরত খুলনা ভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তর-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর খুলনা ও সাতক্ষীরার বেশকিছু এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভাঙনে স্থানীয় বাসিন্দারা জমি হারিয়েছে। এদের অন্যত্র সরিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। এরপর এদের কী ধরণের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, সেটা দেখতে হবে। দাকোপের সুতারখালী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোনতাজ সানা বলেন, এখানকার মানুষ আইলার পর থেকে খুবই সংকটে দিনাতিপাত করছে। সমস্যা সমাধানে এলাকায় রাস্তাঘাট করতে হবে। ব্লক ফেলে নদীর ভাঙন রোধ করতে হবে। তাহলে সংকট অনেকটা কাটবে। পানির সংকট রোধ করতে প্রতিটি পরিবারে দেড় হাজার লিটারের একটি করে ট্যাংকি দিতে হবে। ভোলার চরফ্যাসনের ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী ভাঙন বেড়েছে। কারণ আগে আমরা এমন ভাঙন দেখিনি। তবে এই সমস্যার বিপরীতে এই চরেই রয়েছে কয়েক হাজার একর খাসজমি। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞের কথা: পরিবেশ বিজ্ঞানি ড. আতিক এ রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগ বাড়ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে অস্বাভাবিক। উপকূল অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ দুর্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বন্যা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক অঞ্চলজুড়ে। এতে দেখা যাচ্ছে দেশে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দুর্যোগ ফোরামের আহবায়ক দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বিভিন্ন কারণে দেশের উপকূল অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন দুর্যোগের সংকেত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে এখনও তেমন কোন সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। সমুদ্র বন্দরভিত্তিক সতর্ক বার্তা সাধারণ মানুষ বোঝে না। দুর্যোগ মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতিও জোরদার নয়।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ এপ্রিল ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন