ঢাকা, মঙ্গলবার, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৩ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

লোভী মানুষের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে কাও ধনেশ

শামীম আলী চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২৯ ২:১৮:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০১ ৬:৫৪:২১ পিএম
লোভী মানুষের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে কাও ধনেশ
Voice Control HD Smart LED

শামীম আলী চৌধুরী: কাও ধনেশ বা পাকড়া ধনেশ বিউসেরোটিড (Bucerotidae) পরিবার বা গোত্রের অন্তর্গত একটি মোটামুটি বৃহদাকার ধনেশ প্রজাতির পাখি। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব  এশিয়ার উত্তর-পূর্বাংশের বিভিন্ন দেশ কাও ধনেশের প্রধান আবাসস্থল। বাংলাদেশ, ভারত (উত্তর-পূর্বাঞ্চল), ভুটান, নেপাল,  মিয়ানমার, থাইল্যান্ড , ইন্দোনেশিয়া,  মালয়েশিয়া, লাওস, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীন (দক্ষিণাঞ্চলে ইউনান প্রদেশ) কাও ধনেশের প্রধান আবাসস্থল। এরা মূলত পাহাড়ি মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা।

কাও ধনেশের উপরের দিক চকচকে কালো রঙের, নিচের দিক সাদা। ডানার পালকের ডগা এবং লেজের বাইরের পালকের আগার দিক সাদা। গলায় পালকহীন নীল চামড়ার পট্টি থাকে। চোখের চারপাশে ও গলায় নীলাভ-সাদা চামড়া দেখা যায়। পা ও পায়ের পাতা স্লেট রঙের সবুজ। চোখের তারা লালচে। নিচের দিকে বাঁকানো বড় ঠোঁটের উপরের বর্ম মাথার পেছনের দিকে বেশি প্রলম্বিত কিন্তু সামনের দিকে একটু বাড়ানো ও এক ডগাযুক্ত। আপাতদৃষ্টিতে এদের ঠোঁট অনেক ভারি মনে হলেও আসলে বেশ হালকা, কারণ ঠোঁট আর বর্মের ভেতর আছে অনেক ফাঁপা প্রকোষ্ঠ। পুরুষ পাখির বর্মের সামনে-পেছনে কালো অংশ আছে, কিন্তু মূল ঠোঁটে কালো অংশ নেই। স্ত্রী ধনেশ যে কেবল আকারে ছোট তাই নয়, তাদের বর্ম পর্যন্ত ছোট এবং এর ঠোঁটের উপর কালোর ছোপ বেশি আর নিচের ঠোঁটের গোড়ায় লালচে অংশ আছে। তাছাড়া এর চোখও বাদামী। কাও ধনেশ দৈর্ঘ্যে কমবেশি ৯০ সেন্টিমিটার। সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। কখনও সঙ্গে অপরিণত ছানাও থাকতে পারে। বনের বটজাতীয় গাছের যখন ফল পাকে, তখন অন্য অনেক প্রজাতির পাখি ও স্তন্যপায়ীদের সঙ্গে মিলে সে খাবারে হামলা চালায়। বনের ছোট-বড় সব নরম ফল খেতে পারদর্শী, সেই সঙ্গে খেয়ে থাকে পাখির ছানা, ডিম, ইঁদুর, ব্যাঙ, সরিসৃপ প্রভৃতি।

এদের বাসা বানানো থেকে শুরু করে প্রজনন ও ডিম পাড়ার পর বাচ্চাদের সংরক্ষণ করার পদ্ধতি অন্য কোনো পাখির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।  এক জোড়া একই এলাকায় বছরের পর বছর থাকতে পছন্দ করে। বেশিরভাগ সময় একই মরা গাছের উপরের দিকের কাণ্ডে গর্ত করে বাসা বানায়। কোনো কোনো গাছে পরপর কয়েকটি গর্ত থাকতে পারে। স্ত্রী ধনেশ বাসায় ঢুকে নিজের বিষ্ঠা দিয়ে  বন্ধ করে দেয় বাসার প্রবেশ পথ। ডিম পাড়া থেকে বাচ্চা বড় না হওয়া পর্যন্ত মা ধনেশ গর্তের বাসায় বন্দী থাকে। ছোট একটি ফুটো দিয়ে বাবা ধনেশ এই দীর্ঘ সময় স্ত্রী পাখির খাবারের জোগান দেয়। ব্যাপারটি খুবই বিস্ময়কর এবং এই কাজের জন্য অস্বাভাবিক ধৈর্যের প্রয়োজন পড়ে। ছানা ডিম ফুটে বের হওয়ার পর বাবা ধনেশ বাসার মুখ ভেঙে দেয়। তখন মা ও বাবা ধনেশ পাখি সম্মিলিতভাবে বাচ্চাদের খাবার দেয়। এরা পালাক্রমে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাচ্চাদেরও খাবার বট-ফল। বাবা ও মা পাখি মুখে করে বেশ কয়েকটি ফল নিয়ে আসে। পরে বাচ্চাদের মুখের ভিতর ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার দেয়।
 


দেশে বন ধ্বংস এবং আদিবাসী সম্প্রদায় কর্তৃক এদের ধরে খাওয়া, হাতুড়ে চিকিৎসায় ও গৃহপালন বা চিড়িয়াখানায় সংগ্রহের কারণে এদের সংখ্যা অতি দ্রুত কমে আসছে। চিড়িয়াখানায় এদের বংশ বিস্তরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশে ধনেশ পাখির তেল বিক্রির নামে কাও ধনেশ ব্যাপক হারে মারা হচ্ছে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্রেতারা ধনেশ পাখির তেল মনে করে পোড়া মবিল নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এক্ষেত্রে ধনেশ পাখি মারা হয় কেবলমাত্র তেলের বিজ্ঞাপনের জন্য। এসব স্বার্থান্বেষী ও লোভী মানুষের জন্য আজ প্রকৃতির অলঙ্কার ধনেশ পাখি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশে এই ভণ্ড কবিরাজরা পাখিগুলো শিকার করছে। বান্দরবানের দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রতিটি ধনেশ পাখির মাথা ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। স্থানীয় সচেতন জনগণ যদি নিজ উদ্যোগে অপরাধীদের দমন না করতে পারে তবে একদিন এই সুন্দর পাখিটি আমাদের দেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্যবর্ধক এই পাখিকে  রক্ষা করি। নিজেরা সচেতন হই, অন্যকেও সচেতন করি। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাখি বাঁচলে বন বাঁচবে। আর বন বাঁচাতে পারলে আমরা বাঁচবো। না হলে অক্সিজেনের অভাবে মানব জাতিই হুমকির মুখে পড়বে কোনো একদিন।

বাংলা নাম: কাও ধনেশ বা উদয়ী পাকড়া ধনেশ

ইংরেজি নাম: Oriental pied horn bil  

বৈজ্ঞানিক নাম: Anthracoceros albirostris

ছবি: লেখক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ মে ২০১৯/হাসনাত/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge