ঢাকা, শনিবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রতিদিন ভালো কাজ করতে চায় তারা

খাদিজা খাতুন স্বপ্না : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-০৬ ৮:১৬:১০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০৬ ১০:৫৩:০২ পিএম
প্রতিদিন ভালো কাজ করতে চায় তারা
‘আজকের ভালো কাজ’ সংগঠনের কয়েকজন সদস্যা

খাদিজা খাতুন স্বপ্না: ‘ভালো কাজ একদিন করলেই হবে না, একটি হলেও প্রতিদিন করা উচিত।’— এমনটাই মনে করেন ‘আজকের ভালো কাজ’ সংগঠনের সদস্যরা। মেহেরপুর পৌর কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর উদ্যোগে ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। তবে পুরোদমে কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে।

কীভাবে শুরু হলো এই সংগঠন? কেনই বা নাম হলো ‘আজকের ভালো কাজ’? অন্য নামও তো হতে পারতো। আজকের ভালো কাজ’র প্রতিষ্ঠাতা এবং সাধারণ সম্পাদক আল ইকরাম সোহাগ বলেন, আজকে একটা ভালো কাজ হয়েছে, কালকেও একটা ভালো কাজ হবে। ভালো যেকোনো কাজকে নিয়েই আমাদের এই সংগঠন। আমরা প্রতিদিনই কিছু ভালো কাজ করতে চাই। এই ভাবনা থেকেই সংগঠনের নাম ‘আজকের ভালো কাজ।’ ভালো কাজগুলোর মধ্যে— সন্তানেরা দেখাশোনা করে না এমন বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেয়া, অসহায় শিক্ষার্থীদের খরচ চালানো, রক্তদান, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোসহ আরো অনেক কাজ। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়েই ‘আজকের ভালো কাজ’ সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছে। এই সংগঠনের সদস্যরা সবাই ১৮-২৫ বছর বয়সি।

প্রথম দিকে নিজের জমানো টাকা দিয়েই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন সোহাগ। প্রাইভেট পড়ে বাসায় না গিয়ে সামাজিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। বাসায় যেতে দেরি হলে তখন আশেপাশের মানুষ বলতো, ‘এখন এসব করে কি হবে? পরে অনেক সময় পাবা তখন কইরো। নিজের ক্যারিয়ার এখন নষ্ট করিও না।’ এসব কথা, বাধা না শুনে তিনি সামাজিক কাজ চালিয়ে যান। পরবর্তীতে কয়েকজন সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সংগঠনটি। যার স্লোগান হচ্ছে- একটি দিন, একটি কাজ, করবো মোরা ভালো কাজ।

গত ঈদুল ফিতরে সবাই যখন নিজ নিজ কাজ, নতুন জামা কেনা নিয়ে ব্যস্ত তখন ভালো কাজের সদস্যরা অপরের কথা চিন্তা করতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ করে যখন শোনা গেল ঈদ হবে তখন এই সদস্যদের মনে হলো অসহায় পরিবারগুলো কী খাবে। ঠিক তখনি গ্রাম থেকে রাতে চলে আসেন মেহেরপুর শহরে। তারপর মুরগি, সেমাইসহ প্রয়োজনীয় যা লাগে তা কিনে রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলে প্যাকিং এবং বিতরণের কাজ। এসব কষ্ট যেন কষ্ট মনেই হয় না যখন অসহায় গরীব-দুস্থ মানুষগুলোর মুখে হাসি দেখেন তারা।

 

কীভাবে এই সাহায্যের টাকা আসে জানতে চাইলে সোহাগ বলেন, সমাজের বিত্তবানদের মুখাপেক্ষী না হয়ে বরং নিজেরাই (সদস্যরা) প্রতিমাসে ১০ টাকা করে চাঁদা জমা দেন এবং যারা চাকরি করেন তারা বেতনের একটা অংশ জমা দেন। তাছাড়া সদস্যদের চাঁদার টাকায় তৈরি কফি শপের মুনাফার অংশ সংগঠনের কাজে ব্যয় করা হয়।

আজকের ভালো কাজ সংগঠনের সভাপতি আফসানা বিশ্বাস তিথি। তিনি বলেন, পরিবার-স্বজনদের পাশাপাশি এখন এলাকার মানুষজনও গর্ব করেন আমাদের কাজ নিয়ে। তিনি আরো বলেন, আগে বাসা থেকে বাধা আসলেও এখন আর কিছু বলেন না। এখন বরং আম্মু নিজেই অনেক সাহায্য করেন। আম্মুর হাতে এখন আর কোনো টাকা থাকে না সব আমাদের দিয়ে দেন। সামনে কোনো অসহায় মানুষকে দেখলে আগে কিছু মনে হতো না, কিন্তু এখন সব কিছু চোখে পড়ে এবং সাহায্যের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। কোনো কিছুর জন্য অসহায় মানুষকে সাহায্য বা রক্ত জোগাড় আটকে থাকবে বলে মনে হয় না। সব ভালো কাজ এই সংগঠনটি করতে পারে।

আল ইকরাম সোহাগ বলেন, আগে বাবা-মা বাড়ি থেকে বকাঝকা করত কিন্তু এখন যখন বাইরের কোনো মানুষ বাড়িতে এসে বলে,  ‘তোমার ছেলে কই? আমার ১ ব্যাগ রক্ত লাগবে।’ তখন বাবা-মাও ভাবে ছেলে ভালো কাজ করছে।

‘আপনার রক্ত আপনারই থাক, কিছুটা রক্ত জীবন বাঁচাক’ এই স্লোগান নিয়ে সংগঠনটি ইতিমধ্যে ১২০০ এর অধিক মানুষকে রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে ব্লাড ক্যাম্পিং করেছে। গত ১৪ জুন মেহেরপুর কমিউনিটি সেন্টারে মানববন্ধন, রক্তদাতা সংবর্ধনা, চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, লিফলেট বিতরণ, সাইকেল র‌্যালির মধ্যে দিয়ে সংগঠনটি বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালন করে।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সোহাগ বলেন, সারাদেশে আজকের ভালো কাজ সংগঠনটি কাজ করবে এবং আবেগ দিয়ে নয়, বিবেক দিয়ে কাজ করতে চাই। আজকের ভালো কাজ থেকেই প্রতিটা ভালো কাজ হবে। তিনি আরো বলেন, যখন মুরুব্বিরা আমাদের জড়িয়ে ধরে কথা বলে, কান্না করে ফেলে খুশিতে সেই আনন্দ এই সংগঠন করার আগে পাইনি। তাই আজকের ভালো কাজ’র সদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ জুলাই ২০১৯/ফিরোজ/শান্ত

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন