ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
ইলিশকাল- দ্বিতীয় পর্ব

ইলিশ-জেলের দৌড় আড়তদারের বাক্স পর্যন্ত

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৮ ২:২৫:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-০৮ ৭:৪৪:৩১ পিএম
ইলিশ-জেলের দৌড় আড়তদারের বাক্স পর্যন্ত
Walton E-plaza

রফিকুল ইসলাম মন্টু: ‘ও মাঝি, ওঠো!’ ইলিশ ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ ভেদ করে কানে আসে ডাইনা মাঝির ডাক। কিন্তু মাঝির ঘুম ভাঙে না। ভোরের আজানের ধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে মাঝির কাজ। আজ বড্ড ক্লান্তি লাগছে তার। তাই হয়তো কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না ডাইনা মাঝির ডাক।  

ট্রলারের কেবিনে অঘোর ঘুমে সিরাজ মাঝি। এই সময় তার ঘুমানোরই কথা। জাল ফেলে মাঝ দরিয়ায় ট্রলার নোঙ্গর করা পর্যন্ত তার দায়িত্ব। পরের দায়িত্ব আবার জাল তোলার সময়। কিন্তু সে তো তিন ঘণ্টা পর- এখন কেন ডাক? মাঝি আড়মোড়া ভেঙে ট্রলার কেবিনের ছোট্ট জানালায় চোখ রাখেন। দরিয়া দেখেন। বেশ অশান্ত দরিয়া। উথাল পাথাল ঢেউ চলছে। কিন্তু জাল তোলার সময় তো হয়নি। এই সময়ে তাকে প্রয়োজন হলো কেন? বালিশের নিচে রাখা লাইটার দিয়ে একটা বিড়ি ধরায় মাঝি। বিড়িতে লম্বা টান। মুহূর্তে ধোয়া উড়ে যায় বাতাসের সঙ্গে। মাঝি উঠে আসেন কেবিনের ছাদে।

‘পতাকা খুঁজে পাচ্ছি না।’ মাঝির উদ্দেশ্যে বলে ডাইনা মাঝি আবদুল কাদের। ইলিশ জাল ফেলার পর জালের শেষ মাথায় নিশানা হিসাবে রাখা হয় এই পতাকা। বিশেষ পদ্ধতিতে জাল তোলার আগ পর্যন্ত পতাকাটি দাঁড়িয়ে থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের আগে এই পতাকাটি কাত হয়ে পড়লে ইলিশ জেলেরা ধরে নেন জালে কোন না কোন সমস্যা হয়েছে। তখন তারা কারণ খুঁজতে নেমে পড়েন। আর জাল তোলার আগ পর্যন্ত পতাকা ঠিক আছে কিনা- সেটা দেখার দায়িত্ব ডাইনা মাঝির। ইলিশ জালের অঁচলে বাঁধা পতাকা দেখা যাচ্ছে না বলেই মাঝিকে ডাকছিলেন ডাইনা মাঝি। ডাইনা মাঝি মাঝির সহকারীও বলা যায়। অন্য জেলেদের থেকে এই ডাইনা মাঝির ভাগও একটু বেশি।

ইলিশ মৌসুমে যাদের পাতে ইলিশ উঠছে তাদেরও অনেকেরই হয়তো ইলিশ ধরার এই দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়নি। তাই পাঠককে জানানোর লক্ষ্যে ইলিশ জেলেদের সঙ্গী হই। মাছধরা নৌকায় সিঁড়ি নেই। ওঠার ব্যবস্থা কী? লাফিয়ে। মাঝি-জেলেরা এতে অভ্যস্ত। কিন্তু নতুন কেউ মাছধরা ট্রলারে উঠতে চাইলে? সেবার আমি নিজেই এই ঘটনার মুখোমুখি। উঁচু হয়ে ট্রলারের কিনার ধরলাম। একজন আমাকে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দিল ট্রলারে। যাত্রা সমুদ্র মোহনায় ইলিশ জেলেদের সঙ্গে এক সকাল। এই বর্ষায় সমুদ্র কিংবা সমুদ্র মোহনায় একবার জাল ফেলতে কতটা পরিশ্রম করতে হচ্ছে জেলেদের, আর কী মিলছে এই শ্রমের বিনিময়ে, তারই খোঁজে সরেজমিনে সিরাজ উদ্দিন মাঝির ট্রলারে যাওয়ার পরিকল্পনা। কীভাবে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে জেলেরা একটা সময় অবস্থান করে, কীভাবে তাদের সময় কাটে, অবশেষে ট্রলারের ইলিশের বাক্সে কী জমা হয়, সেসব তথ্য মিলেছে। কখনও ইলিশ মেলে, আবার মেলে না। ফিরতে হয় শূন্য হাতে। তারপরও ইলিশ পাওয়ার আশা নিয়ে সেখানে ছুটে যান অনেকে। এদের মধ্যে একজন সিরাজ উদ্দিন। ট্রলারের জেলেদের প্রধান। সিরাজ মাঝি নামে পরিচিত। জেলেরা দক্ষতা অর্জন করে ‘মাঝি’ পদে আসেন। তার নির্দেশেই চলে ট্রলার। কোথায় জাল ফেলা হবে, ট্রলার কোন দিকে চলবে, কখন বাড়ি ফেরা হবে, সবকিছুই নির্ভর করে মাঝির ওপর। সিরাজ মাঝির টিম ১৩ জনের। অর্থাৎ ট্রলারে ১৩ জন জেলে। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এরা। কেউ ভোলার চরফ্যাসনের, কেউবা মনপুরার।

 

 

ভোর ৫টা। মাছধরার উদ্দেশ্যে ইলিশ ট্রলারের সমুদ্র যাত্রা। পুবের আকাশ পরিষ্কার হয়েছে। কিছু মাধধরা ট্রলার- নৌকার ব্যস্ততা। ঘাটে মাছ বাজারের আড়তের দরজা খুলেছে। এরইমধ্যে ছেড়ে দিল সিরাজ মাঝির ট্রলার। ট্রলার ছুটছে সোজা দক্ষিণে। ট্রলারের ভেতরে সকালের খাবারের আয়োজন চলছে। ট্রলারের ভেতরে কয়েকজন জেলে আরও খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিচ্ছে। এদিকে আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাতাসের গতি বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। একঘণ্টা পার হলো। ভোর ৬টা। চারিদিকে ধু ধু জলরাশি। ট্রলার মেঘনার মোহনা পেরিয়ে সমুদ্র মোহনার দিকে ছুটছে। চারিদিকে ধু ধু জলরাশি। দু’একটি চরের দিগন্ত রেখা দেখা যায় মাত্র। সেগুলোও ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গেলেও আকাশ ভারি হয়ে আছে। সমুদ্রের ঢেউ বড় হয়ে ট্রলার দুলিয়ে চলছে। এরই ভেতরে ট্রলারের যাত্রা সমুদ্রের দিকে। ট্রলারের কয়েকজন জেলে এখনও ঘুমাচ্ছেন।

ভোর ৬টা ৩০। সব প্রস্তুতি শেষে জাল ফেলা শুরু। সমুদ্র মোহনায় ট্রলার কিনারের দিকে ঘুরতেই সব জেলেরা প্রস্তুত। শুরু হলো জাল ফেলা। উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে ট্রলার দুলতে থাকলেও জেলেদের কাছে এটা স্বাভাবিক। যে যার অবস্থানে চলে যান। এজন্য দলনেতার (মাঝি) কোন নির্দেশনা প্রয়োজন পড়লো না। ট্রলারের ছাদে মাঝি (চালক), নিচে ইঞ্জিনে মেশিন চালক (মিস্ত্রি) আর রান্নায় বাবুর্চি বাদে সবাই সামনে। ট্রলারের সামনে সাজানো ইলিশ জাল যেন ছন্দে ছন্দেই নদীতে পড়ছে। তিনজন জালের উপরের অংশের ভাসা (ফ্লুট) ফেলানোর কাজে, তিনজন জালের নিচের অংশ চাকি ফেলানোর কাজে, বাকি দু’জন অন্যান্য কাজে।

ভোর ৬টা ৪৫। সুদীর্ঘ ইলিশ জাল ফেলা শেষ হলো। প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ জুড়ে ইলিশ জাল। জাল ফেলা শেষ মানে জেলেদের ইলিশ পাওয়ার প্রতীক্ষা আরও বেড়ে যায়। অধীর আগ্রহ নিয়ে কেউ বসে আছেন, কেউবা আরও একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। এরইমধ্যে ট্রলারের ইঞ্জিন থেমে গেল। জেলেদের কেউ কেউ ট্রলারের সামনের অংশ ধুয়ে পরিষ্কার করল। কারণ এখানে আবার জাল রাখা হবে।

সকাল ৭টা। ইলিশের অপেক্ষায় জেলেরা। থেমে থাকা ট্রলারটা নদীতে ফেলা জালের সঙ্গে ভাসছে। ইলিশের অপেক্ষায় বসে আছেন জেলেরা।  জোয়ারের সঙ্গে এই ভাসমান ট্রলারটা যেন কিনারের দিকেই খানিক এগুচ্ছে। ইলিশের জাল ফেলা হয়েছে এই জোয়ার সামনে রেখেই। জোয়ারের সঙ্গে সমুদ্র থেকে ইলিশ উঠে আসবে। আর আটকা পড়বে এই জালে। সাধারণত জোয়ার সামনে রেখেই ইলিশ জাল ফেলা হয়। জোয়ারের শুরুতে জাল ফেলা হয় আর ভাটা আসতে না আসতেই জাল তুলে ফেলা হয়।

 

 

সকাল ৮টা। জেলেরা বিশ্রামে। ইলিশ জালের দুই প্রান্তে দু’টি পতাকা। মাঝখানে ভাসছে সাদা রঙের ছোট ছোট ভাসা (জেলেদের ভাষায় ফ্লুট)। ট্রলারের দায়িত্বে মাত্র দু’জন। ডাইনা মাঝি (সহকারী মাঝি) আবদুল কাদের চোখ রাখছেন জালের অপরপ্রান্তে রাখা পতাকার দিকে। ওটা দেখেই বোঝা যাবে জাল ঠিক আছে কীনা। অন্যদিকে বাবুর্চি মো. হাসান খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত। অন্য জেলেরা বিশ্রামে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ কখনো বাড়ছে কখনো কমছে।

সকাল ৯টা। সকালের খাবার ট্রলারের কেবিনে। সবাই গোল হয়ে বসে গেলেন সকালের খবারে। সঙ্গে আমিও। আগের রাতের পান্তা ভাত আর গুড়ো মাছ। ট্রলারের ছোট্ট কেবিনে সবাই একসঙ্গে বসেছেন। বাবুর্চি টিনের প্লেটে ভর্তি করে খাবার এগিয়ে দিচ্ছেন। পাটাতনের নিচে ট্রলারের ইঞ্জিন, তারই উপরে সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সারলেন। সমুদ্রের উত্তালে ঠিকভাবে বসে খাওয়াটাই যেন কঠিন। তবুও এরা পারদর্শী। এখানেই তারা সব বেলা খাওয়া-দাওয়া করেন, ঘুমান এবং অবসর কাটান। উত্তাল ঢেউয়ে দুলছে ট্রলার। বাতাসে ঢেউয়ের মাত্রাটাও আজ একটু বেশি। নিয়মিত ট্রলারে যাওয়া মানুষেরা এতে অভ্যস্ত। কিন্তু নতুন কেউ মাছধরা দেখতে যেতে চাইলে একটু সমস্যায় পড়তে হবে। আমার গলায় বড় ক্যামেরাটা। কিন্তু ফোকাস ঠিক করে ছবি তোলার সুযোগ নেই। ঢেউ ফোকাস ঠিক হতেই দিবে না। অবশেষে মোবাইলই ভরসা। ছবিগুলো তুলতে হলো মোবাইলেই।

সকাল ১০টা ৪০। জাল টানা শুরু। ট্রলারের মাঝির যেন মুখে কিছুই বলার প্রয়োজন হয় না। থামানো ট্রলারটি স্টার্ট করে জালের বিপরীত প্রান্তে গিয়ে থামতে না থামতেই জেলেরা জাল তোলার জন্য প্রস্তুত। যে যার অবস্থানে চলে গেলেন। শুরু হলো জাল তোলা। একদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, অন্যদিকে সমুদ্রের ঢেউ উপেক্ষা করে কঠোর পরিশ্রমে জেলেরা জাল তুলছেন। শুধু মাঝি (চালক) আর মেশিনম্যান (মিস্ত্রি) নিজের দায়িত্বে পেছনে রয়েছেন। বাবুর্চিকেও জাল তোলার সময় সামনে আসতে হলো।

দুপুর ১২টা ৩৮। জাল টানা শেষ। জেলেদের কঠোর পরিশ্রমে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার জাল তুলে ইলিশ মিললো মাত্র ১০ হালি। মানে ৪০টি। একেবারে খারাপ নয়। আবার খুব সন্তোষজনকও নয়। তবে মৌসুম হিসাবে ইলিশ আহরণের এই পরিমাণ একেবারেই কম। গভীর জলে ভেসে থাকা জালের শেষ ফ্লাগটি তোলার আগ পর্যন্ত জেলেদের বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। ছোট সাইজের দুটি ইলিশ রান্নার জন্য নিয়ে গেল বাবুর্চি হাসান। এটা দুপুরের খাবারের প্রস্তুতি। বাকি ইলিশ আইসবক্সে। সকালে পানতা খেয়ে অনেক পরিশ্রম হয়েছে সবার। তাই দুপুরে হবে তাজা ইলিশের ভোজ। দুপুর ১টা। ঘাটে ফিরলো সিরাজ মাঝির ট্রলার। মাছ উঠলো আড়তে। নির্ধারিত আড়ত, যে আড়তদারের কাছে বাঁধা সিরাজ মাঝি। মানে যার কাছ থেকে দাদন নিয়ে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। ইলিশ-জেলের দৌড় যেন আড়তদারের ওই বাক্সটা পর্যন্ত।  

ভোর ৫টা থেকে টানা ৮ ঘন্টা পরিশ্রমের পর ট্রলার ঘাটে ফিরলো। জেলেরা কেউ বসেছেন জাল মেরামতের কাজে, কেউবা গোসলে ব্যস্ত, বাবুর্চি দুপুরের রান্না শেষ করছেন। আবার রাত হবে, আবার ভোরের প্রস্তুতি শুরু হবে। জেলেরা ট্রলার নিয়ে ছুটবেন সমুদ্রে। ঘাটে আরও খানিক্ষণ। আলাপ ট্রলারের মাঝি সিরাজ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, একবার সমুদ্রে যেতে অনেক খরচ। সে অনুযায়ী ইলিশ মিলছে না। জেলেরা ধারদেনা শোধ করতে পারছে না। প্রতিটি ট্রলার লাখ লাখ টাকা দাদন নিয়ে ইলিশ ধরতে নামে। কিন্তু সেই দাদন কীভাবে শোধ হবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন