ঢাকা, রবিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঐতিহ্যের আড়ালে অমানবিকতা

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৯ ১:২৫:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-০৯ ৩:৫৭:১৩ পিএম
ঐতিহ্যের আড়ালে অমানবিকতা

জাহিদ সাদেক : পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ঘোড়ার গাড়ি; অনেকে ‘টমটম গাড়ি’ বলেন। পুরান ঢাকায় বেড়াতে এসেছেন কিন্তু টমটমে ওঠেননি এমন মানুষ মেলা ভার। ঘোড়াগুলো যখন রাজপথে টগবগিয়ে ছুটে চলে, খুড়ের শব্দে আরোহীর মনেও ছন্দহিল্লোল বয়ে যায়। যদিও কোনো আরোহীই জানেন না ঘোড়াগুলোর দিনযাপনের খবর। মালিক সেগুলোকে রঙিন কাপড়, জরিতে অনেক সময় সাজিয়ে রাখলেও ঘোড়াগুলোর জীবন বর্ণহীন, অমানবিক। ঘোড়াগুলোকে দেয়া হয় না ঠিকমতো খাবার। নেয়া হয় না সঠিক যত্ন। অথচ পরিশ্রম করানো হয় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা। সারাদিনের কাজ শেষে রাখা হয় অপরিচ্ছন্ন, দুর্গন্ধযুক্ত আস্তাবলে। শহরের বাস ট্রাকের হর্নের শব্দে যাতে ভয় পেয়ে দৌড়-ঝাপ না করে এজন্য ঘোড়াগুলোকে বধির করা হয়। এছাড়াও রয়েছে পায়ের মধ্যে লোহার নাল পরানোসহ নানা অমানবিক নির্যাতন। এগুলো সহ্য করেও ঘোড়াগুলো উদয়অস্ত যাত্রীর ভার সয়ে যায়। যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়াই যেন তাদের জীবনের প্রাপ্তি ও সাফল্য। এভাবেই চলছে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর।

টমটম গাড়ির ঘোড়াগুলো ঢাকার ঐতিহ্য হলেও তাদের কম নির্যাতন সইতে হয় না মালিকের হাতে। অনুসন্ধানে জানা যায় রোদ, বৃষ্টি, ঝড়- আবহাওয়া যেমনই থাকুক তাদের পথে নামতে হয়। তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে ছুটতে হয় রাজপথে। বিনিময়ে সকালে পানি-ভুসি খেতে দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় গাড়ি টানা। সারাদিন তেমন আর কোনো খাওয়া পড়ে না মুখে। সারাদিন গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ঘোড়া আর ঘোড়ার গাড়ি চালকদের ব্যস্ততা প্রতি মুহূর্তেই চোখে পড়লেও সন্ধ্যার পর থেকে ফুলবাড়িয়ার সেক্রেটারিয়েট রোডের পাশে কিংবা ফ্লাইওভারের নিচে বিশ্রামের জন্য রাখা হয়। সেখানে খেতে দেয়া হয় ছোলার ভুসি আর পানি। মাঝে-মধ্যে ভালো খাবার বলতে কপালে জোটে ঘাস। ঘোড়াগুলোর রাত্রিযাপনের কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। রাতের পর রাত নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই কাটে তাদের রাত। জানা যায় ঘোড়াগুলো সপ্তাহে পাঁচদিন যাত্রীবাহী গাড়ি টানে। বাকি দুদিন পার্কে বিচরণের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়।

পুরান ঢাকার বকশীবাজার মোড়েও দেখা যায় নোংরা, স্যাঁতসেঁতে পথে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ঘোড়াগুলোকে। যদিও হাজারো রিকশা আর প্রাইভেট কারের আনাগোনা সেখানে। ময়লার রাজত্ব চারপাশেই। ভনভন করে উড়ছে মাছি। ঢুলুঢুলু চোখে ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়, শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে। গলায় দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। দড়ির নিচের চামড়ায় কালচে দাগ। শরীরজুড়ে ক্ষতচিহ্ন। চর্মরোগের শিকার সবগুলো ঘোড়া। আঘাত পাওয়া ঘোড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে পাশেই থাকা কোচোয়ান মাসুম কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে শহিদ নামের এক ঘোড়ার গাড়ির মালিক বলেন, ‘আগে এখানে প্রায় একশর উপর ঘোড়া ছিল কিন্তু এখন আর আগের মত যাত্রী হয় না, তাই ঘোড়ার সংখ্যা কমে গেছে। আর মালিকদের আয় অনেক কমে গেছে, তাই অনেক অসুস্থ ঘোড়াকে ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে আবার অসুস্থ ঘোড়াকে দিয়েই মানুষ আনা নেয়া করছেন।’ টমটম গাড়ির মালিক মিরাজ জানান, যাত্রী পরিবহন ছাড়াও টমটম ব্যবহৃত হয় বিয়ে, পূজা, বিভিন্ন দিবসের শোভাযাত্রা ও সিনেমার শুটিংয়ে। এসব কাজে টমটমকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়। কোচোয়ান ও হেলপারের জন্যও ওই সব অনুষ্ঠানের সময় রয়েছে বিশেষ পোশাক।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দল আলীম বলেন, ‘একটি পরিশ্রমী ঘোড়াকে প্রতিদিন তার ওজনের ৬ থেকে ৮ শতাংশ প্রোটিন খাওয়ানো উচিত। ছোলা, ভুট্টা, গম ও যবের মধ্যে বেশি প্রোটিন থাকে। আর দিনভর পরিশ্রম করে বলে টমটমচালিত ঘোড়াগুলোর ১৫ দিন অন্তর চিকিৎসা করানো উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। যা অমানবিক ও দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন- ২০১২ অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’ বিষয়টি সম্পর্কে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ড. মে. আব্দুল জব্বার শিকদার বলেন, ‘পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশে দুটি আইন আছে। একটি হলো ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন। আইনটি প্রথম গৃহীত হয় ১৯৭৩ সালে; ২০১২ সালে সর্বশেষ সংশোধিত আইনটিতে বন্য প্রাণী হত্যার দায়ে এক বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে। অন্য আইনটি ১৯২০ সালের পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধ আইন। এ আইনেও কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু দুটি আইনই ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে; বস্তুত দেশের অধিকাংশ মানুষেরই এ দুটি আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।’

পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধ আইনের অধীনে এ পর্যন্ত মাত্র একটি মামলার বিচারে আসামির শাস্তি হয়েছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি প্রাণীকুলের প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোর জোরালো উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। টমটম মালিক সমিতির ক্যাশিয়ার ও সিটি টমটমের মালিক মানিক মিয়া বলেন, ‘হরতাল ও অবরোধ না থাকলে একটি গাড়ি দিয়ে সারা দিনে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা আয় হয়। ছোলা, গম, ভুসি, বুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়ে গেছে। ভুসি আর ঘাস দিয়ে এক জোড়া ঘোড়ার পেছনে খরচ হয় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয়শ টাকা। তাই লাভও আগের মতো হয় না।’

পেছন ফিরে দেখা : অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয় ১৮৩০ সালে। তখন এ দেশে ছিল নবাবী শাসন। পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়ার গাড়ি চলত। সে হিসেবে পুরান ঢাকায় প্রায় পৌণে দুইশ বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই টমটম। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী-১’ বই সূত্রে জানা যায়, আর্মেনীয়রা ১৮ শতকের প্রথম দিকে ঢাকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী সম্প্রদায় ছিল। ব্যবসার উদ্দেশ্যে তারা সে সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দোকান খুলেছিল। তার মধ্যে শাঁখারীবাজারের ‘সিরকো অ্যান্ড সন্স’ অন্যতম। এ দোকানে বিভিন্ন ইউরোপীয় জিনিসপত্র বিক্রি হতো। ‘মেসার্স আনানিয়া অ্যান্ড কোম্পানি’ ছিল প্রতিষ্ঠিত মদ ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। ১৮৫৬ সালে সিরকোই প্রথম ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন করেন, যা ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। তখন সিরকোর ঠিকা গাড়ির ব্যবসা বেশ জমে উঠেছিল। সময় গড়িয়ে তা হয়ে ওঠে ঢাকার প্রধান বাহন। ১৮৬৭ সালে ঠিকা গাড়ির সংখ্যা ছিল ৬০। ১৮৮৯ সালের দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০০টি।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের এক হিসাবে দেখা যায়, ১৮৬৭ সালে ঢাকার রাস্তায় মাত্র ৬০টি ঘোড়ার গাড়ি চলাফেরা করত। ১৮৭৪ সালে বেড়ে হয় ৩০০টি। আর ১৮৯০ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। নাজিরাবাজার, সিদ্দিকবাজার, চকবাজার, বাংলাবাজার, ফরাশগঞ্জ, মালাকার টোলার অন্তত ৫০ জন কোচোয়ান একটি সমিতি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ১৯৪০ সালের দিকে, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিদ্দিকবাজারের মতি সর্দার। এ সমিতি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল পুলিশি জুলুম থেকে নিজেদের রক্ষা করা। সময়ের ব্যবধানে ঢাকার রাজপথ বর্তমানে মোটরগাড়ি আর রিকশার দখলে। এরপরও ঘোড়ার গাড়ি রাস্তা থেকে একেবারে হারিয়ে যায়নি।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন