ঢাকা, সোমবার, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বিপ্লবী এক জননায়ক

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৯ ১১:৩৯:৪৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-০৯ ১১:৩৯:৪৪ এএম

‘বাল্য বয়স থেকে আমার গোটা জীবনই হলো রাজনৈতিক জীবন। নীতি-আদর্শ, দল কখনো পরিবর্তন করি নাই ’-

১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য নিজ হাতে লিখিত জীবনবৃত্তান্তে নিজের সম্পর্কে একথা লিখেছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ।

১৯৮৭ সালের ১০ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় রাশিয়ার মস্কোতে। ৯ অক্টোবর প্রথাবিরোধী এই রাজনীতিকের জীবনাবসান ঘটে। হেলিকপ্টারযোগে মোহাম্মদ ফরহাদের লাশ আনা হয়েছিল বোদা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। লাখো জনতার ঢল নেমেছিল সেদিন প্রিয় এই মানুষটিকে এক নজর দেখার জন্য। কমরেড ফরহাদের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

তিনি ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আন্দোলনের অগ্রপথিক। মেহনতি মানুষের নেতা। শোষণহীন একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল যার আজন্ম স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি আজীবন লড়াই করে গেছেন।

রাজনীতির এই আদর্শ পুরুষের জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের সর্বউত্তরের ছোট জেলা শহর পঞ্চগড়ের বোদায়। বিপ্লবী এক জননায়কের নাম কমরেড ফরহাদ। সমাজ বদলের সংগ্রাম করতে গিয়ে যিনি জীবনের একটা বড় সময় অতিক্রম করেছেন জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে। শত নিপীড়নেও যিনি সংগ্রামী জীবন ও আদর্শচ্যুত হননি। তিনি শুধু রাজনীতিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।

১৯৩৮ সালের ৫ জুলাই ফরহাদের জন্ম। তার পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আহমেদ সাদাকাতেল বারী। ফরহাদ ছিলেন একজন মেধাবি ছাত্র। দিনাজপুর জেলা স্কুলের ছাত্র থাকাকালে ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেন। এবং এরমধ্য দিয়েই তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংগঠনটির জন্মকালে ফরহাদ দিনাজপুরে ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করেছিলেন।

গণমানুষের এই নেতা দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন শিশু সংগঠকও। মুকুল ফৌজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন আবৃতিকার এবং নাট্যাভিনেতা। ছাত্রাবস্থায় তার এই বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটে।

মোহাম্মদ ফরহাদ দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি তৎকালিন ছাত্রী আন্দোলনের নেত্রী রাশেদা খানম এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রী রিনা খান নামেই সমধিক পরিচিত। ফরহাদ দুই সন্তানের জনক। কমরেড ফরহাদ বঙ্গবন্ধুর বাকশালের কেন্দ্রীয় সদস্য নির্বাচিত হন এবং ওই দলের রাজনৈতিক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান।

ফরহাদের রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই নেমে আসে নিপীড়নের স্টিমরোলার। ১৯৫৪ সালে নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন। সেইসময় তাকে আটক রাখা হয়েছিল বিনাবিচারে। ১৯৫৫ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পান। ১৯৫৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন। কমরেড ফরহাদের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আইয়ুববিরোধী মিছিল বের করা হয়। ১৯৬২ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ এর সহকারি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিষ্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনের অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন মোহাম্মদ ফরহাদই।

জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি-সিপিবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কমরেড ফরহাদকে কারাবন্দি হন। তবে ১৯৭৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। জিয়ার আমলেই ১৯৮০ সালে পুনরায় ফরহাদকে গ্রেপ্তার করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহের তথাকথিত অভিযোগে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পান।

১৯৮২ সালে ফরহাদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ১৫ দল গঠনে। এরশাদ আমলে ১৯৮৩ সালে ফের গ্রেপ্তার হন। কমরেড ফরহাদ তিন তিনবার সিপিবির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৫ দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি পঞ্চগড়-২ আসন তথা বোদা-দেবীগঞ্জ নির্বাচনি এলাকা থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

কমরেড ফরহাদ অত্যন্ত সাধারণ ও সাদামাটা জীবন-যাপন করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও তিনি কোন লোভনীয় চাকরির পেছনে ছুটে যাননি। অথচ তিনি চাইলে সেটা অনায়াসে পেতে পারতেন। কিন্তু তা না করে মানব মুক্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন সারাটা জীবন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই জননেতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক নিবন্ধে লেখেন, ‘আমার দৃষ্টিতে মোহাম্মদ ফরহাদ হলেন সেই প্রজন্মের প্রতিভূ, যাদের মাধ্যমে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলন পুনর্জন্ম লাভ করে। ১৯৪৭-এর প্রাক্কালে এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্বে হিন্দু পরিবার থেকে আসা ব্যক্তিদেরই প্রাধান্য ছিল। সে সময় বিকাশমান নব্য মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং তাদের দ্রুত নেতৃত্বে নিয়ে আসা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। মোহাম্মদ ফরহাদ নিজ গুণে এই উত্তরণকালীন-প্রক্রিয়ার মূল ধারক ছিলেন।’



ঢাকা/শাহ মতিন টিপু

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন