ঢাকা, রবিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গাছ বাঁচাতে জড়িয়ে ধরে নারীর প্রতিবাদ

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-২৩ ২:১৭:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৮ ৪:৩৪:১৮ পিএম
জীবন দেব, তবুও গাছ কাটতে দেব না

পরিবেশ রক্ষায় পৃথিবীর নানা স্থানে বিভিন্ন সময় ছোট-বড় অনেক আন্দোলন হয়েছে। লড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সেসব আন্দোলনে ছিলেন সাধারণত শিক্ষিত-সচেতন শ্রেণি। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো গ্রামের একেবারেই সাধারণ নারীরাও যে পরিবেশের জন্য আন্দোলন করতে পারেন এবং সে আন্দোলনের বীজ দেশব্যপী ছড়িয়ে পড়ে এমন উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল চিপকো আন্দোলন। এই ঘটনা সুদূর অতীতের নয়, ভারতের হিমালয় অঞ্চলের এক পাহাড়ি গ্রামে সূচনা হয়েছিল গত শতাব্দীর শেষ দিকে।

সময়টা ছিলো ১৯৭৩ সালের এপ্রিল। ভারতের উত্তরাখণ্ডের হিমালয় পর্বতের আলোকানন্দ উপত্যকার চামোলি জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম মণ্ডল থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল চিপকো আন্দোলনের। বিদেশি ক্রীড়া-সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক কোম্পানির গাছ কাটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল গ্রামের সাধারণ জনগণ। এ গ্রামের গান্ধীবাদী সমাজকর্মী চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট গ্রামের সাধারণ নারীদের সঙ্গে নিয়ে বনের গাছ জড়িয়ে ধরে অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাদের অহিংস প্রতিবাদের ফলে বেঁচে যায় হাজার হাজার বৃক্ষ। তাদের গাছ জড়িয়ে ধরা থেকেই আন্দোলনের নাম হয়েছে ‘চিপকো আন্দোলন’। হিন্দি শব্দ চিপকো অর্থ ‘আলিঙ্গন’।

উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছিলো চীন-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষের সময়। চীনের কবল থেকে রক্ষার জন্য সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে সেখানে নজর পড়ে দেশি-বিদেশি কাঠ চেরাই কোম্পানিগুলোর। অঞ্চলের বড় বড় গাছগুলো বিদেশি কোম্পানির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এ অঞ্চলের মানুষ পরিবেশের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। বনভূমির বড় বড় বৃক্ষ ছিলো তাদের বাস্তুসংস্থানের অপরিহার্য অংশ। খাদ্য ও জ্বালানীর জন্য তারা সরাসরি বনভূমির উপর নির্ভরশীল ছিলো। এছাড়াও হিমালয়ের এ অঞ্চলটিতে পানীয় জলের পর্যাপ্ত যোগান ও কৃষি জমির ঊর্বরতা রক্ষার্থে বনভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। ফলে যুগ যুগ ধরে স্থানীয়রা নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে সেখানকার বনভূমি রক্ষা করে আসছিলো। কিন্তু সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সেখানকার গাছ কাটার অনুমতি দেয়।

অথচ সরকার স্থানীয়দের সাধারণ কৃষিকাজের সরঞ্জাম তৈরির জন্য গাছ কাটার অনুমতি দেয়নি। ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই স্থানীয়দের উপর গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পর সরকার বনভূমিগুলোকে চেরাই কোম্পানির কাছে নিলাম করে। কয়েক বছর ধরে বিদেশি কোম্পানির গাছ কাটার ফলে সেখানে শুরু হয় খরা, বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যায় প্রাণ হারায় প্রায় ২০০ মানুষ। কৃষি উৎপাদন ব্যহত হয় উল্লেখযোগ্যভাবে। বৃহৎ শিল্পগুলোর আগ্রাসন রোধে সমাজকর্মী চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট গড়ে তোলেন দাশোলি গ্রাম স্বরাজ সংঘ- ডিজিএসএস। পরবর্তী সময়ে সংগঠনের নাম হয় দাশোলি গ্রাম স্বরাজ মণ্ডল- ডিজিএসএম। সংঘের কাজ ছিলো স্থানীয়দের কুটির শিল্পের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। তৃণমূল এই সংগঠনটির মাধ্যমেই গাছ কর্তনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হন চণ্ডী প্রসাদ।

গাছ বাঁচাতে গ্রামবাসীকে উদ্বুদ্ধ করছেন চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট

 

চণ্ডী প্রসাদের নেতৃত্বে গ্রামবাসীর এই সফলতার পর গান্ধীবাদী দর্শনে উদ্বুদ্ধ আরেক পরিবেশবাদী সমাজকর্মী সুন্দরলাল বহুগুনা এই অঞ্চলের অন্যান্য গ্রামগুলোতে চিপকো আন্দোলনের মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন। ১৯৭৪ সালে সরকারের বন নীতির প্রতিবাদে তিনি দুই সপ্তাহ উপবাস করেছিলেন। একই বছর রেনি গ্রামের কাছাকাছি গাছ কাটার বিরুদ্ধে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে ওঠে। গ্রামের মানুষদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার নাম করে গ্রামের বাইরে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিপূরণ মনে হলেও সেটা ছিল মূলত কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই গাছ কাটার পরিকল্পনা। কিন্তু নারীরা গাছ কাটার খবর পাওয়ামাত্র গৌড়া দেবীর নেতৃত্বে সেখানে গিয়ে গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। কয়েকদিন গ্রামের পুরুষ ও নারীদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে গাছ কাটতে আসা কোম্পানি সেখান থেকে হটতে বাধ্য হয়। রাজ্য সরকার আলোকানন্দ উপত্যকায় বৃক্ষ নিধনের ঘটনা তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে এবং ১০ বছরের জন্য সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে গাছ কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

চিপকো আন্দোলনের অন্যতম দিক ছিলো আন্দোলনের অহিংস মতাদর্শ। এ আন্দোলনের নেতারা ছিলেন গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ। শুরুর দিকে তারা সত্যাগ্রহের মতাদর্শে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করেন। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন যখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তখনও এটি অহিংস মতাদর্শে উজ্জীবিত থাকে। এছাড়াও আন্দোলনের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিলো না। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ কৃষক ও নারীরা পরিবেশ রক্ষার্থে আন্দোলন শুরু করে।

আন্দোলন খুব দ্রুত পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে এবং যেখানেই বৃক্ষ নিধন চলে সেখানেই স্থানীয়রা চিপকো আন্দোলনের পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানায়। অর্থাৎ গাছ কাটার খবর পেলেই দ্রুত গিয়ে গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে পাঁচ বছরের মধ্যে আন্দোলন বিভিন্ন পার্বত্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং এক দশকের মধ্যে এটি সমগ্র উত্তরাখণ্ড রাজ্যব্যাপী বিস্তার লাভ করে। ১৯৭৮ সালে তেহরি ও গড়ওয়াল জেলার আদবানী বনে চিপকো কর্মী ধূম সিং নেগি বন নিলামের প্রতিবাদ করার জন্য উপবাস করেছিলেন। স্থানীয় মহিলারা গাছের চারপাশে পবিত্র সুতা বা রাখি বেঁধে এবং ভগবত গীতা পাঠ করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো। ১৯৭২-১৯৭৯ সাল পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডের ১৫০ টিরও বেশি গ্রাম চিপকো আন্দোলনের সাথে একীভূত হয়েছিলো।  ১৯৭৯ সালে ৯ জানুয়ারি গাছ না কাটার দাবিতে অনশন শুরু করেন সুন্দরলাল বহুগুনা এবং গ্রেফতার হন। ৩১ জানুয়ারি জেল থেকে ছাড়া পান। তিনি ১৯৮১-১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ৫ হাজার কি.মি. ট্রান্স-হিমালয় পদযাত্রা করেছিলেন আন্দোলনের আদর্শ প্রচারের জন্য।

চিপকো আন্দোলনের ফলস্বরূপ সরকার ১৯৮০ সালে পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে গাছ কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই অবদানের জন্য চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট ১৯৮৫ সালে র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড এবং সুন্দরলাল বহুগুনা ২০০৯ সালে পদ্মবিভূষণ উপাধি লাভ করেন। আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নারী নেতৃত্বে ছিলেন গৌড়া দেবী, সুরক্ষা দেবী, সুডেশা দেবী, বচনী দেবী প্রমুখ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে গ্রাম্য নারীদের অবদান আজও পরিবেশবাদী আন্দোলন, রাজনীতি ও একাডেমিয়াতে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে আছে।

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন