ঢাকা, সোমবার, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ১৩ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

হাজীর বিরিয়ানি নাকি তেহারী?

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০৫ ৮:০০:১২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:২০:৪১ পিএম

রাজধানীর ভোজনবিলাসীরা বিরিয়ানির নাম নিলে অবধারিতভাবে ‘হাজীর বিরিয়ানি’র কথাই আগে বলেন। এই নামের সুবাস রাজধানী ছেড়ে এখন দেশের বিভিন্ন সীমানায় পৌঁছে গেছে। ১৯৩৯ সালে হাজী গোলাম হোসেনের হাত ধরে যাত্রা শুরু হওয়া এই বিরিয়ানির রেসিপির কদর আজো টিকে আছে।

‘বিরিয়ানি’ ভারতবর্ষের নিজস্ব শব্দ। আসলে কিন্তু এই শব্দটি এসেছে সুদূর পারস্য থেকে। ফারসি শব্দ ‘বিরিয়ান’ আর ‘বিরিঞ্জ’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে বিরিয়ানির। বিরিয়ান শব্দের অর্থ হলো রান্নার আগে ভেজে নেয়া। আর বিরিঞ্জ অর্থ চাল। বিরিয়ানি রান্নার আগে ঘি দিয়ে ভেজে নেয়া হয় সুগন্ধি চাল। সে কারণেই বিরিয়ানির এই নামকরণ।

অপরদিকে, তেহারী এক প্রকার খাবার বিশেষ। পোলাওয়ের চাল ও মাংস এর প্রধান উপকরণ। বিরিয়ানির সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো- এতে মাংসের টুকরো বেশ ছোট হয়। তেহারী বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং উত্তর ভারতে খুবই জনপ্রিয়। তবে উত্তর ভারত, দিল্লির (মোগল রন্ধনপ্রণালী) মুসলিম বসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে বিরিয়ানিতে বিভিন্ন বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। যদিও বর্তমানে এগুলো সাধারণ রান্না ঘরেও ঢুকে গেছে।

পুরনো ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় খাদ্যের তালিকায় রয়েছে বিরিয়ানির নাম। কিন্তু সাধারণ বিরিয়ানির মতো নয় হাজী বিরিয়ানি। মিহি চালের সঙ্গে ছোট ছোট মাংসের টুকরো, কাঁচা মরিচ ও সরিষার তেল এবং আনুষাঙ্গিক মসলা দিয়ে হাজী বিরিয়ানি রান্না হয়। প্রায় একই উপকরণ দিয়ে একইভাবে পুরনো ঢাকার প্রতিটি বাড়িতে তেহারীও রান্না হয়। এ কারণে ৭৬ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান হাজীর বিরিয়ানি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উঠেছে।

নাজিরাবাজারের বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ হোসেনের নিজস্ব রেসিপি দিয়ে রান্না করা এই খাবার- বিরিয়ানি না তেহারী সেই প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কয়েকজন রন্ধন বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যে একাধিক বিশেষজ্ঞ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হাজী বিরিয়ানি নামে যা বিক্রি হচ্ছে সেটা আসলে বিরিয়ানি নয়; এটা এক ধরনের তেহারী। তেহারীর রেসিপি দিয়ে তৈরি এই খাবার ব্রিটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত ভুল নামে বিক্রি করা হচ্ছে।

পুরনো ঢাকার বাবুর্চি সাবের মাহমুদ বলেন, ‘বিবিয়ানি আর তেহারী এক খাবার নয়। দুটির রান্নার নিয়ম-কানুন ও স্বাদ আলাদা। বর্তমানে ঢাকায় হাজী বিরিয়ানির নামে যা খাওয়ানো হচ্ছে সেটা বিরিয়ানি নয়। পুরনো ঢাকায় যে পদ্ধতিতে তেহারী রান্না হয়, হাজী বিরিয়ানি সেই পদ্ধতিতেই রান্না হচ্ছে। এর স্বাদও তেহারীর মতো। তাই হাজী বিরিয়ানির মালিকের উচিত বিরিয়ানি না বলে তেহারী হিসেবে বিক্রি করা।’

পুরনো ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা মোবারক মোল্লা জানান, ঢাকায় মোগল আমলে বিরিয়ানি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। যে কারণে এই খাবার থেকে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বের হয়। বিরিয়ানির একাধিক নামকরণও হয়। তেহারীও  বিরিয়ানির একটি শাখা। তবে একে মূল বিরিয়ানি বলা যাবে না। বিরিয়ানি বললে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে।

১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাজী বিরিয়ানি বর্তমানে দেখভাল করছেন হাজী মোহাম্মদ শাহেদ। এই বিরিয়ানির বিশেষত্ব হচ্ছে, তারা রান্নায় ঘি কিংবা বাটার অয়েলের পরিবর্তে শুধু সরিষার তেল ব্যবহার করে। এই প্রতিষ্ঠানের কাজী আলাউদ্দিন রোডের মূল শাখায় কোনো সাইনবোর্ড নেই। এতটাই প্রসার যে এক নামে সবাই চেনেন! সকাল ৭টা থেকে ৯টা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত শাখাটি খোলা থাকে। যত চাহিদাই থাকুক, সকালে দুই ডেকচি এবং বিকেলে তিন ডেকচির বেশি বিরিয়ানি বিক্রি করা হয় না উল্লেখিত শাখায়।

তিন প্রজন্ম ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন তারা। তাদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে পুরনো ঢাকার বিরিয়ানির রেসিপি। চানখাঁরপুলের হাজী নান্নার বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনুর বিরিয়ানিসহ আরো অসংখ্য বিরিয়ানি হাউজ গড়ে উঠেছে নতুন ও পুরান ঢাকার অলি-গলিতে। ঢাকার বিরিয়ানি দেশের সীমা ছাড়িয়ে এখন সুবাস ছড়াচ্ছে সুদূর প্রবাসেও।

হাজী শাহেদ বলেন, ‘পুরনো ঢাকায় বিরিয়ানি আর তেহারী একই নামে পরিচিত। দুটির রন্ধনপ্রণালী প্রায় এক। তাছাড়া বাবার আমল থেকে একইভাবে বিরিয়ানি রান্না করছি আমরা। তাই এই রেসিপি আমরা ‘বিরিয়ানি’ হিসেবেই আখ্যায়িত করি। তবে বিরিয়ানির প্রকারভেদ রয়েছে। খাসি, মুরগি, গরু এমনকি ডিমের বিরিয়ানিও বিক্রি হতে দেখা যায়। তেহারীর ক্ষেত্রে কিন্তু এত রকমফের দেখা যায় না। আমাদের বিরিয়ানি বিশেষভাবে তৈরি। সুতরাং কেউ যদি একে তেহারী বলেন ঠিক হবে না। যদিও এতে তেহারীর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, তারপরও এটি বিরিয়ানি।’

 

ঢাকা/তারা