ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নদীরও আছে নারী-পুরুষ

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০৯ ১২:০৩:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১২ ১:২৮:৩০ পিএম
পৌষের হিম বুকে জড়িয়ে নিথর পদ্মা। আলোকচিত্র : উদয় হাকিম

মানব সভ্যতা উদ্ভবের পেছনে রয়েছে নদীর ভূমিকা। কারণ, প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজের ভিত্তি রচিত হয়েছে নদী-তীরবর্তী ভূমি সেচের মাধ্যমে চাষ-উপযোগী করার মধ্য দিয়ে। আবহমান বাংলায় নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তাই গভীর। এদেশের অর্থনীতি থেকে নদী যেমন আলাদা করা যায় না, তেমনি এদেশের সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ নদী।

এদেশের শিল্প-সাহিত্যও আবর্তিত হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণসহ অসংখ্য সাহিত্যিকের কলমে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বাস্তব ও জীবন্ত রূপ ফুটে উঠেছে। নদী নিজ গতিতে প্রতিনিয়ত ছুটে চললেও নদী-তীরের মানুষের জীবনযাত্রা বেশ সরলরৈখিক এবং স্থবির। হুমায়ূন কবীর ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসটিতে নদী এবং নারীর সঙ্গে বাঙালির এমন চিরায়ত সম্পর্কের কথাই বলেছেন।

বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ শীর্ষক বইয়ে ৪০৫টি নদ-নদীর নাম উল্লেখ আছে। মোকাররম হোসেন উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা হাজারটি। মাহবুব সিদ্দিকী ‘আমাদের নদ-নদী’ গ্রন্থে লিখেছেন- নদ-নদীর সংখ্যা সহস্রাধিক। তবে এসব নদ-নদীর কোনটি নদী আর কোনটি নদ তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।

প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষের মানুষ নদীর লিঙ্গ-বিভাজন করে আসছে। যদিও ইংরেজি ভাষায় নদ-নদী বলতে শুধু ‘রিভার’ শব্দটিই ব্যবহার হয়। কিন্তু বাংলায় পুরুষবাচক হিসেবে ‘নদ’ এবং স্ত্রীবাচক হিসেবে ‘নদী’ ব্যবহার করা হয়। তবে এ ধরনের লিঙ্গান্তর কিসের ভিত্তিতে এ নিয়ে পণ্ডিত মহলে বিতর্ক না-থাকলেও রয়েছে সংশয়। ঠিক নিশ্চিত করে এ ধরনের লিঙ্গবিভাজনের কারণ নির্ণয় করা কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক  মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘বাংলার নদ-নদীগুলোর অধিকাংশের নাম সংস্কৃত থেকে এসেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু বাংলা ভাষায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। কয়েকটির নাম কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় স্থান করে নিয়েছে। সংস্কৃত ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেখানে সকল নামের লিঙ্গান্তর রয়েছে। এই নিয়মানুযায়ী নদীর পুরুষবাচক শব্দ ‘নদ’। যেসব নদীর নাম পুরুষবাচক সেই নদীগুলোকে নদ বলে অভিহিত করা হয়। বাংলায় এই বিভাজনের উৎস তাই সংস্কৃতের মধ্যেই নিহিত।’

পদ্মার জলে ভাসে সূর্যের হাসি। আলোকচিত্র : উদয় হাকিম

মোহাম্মদ আজম আরও বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে কিছু কিছু নদী লোকমুখে ‘নদ’ বলে প্রচলিত হয়ে গেছে। তবে ঐ একই নদকে আবার অনেকে নদীও বলেন।’ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকাশিত বইয়ে দেখা গেছে একই নদীর একাংশের নামের সঙ্গে আছে ‘নদ’। আবার অপর অংশটিতে রয়েছে ‘নদী’। সেখানে ভৈরব-এর বাগেরহাটের অংশকে ভৈরব নদী এবং অন্য অংশকে ভৈরব নদ নামে দেখানো হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্র, কপোতাক্ষ, ভৈরব, কুমার প্রভৃতি পুরুষবাচক নাম হওয়ায় এগুলোকে ‘নদ’ সম্বোধন করা হয়। তবে বাংলাদেশে ঠিক কতটি নদ রয়েছে সে সংখ্যাও নিশ্চিত নয়। ধারণা প্রচলিত আছে, যেসব নদীর কোন শাখা-প্রশাখা নেই সেগুলোকে নদ বলা হয়। এক্ষেত্রে শাখা-প্রশাখার ভিত্তিতে নদীর লিঙ্গ-বিভাজন করা হয়। অর্থাৎ যেসব নদীর শাখা নদী রয়েছে সেগুলোকে মাতৃনদী হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এভাবে বিভাজনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের নদগুলোর মধ্যে সবকটি শাখা-প্রশাখাহীন নয়। ব্রহ্মপুত্রকে নদ হিসেবে অভিহিত করা হলেও শীতলক্ষ্যা ও যমুনা ব্রহ্মপুত্রেরই শাখানদী।

আবার অনেকে মনে করেন, নদী নারীবাচক হয় নামের শেষে আ-কার, ই-কার, ঈ-কার কিংবা উ-কার থাকলে। নামের শেষে এগুলো না থাকলে সেই নামগুলোকে পুরুষবাচক হিসেবে ‘নদ’ বলা হয়। তবে বাংলাদেশের অনেক নদী আছে যেগুলোর নামের শেষে আ-কার, ই-কার, ঈ-কার কিংবা উ-কার এগুলোর কোনটি না থাকা সত্ত্বেও সেগুলো স্ত্রীবাচক ‘নদী’ হিসেবেই পরিচিত। পশুর নদীর শেষে কোনো স্ত্রীবাচক চিহ্ন না থাকলেও এটি ‘নদী’ হিসেবেই পরিচিত। আবার পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রণীত বইয়ে আড়িয়াল খাঁ নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদ নামে দুটি আলাদা নদী দেখানো হয়েছে। যার একটির অবস্থান দেশের উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে। অপরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত।

মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘ব্যাকরণগতভাবে নদ ও নদীকে বিভাজন করা হয়েছে। তবে কোনটি নদ ও কোনটি নদী নির্ধারণে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাকরণগত নিয়মের চাইতে লোকমুখের প্রচলন বেশি প্রভাব ফেলেছে। এজন্য ঠিক নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় কোন নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে কিছু কিছু নদীকে নদ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তাই স্থানীয় লোকজন কোনটিকে নদী বলবেন এবং কোনটিকে নদ বলবেন এটি সম্পূর্ণ তাদের ব্যাপার। এখানে ব্যাকরণগত বাধ্যবাধকতা নেই।’

 

ঢাকা/তারা

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও