ঢাকা, সোমবার, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ১৩ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কোতোয়ালি থানা কী?

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৫ ৮:২৪:৪০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:১৭:৫৩ পিএম
মিন্টু রোডস্থ নগর কোতোয়ালের ভাস্কর্য, ভাস্কর: মৃণাল হক

বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানে ‘কোতোয়াল’ শব্দের অর্থে বলা হয়েছে- নগর রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আধিকারিক, কোটাল বা কমিশনার। বাংলা একাডেমির সমকালীন বাংলা অভিধানে আছে- মুঘল আমলে নগর প্রশাসক বা জেলা শহর কোতোয়ালের কর্মস্থল। সংসদ বাংলা অভিধানে এই শব্দের অর্থ বলা হয়েছে- কোটাল, নগর রক্ষক, থানাদার।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মুঘল আমলে নগর বা বন্দরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যিনি প্রধান তাকে কোতোয়াল বলা হতো। ব্রিটিশ আমলে এই উপমহাদেশে জমিদারি, হাট-বাজারের ইজারা, কৃষি, বন্দর বা ঘাট ইজারা থেকে ডেপুটি কালেক্টর (ডিসি) খাজনা, রাজস্ব কিংবা ট্যাক্স উত্তোলন করতেন। এ সময় তার অধীনে রাজস্ব সংগ্রহের জন্য নিয়মিত পুলিশ বাহিনী ছাড়াও দাঙ্গা পুলিশের মতো কোতোয়াল বাহিনীও অনেক থানায় দায়িত্ব পালন করত। কোতোয়াল ছিলেন সেই বাহিনী বা সেই থানার প্রধান। তার অধীনে ছিল দারোগা, জমাদার, হাবিলদার, নায়েক, কনস্টেবল ইত্যাদি। কোতোয়াল বাহিনী যারা রাজস্ব তথা খাজনা দিতে পারত না তাদের ধরে এনে থানায় রাখত। পরবর্তী সময়ে এই থানাগুলোই ‘কোতোয়ালি থানা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। যে কারণে দেশের পুরনো শহর বা বিভাগীয় শহর কিংবা জেলাগুলোতে ‘কোতোয়ালি থানা’ দেখা যায়। অর্থাৎ সেই নামটি এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঢাকার মিন্টো রোডের পূর্ব পাশের শেষ মাথার সড়কদ্বীপে কোতোয়ালের ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্যটি আমাদের ব্রিটিশ আমলের সেসব দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ভাস্কর্যে দেখা যায় কোতোয়াল ঘোড়ার উপর শক্ত চাবুক হাতে বসে আছেন। এটি সেই সময়ে কোতোয়ালের শাসন ও শক্তির সঙ্গে অত্যাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘কোতোয়াল’ নামে এই ভাস্কর্যের নির্মাতা মৃণাল হক।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মো. সেলিম বলেন, ‘কোতোয়াল হলেন তুর্ক-আফগান ও মোঘল আমলে নগরের পুলিশব্যবস্থা ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা। বর্তমান যাকে আমরা থানার ওসি বলছি তিনিই হলেন কোতোয়াল। সেই থেকেই মূলত কোতোয়ালি থানার ব্যাপারটি এসেছে।’ 

আবুল ফজল ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে নগর কোতোয়ালের ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। কোতোয়ালের দায়িত্বের পরিধি ছিল ব্যাপক। তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল প্রহরা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নগরবাসীর নিরাপত্তা বিধান, রাতে সান্ধ্য আইন আরোপ, নগরের বাড়িঘর ও সড়কের তথ্য সংরক্ষণ, সময়ে সময়ে বাড়ির বাসিন্দাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, নগরবাসীর আয়-ব্যয়ের তদারকি, রাষ্ট্রের সন্দেহভাজন উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা, ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, জনগণের নৈতিকতার ওপর নজরদারি, বাজার ও দ্রব্যমূল্য পর্যবেক্ষণ, পশু জবাই ও শবদাহের জন্য শ্মশান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

কোতোয়াল শাহী সনদের মাধ্যমে নিযুক্ত হওয়ায় তিনি দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা নগরীর কোতোয়াল সগৌরবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় নায়েব নাজিম পদ ক্ষমতা ও দায়িত্বের দিক থেকে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। ১৭৯৩ সালে নায়েব নাজিমের নিজামত সংক্রান্ত দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে কোতোয়াল পদেরও বিলুপ্তি ঘটে। তবে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত নামমাত্র প্রতীকস্বরূপ কোতোয়াল পদটি টিকে ছিল। নাম বা সেই পদবী বিলুপ্ত হলেও এখনও সেই সময়ের কোতোয়াল টিকে আছে কোতোয়ালি থানার মাধ্যমে।

বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি কোতোয়ালি থানা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট কোতোয়ালি থানা অন্যতম।



ঢাকা/তারা