ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৬, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কাঁচাবাজারে জীবনবাজি

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-০৪ ১:৫৭:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-০৪ ৩:৫৫:২৪ পিএম

রেললাইন।  দুপাশে সারি সারি দোকান। অনেক জায়গায় লাইনের উপরেই সবজি, ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতা। যখন ট্রেন আসে বহুদূর থেকেই শোনা যায় তীক্ষ্ম হুইসেলের শব্দ। চালক হুইসেল বাজাতে বাজাতেই আসেন।  তখন পড়িমড়ি করে দোকান সরিয়ে নিতে হয় দোকানিকে। ট্রেন চলে যাওয়ার পর তথৈবচ। অনেক সময় ঘটে দুর্ঘটনা। ঝরে তাজা প্রাণ। সব দেখেশুনে অনেকের মন্তব‌্য- এ যেন কাঁচাবাজারে জীবনবাজি।

এমন দৃশ্য প্রতিদিন দেখা যায় রাজধানীর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জুরাইন বাজারে। বিভিন্ন সময় রেল লাইনের ওপর এবং উভয় পাশ থেকে দোকান সরিয়ে দিলেও অদৃশ্য কারণে সেগুলো পুনঃস্থাপন করা হয়। কাঁচাবাজারের কারণে রেল লাইনের পাথর সরে গেছে। উপরন্তু বাজারের ময়লা-আবর্জনায় প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে বসেছে লাইন।  এই লাইনে দিনে গড়ে ৯ জোড়া ট্রেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গেন্ডারিয়ার ঘুন্টিঘর থেকে শুরু করে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত রেল লাইনের দুই পাশে প্রতিদিনই বসছে বাজার। প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ২০০ অস্থায়ী কাঁচামালের দোকান। রেল লাইন ঘেঁষা এসব দোকানে ফলমূল ও সবজি সাজিয়ে বিক্রেতারা বসেন। প্রতিটি দোকানের সামনে টানানো রয়েছে শামিয়ানা। দোকানি পাল্লায় সবজি মাপছেন আর মাঝেমধ‌্যেই তাকাচ্ছেন দূরে। অর্থাৎ গাড়ি আসছে কিনা দেখছেন। ট্রেনের হুইসেল শোনামাত্র ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে শুরু হয় দৌড় ঝাঁপ। অধিকাংশ দুর্ঘটনা এসময় ঘটে।

জুরাইন রেল লাইনের কাছাকাছি বেশ কয়েকটি বাজার রয়েছে। এগুলোর বৈধতার ছাড়পত্রও রয়েছে। যেমন জুরাইন নিউ সুপার মার্কেট, তালপট্টি মার্কেট, মৎস্য মার্কেট, মুরগি হাট, ফার্নিচার মার্কেট ইত্যাদি। মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ী সমিতির কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেলের কিছু কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে রেললাইন ঘেঁষে অবৈধ বাজার গড়ে উঠেছে। এলাকার থানা বা রেলওয়ে পুলিশও অবৈধ দোকানিদের বাধা দেয় না। বাজার চলে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। মূল বাজারের চেয়ে দামে সস্তা বলে এসব দোকানে ক্রেতাদেরও ভিড় বেশি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহুবার উচ্ছেদ করা সত্ত্বেও নিয়মিত তদারকির অভাবে বাজারগুলো বসছে। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বহুদিনের দাবি, কাঁচা বাজারের নির্দিষ্ট জায়গা হোক। কিন্তু তা হচ্ছে না। বাধ্য হয়েই আমাদের এখানে আসতে হচ্ছে। দুর্ঘটনা এখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।  সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ আশা করছি।

ফল ব্যবসায়ী সুরুজ বলেন, ‘মাঝেমধ‌্যে সরকারি অভিযানে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের পর আমরা আবার এসে বসি। কারণ আশেপাশে বসার কোনো জায়গা নেই। আমরা কোথায় যাব?’ এই দোকান কীভাবে নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিআরপি পুলিশ ভাড়া নেয়। থানা পুলিশও নেয়।  প্রতিদিন ২০ টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। দোকান বড় হলে দিতে হয় ১০০ টাকা।’  প্রতিদিন সকালে এসে ভাড়া নিয়ে যায়। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা এদের পক্ষে কেউ ভাড়া নেয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় কমিশনারের লাইনম্যান এসে টাকা নেন।’

জুরাইন রেল লাইনের গেটম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়ম অনুয়ায়ী রেললাইনের উভয় পাশে ১১ ফুট জায়গা খালি রাখার নিয়ম। জুরাইন রেললাইনের চিত্রটা সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। তবে আমরা চেষ্টা করি সরিয়ে দিতে। কিন্তু ওরা পুনরায় এসে বসে।’

রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় এস্টেট কর্মকর্তা নূরুন্নবী কবির বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে পুলিশ না পাওয়ায় বেশ কিছুদিন রেলের ধারের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ ছিল। শিগগির আবারও অভিযান শুরু হবে।’ যোগাযোগ করা হলে বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক আরিফুজ্জামানও একই আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘একবার উচ্ছেদ হলে আবার ভাসমান দোকানপাট গড়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই।’


ঢাকা/তারা