ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৬ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

যে দ্বীপে এখন শুধু কান্নার ধ্বনি!

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৭ ১০:১২:৪৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৭ ৫:১৮:২৬ পিএম

বসতি ছিল অনেক। গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে বসবাস ছিল অনেকের। দূর থেকে শূন্য ভিটেগুলো দেখে এমনটাই ধারণা হয়। কোন কোন ভিটেয় একদিন আগেও হয়তো রান্না হয়েছে, খাওয়া-দাওয়া হয়েছে মাটির মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে। এক সময় শূন্য ভিটের এই ঘরগুলোতেও বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে, মাইক বেজেছে, রঙিন কাগজে সাজানো হয়েছে ঘর, মুখে রুমাল চেপে এসেছে বর, কনে গেছে শ^শুড় বাড়ি। কোলাহলে মুখর ছিল বাড়িগুলো। এখানেই হয়তো প্রথম বারের মতো পৃথিবীর আলো বাতাস দেখেছে অনেক শিশু। কিন্তু আজ সেসব অতীত। দৃষ্টি সবার নদীর ¯্রােতের দিকে। ¯্রােত বাড়লে ভাঙন বাড়ে, আর ভাঙন বাড়লে কান্নার ধ্বনিও বাড়তে থাকে।

এবার বর্ষার আগেই ঢালচর দেখে এলাম। চিরচেনা ঢালচরকে যেন চিনতেই পারছিলাম না। কোন পথে যাই হাওলাদার বাজার? ভাঙা রাস্তা, বাড়ির ভেতরের পথ আর মাঠ পেরিয়ে অন্যপাড়ে গিয়ে তবেই পাওয়া গেল বাজার। পথে শুনতে পেলাম কান্নার ধ্বনি। বহু মানুষকে দেখি, যারা ঢালচর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। যেখানে জন্ম, যেখানে বিয়ে, যেখানে অনেক স্বজনের মৃত্যু সেখান থেকে বিদায়ের কান্না কী চেপে রাখা যায়! ভিটে হারানো মানুষদের ঘরের মালামাল নদীর পাড়ে ট্রলারে ওঠার জন্য প্রস্তুত। ভিটে হারানোর চেয়েও এখানে স্বজনদের বিচ্ছেদের কান্নাটাই প্রবল। ভাইকে ছেড়ে যাচ্ছে ভাই, বাবাকে ছেড়ে যাচ্ছে ছেলে। প্রিয় দাদা-নানার ¯েœহের পরশ নাতিদের ভাগ্যে আর জুটবে না আজ থেকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের শেকড়ের আলোচনায় গেলে এই গল্পগুলোই উঠে আসে। একটি দ্বীপ হারানো এবং এখানকার হাজারো মানুষের নিঃস্ব হওয়ার গল্পটা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জলবায়ু আলোচনায় এ গল্পগুলো উত্থাপনের যেন কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। নিঃস্ব মানুষদের গলার আওয়াজটা ওই অবধি পৌঁছানোর প্রয়োজনই মনে করেন না কেউ। তা হলে এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কীভাবে হবে!

ভোলার দক্ষিণে চরফ্যাসনের কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে বিকেল ৩টার লঞ্চ ঢালচর পৌঁছাতে বেলা পড়ে যায়। সেদিন এলাকা ঘুরে দেখার কোন সুযোগ থাকে না। মাঠের কাজ শুরু করতে হয় পরের দিন। কিন্তু রাতেও পাওয়া যায় অনেক খবর। ঢালচরের প্রাণকেন্দ্র, যেটি হাওলাদার বাজার নামে পরিচিত, এই বাজারে সন্ধ্যা থেকেই বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। যেখানে মানুষের ভিড়, সেখানেই খবর। সন্ধ্যা থেকে অধিক রাত পর্যন্ত আলাপে যা পাই, সেটা অনেক বড় খবর। চেনাজানা অনেক মানুষ এখন থেকে চলে গেছেন। যারা আছেন, তারাও বেশ কষ্টে আছেন। নুরুদ্দিন মাঝি এখনও এখানে আছেন, তবে চলছেন কষ্ট করে। অন্তত চার বছর ধরে তাকে একটি শার্টে দেখেছি। গাঢ় সবুজ হাফহাতা চেকশার্ট। আলাপ হতেই নুরুদ্দিন মাঝির জবাব, ভালো আছি।

গোধূলি পার হতে না হতেই ঢালচরের হাওলাদার বাজার আলোকিত হয় জেনারেটর চালিত বৈদ্যুতিক আলোতে। বাজারের মধ্যখানে মেহেদি হাসানের ওষুধের দোকানে অনেক মানুষের ভিড় জমে। এখানে এবার আবদুল হাই-এর সঙ্গে দেখা। দূর থেকে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলেন। বনের কাছে বাড়ি বলে এখনও আছেন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ভাঙনের মুখে পড়েছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কয়েকজন নতুন শিক্ষক যোগ দিয়েছেন। এদের কে কোন বাড়িতে খাবেন, পড়াবেন, সে ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন ঢালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন। নতুন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তার একটি বাক্য বেশ দাগ কাটে- ‘এমন সময় আপনারা এলেন, ঢালচরের আর কিছুই নেই।’

এবার ঢালচর ঘুরে শিক্ষক জামাল উদ্দিনের এই কথাটাই বারবার মনে পড়ছিল। ষাটোর্ধ্ব জেবল হক অনেক আগেই ঢালচর ছেড়েছেন। যার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে একাধিকবার। তার বাড়ি পর্যন্ত ঘুরেছি। বাড়ির পাশে সত্যেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জমিদাতা এই জেবল হক। শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে এখান থেকে চলে গেছেন। স্কুল ভবনটিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। জেবল হকদের তালিকা এখানে অনেক লম্বা। এবার ঢালচরে দেখি শুধু বিদায়ের যাত্রা আর কান্নার রোল। মাত্র একদিন আগে সাইফুল হাজীর দু’বোন চলে গেছেন ঢালচর ছেড়ে। যাওয়ার সময় হৃদয়বিরাকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সাইফুল হাজী সে কথাই জানাচ্ছিলেন টাওয়ার বাজারে ফারুক বাথানের চায়ের দোকানে বসে আলাপে। ছোটবোন কুলসুম বিবি আর সাহেরা বিবিকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু আর থাকা হলো না একসঙ্গে।

কাপড়ের বড় ব্যবসা থেকে নামতে নামতে ফারুক বাথানের ব্যবসা এখন ঠেকেছে চায়ের দোকানে। টাওয়ার বাজারে, হাজী মার্কেটে, বিভিন্ন স্থানে ব্যবসা ছিল তার। এখন একেবারেই শেষ পর্যায়ে। টাওয়ার বাজারের শেষ মাথায় ছোট চায়ের দোকানে যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন দোকানের দিকে তাকিয়ে দেখি কোন মালামালই নেই। দোকানটি ভাঙনের কিনারে। যেকোন সময়ে ভেঙে পড়তে পারে। সামনে নূর ইসলামের হোটেল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আগেরদিন। পরোটা ভাজার উনুন পড়ে আছে। সেখানেই আগেরদিন পরোটা ভাজতে দেখেছি, ডিম ভাজতে দেখেছি। ফারুক বাথানও এখানে থাকতে পারবেন না। টাওয়ার বাজারের মালামাল ওঠানামার জন্য এখানে লঞ্চ ভেড়ে বলে চা-পান কিছু বিক্রি হয় বলে দোকানটি বসিয়ে রেখেছেন।

পুরানো নোটবুক আর ফটোফোল্ডার খুঁজে দেখি। না, বেশিদিন হয়নি, মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে ঢালচর যেন একেবারেই বদলে গেল। ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি দেখেছি ভাঙনের কিনারে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, গ্রামীণ ফোন টাওয়ার, বাজারের টিনশেড ঘর, পাকা রাস্ত- সবই ছিল। কিন্তু এবার এসে এই জায়গাটি একেবারেই অচেনা লাগছে। বাজারের পেছনে মাদ্রাসার শিক্ষক আনিছুুর রহমান একটি সুন্দর টিনের ঘর বানিয়েছিলেন। পরিবারসহ সেখানেই থাকতেন। পাশে ছিল তার সবজি ক্ষেত। ঘরের কাছে নারিকেল গাছ। ঘরের পেছনের খোলা মাঠ পেরিয়ে অন্তত ১০ মিনিট হাঁটলে নদীর দেখা মিলত। এগুলো সবই এখন ঢালচরবাসীর কাছে স্মৃতি। আর সেইসব স্মৃতির কিছু অংশ রয়ে গেছে আমার ফটোফোল্ডারে। ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ভেঙে যাওয়ার পর দাপ্তরিক কাজ স্থানান্তর হয়েছে হাওলাদার বাজারে। পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয় আগেও হাওলাদার বাজারে ছিল। তবে বাজারটি তখন ছিল আরেকটু পূর্ব দিকে। ঢালচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা, গ্রামীণ ফোন টাওয়ারসহ সব প্রতিষ্ঠান এখন জড়ো হয়েছে কোস্ট ট্রাস্ট অফিসের নিকটে, যেখান থেকে ভাঙন এখনও একটু দূরে আছে। কিন্তু ভাঙন যেভাবে এগিয়ে আসছে, কতদিন আর দূরে থাকবে বলা মুশকিল। 

ভদ্র পাড়ার জাফর মিয়া, বয়স ৬০। চল্লিশ বছর আগে এসেছিলেন এখানে। তখন কিশোর। বাবার সঙ্গে এখানে এসেছেন। এখানে বিস্তৃত হয়েছে তার শেকড়। বিয়ে করেছেন, স্বজনের সংখ্যা বেড়েছে। সপ্তাহখানেক হয় এখান থেকে বাড়িঘর সরিয়েছেন। কিন্তু বিদায় বললেই তো বিদায় নেওয়া যায় না! কিছু গাছপালা, মালামাল এখনও আছে এখানে। তার এখানে দীর্ঘ জীবনের গল্পটা বেশ লম্বা এবং হৃদয়বিদারক। ব্যবসা বাণিজ্য বেশ ভালোই করেছিলেন; কিন্তু দুর্ঘটনায় সব হারিয়েছেন। এবার বাড়ি সরিয়ে নেওয়াটা তার জীবনের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা। সামাল দিয়ে ওঠা খুব কঠিন হবে! ঢালচর কীভাবে আপনার মনে থাকবে- এমন প্রশ্ন করতেই জাফর মিয়া হাইমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আমি অপ্রস্তুত। আসলে যে মানুষটার প্রায় সারাজীবন এখানে কেটেছে, ঢালচর থেকে চলে গেলেও ঢালচরের স্মৃতি তো সর্বক্ষণ তাকে কাঁদাবে। জাফর বললেন- কী ছিল না ঢালচরে? অনেক লড়াই। অনেক যুদ্ধ। ঝড়ের তা-ব। তারপর কিছু স্বস্তি। দুঃখ কষ্ট নিয়েই ঢালচরে ছিলাম। সেই ঢালচর ছেড়ে কী যেতে মন চায়?

সাইফুল হাজী, বয়স ষাট পেরিয়েছে। ঢালচরের মান্য মানুষ। এক সময় অনেক জমিজমার মালিক ছিলেন। নিজের নামেই ছিল হাজী মার্কেট। নিজের সাজানো গোছানো সুন্দর বাড়ি। নিজেরই বাড়ি ছিল ৫টি। একে একে সব হারিয়েছেন। শেষ বাড়িটিও এখান থেকে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের দিকে এসেছিলেন ওপার থেকে। এখন আবার ওপারেই চলে যেতে হচ্ছে। কীভাবে মনে রাখবেন ঢালচরকে- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢালচর আমরা কীভাবে ভুলবো? এখানেই তো সব ছিল। ব্যবসা, আত্মীয়-স্বজন, সম্পত্তি। কেউ বিপদে পড়লে স্বজনেরা যেভাবে এগিয়ে আসতো; সে পরিবেশ তো আর ফিরে পাবো না। পুরুষদের সঙ্গে হয়তো দেখা সাক্ষাত হবে হাটে বাজারে। কিন্তু অনেক নারীদের সঙ্গে আর কখনও দেখাই হবে না। পরিবারগুলো বিচ্ছিন্নভাবে যে যেখানে পারছে যাচ্ছে।

বাড়ির সামনের মসজিদটি সাইফুল হাজী স্থানান্তর করেছেন অনেকবার। এখন আবারও ভাঙতে হলো। কোথায় নেবেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, আর তো নেওয়ার জায়গা নেই। মানুষজনই তো থাকতে পারছে না। আমিও থাকছি না। এখন ওপারে নিয়ে যেতে হবে। তিনি জানালেন, ঢালচরের ধর্মপ্রাণ মানুষেরা প্রতিবছর বর্ষার আগে বড় হুজুর ডেকে দোয়া পড়াতেন। সব মসজিদে এই রেওয়াজ ছিল। হুজুর মোনাজাত করতেন। সবাই অংশ নিতেন। হুজুর বলেছিলেন, ময়দার চাকা করে নদীতে ফেলো। আমরা ফেলেছি। হুজুরের নির্দেশ ছিল, নদীর পাড়ে পায়খানা রেখো না, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি এগুলো বন্ধ করো। এগুলো হয়তো আমরা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারিনি। তাই হয়তো প্রকৃতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন আমাদের দিক থেকে। জানি না, আল্লাহই ভালো জানেন।

 

ঢাকা/তারা