ঢাকা, শনিবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৩০ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাভাইরাস: সৌখিন ফটোগ্রাফারদের আহ্বান

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৯ ৪:১৯:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৯ ৪:১৯:৪৫ পিএম

সাম্প্রতিক বিশ্ব ইতিহাসে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এত বড় মানব-বিপর্যয় আর দেখা যায়নি। বিশ্বের প্রায় দুইশ দেশ লড়ছে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার এবং জনগণ এই বিপর্যয় মোকাবিলায় কাজ করছে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন না হলে পরিণতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন মানবিক সংগঠন, ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে।

বাংলাদেশে সৌখিন আলোকচিত্র শিল্প চর্চা এখন খুবই জনপ্রিয়। বিশেষ করে বিভিন্ন স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ফটোগ্রাফারদের কেন্দ্র করে এর ফলোয়ারের সংখ্যাও কম নয়। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে তারাও এগিয়ে এসেছেন। রাখছেন জনকল্যাণমূলক ভূমিকা। এ বিষয়ে আমরা রাইজিংবিডির পক্ষ থেকে দেশের খ্যাতনামা কয়েকজন আলোকচিত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তাদের বক্তব্য নিয়েই এই প্রতিবেদন।

অধ্যাপক ডা. নামজুল হক পেশায় চিকিৎসক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। অবসর জীবনে তিনি সৌখিন ফটোগ্রাফার। দেশ-বিদেশে ছুটে বেড়ান ছবি তোলার জন্য। বিশেষ করে পাখির ছবির তোলা তার অন্যতম শখ। করোনাভাইরাস থেকে দূরত্ব বজায় রাখা, বিশেষ করে নিজেকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রাখাই এর অন্যতম প্রতিষেধক বলে মনে করেন তিনি। এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে তিনি জানান। যার যার অবস্থান থেকে এ কাজটি করতে হবে। একই সঙ্গে সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধুতে হবে, পরিষ্কার থাকতে হবে। মুখে, নাকে এবং চোখে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এই তিন মাধ্যমেই করোনাভাইরাস মানব দেহে সংক্রমিত হয়।

তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার উপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারন এ রোগের জীবাণু একজন থেকে আরেকজনের সংস্পর্শে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। জনসমাগম যাতে বেশি হতে না পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। হাট-বাজার, চায়ের দোকান, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনসহ পাবলিক প্লেসগুলো জনমানব শূন্য রাখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়তে গিয়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। কারণ একজনের কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করতে হয়। এক্ষেত্রে করোনাভাইরাস বহনকারী কোন ব্যক্তি যদি সেজদায় গিয়ে হাঁচি দেন বা নিঃশ্বাস ফেলেন তাহলে তার মাধ্যমে অন্যেরা আক্রান্ত হবে। একজন থেকে আরেকজনের দূরত্ব হতে হবে দুই মিটার অর্থাৎ প্রায় ছয় ফুট। মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়কালে এটা মানলে অবশ্য সমস্যা নেই। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা এ ব্যাপারে সচেতন নই। 

নাজমুল হক বলেন, করোনাভাইরাস কে বহন করছে তাৎক্ষণিকভাবে বলা যায় না। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তিও অনেক সময় বুঝতে পারেন না। আমরা এখন যে স্তর অতিক্রম করছি সেটা বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ‘ট্রিপল টি’ অর্থাৎ টেস্ট, টেস্ট অ্যান্ড টেস্ট পদ্ধতি অবলম্বন করতে পরামর্শ দিয়েছে। আমাদের এখন সময় এসেছে দ্রুত সে ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার। এ জন্য সর্বাগ্রে চিকিৎসক ও সেবিকাদের জন্য পার্সোনাল  প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং আনুষঙ্গিক সব কিছু সহজলভ্য করতে হবে। কারণ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে  পড়বে।

সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে জানিয়ে অধ্যাপক নাজমুল হক বলেন, তবে তা অপ্রতুল।  আর সরকারের একার পক্ষে এত বড় একটি দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষকে যে কোন উপায়ে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হবে। ভাইরাসে আক্রান্ত যারা এবং যারা এখনো আক্রান্ত হননি তাদেরও আলাদা ঘরে অবস্থান করতে হবে। আর সব নিয়ম মেনে চলতে হবে।

শামীম আলী চৌধুরী বার্ড বাংলাদেশের মহাসচিব এবং উন্নয়নকর্মী। গ্রামীণ স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন এমন একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত। তিনি বলেন, মানুষ সামাজিক জীব। প্রত্যেক মানুষ সমাজে সামাজিক বন্ধন দ্বারা আবদ্ধ। মানুষ তখনই এই বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া শুরু করে যখন কোনো বিপর্যয় বা মহামারি দেশে বা সমাজে আবির্ভূত হয়। তাই মানুষ এই বিপর্যয় বা মহামারি মোকাবিলা করতে বেছে নেয় বহুবিধ পন্থা। বেশ কয়েক ধরনের পন্থার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে কোয়ারেন্টাইন।

কোয়ারেন্টাইন হলো লোকজন বা পণ্যসামগ্রী চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক অবস্থা বা প্রোটোকল। যা রোগ বা জীবনী বিস্তর প্রতিরোধ করে। এই শব্দটির অর্থ হচ্ছে সঙ্গরোধ। এই শব্দটির উদ্ভোব ঘটেছে ‘কোয়ারেন্টেনা’ নামক ভেনেটিক শব্দকোষ থেকে। যার অর্থ দাঁড়ায় ১৪ দিন।

কোয়ারেন্টাইন শব্দটি প্রায়ই রোগ ও অসুস্থতার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় ঐ সমস্ত ব্যক্তিবর্গের চলাচল রোধ করতে যারা বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগের শিকার হতে পারেন। এই টার্মটি মেডিকেল আইসোলোশান বা চিকিৎসা বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত হয়। কোয়ারেন্টাইন শব্দের আরেকটি নাম হচ্ছে দঈঙজউঙঘ ঝঅঘওঞঅওজঊ' যা উল্লেখ করে একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার ভিতরে বা বাহিরে সংক্রমনের বিস্তার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের সকল প্রকার চলাচল বন্ধ।

এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের মধ্যে পার্থক্য কী? আইসোলেশন কেবল অসুস্থ বা আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা সুস্থ মানুষদের থেকে আলাদা থাকে। আর কোয়ারেন্টাইন হচ্ছে সুস্থ মানুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের মাঝে সংক্রমনের নিশ্চয়তা থাকতে পারে এবং তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের থেকে নির্দিষ্ট একটি এরিয়ায় অবস্থান করে।

আমাদের দেশে কঙঠওউ-১৯ সেরোটাইপ (যা করোনাভাইরাস বহন করে) দেখা দেয়ায় সংক্রমণের আগেই নিজেকে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত রাখার জন্য স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে যাই। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বা আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই ভাইরাসটি ছড়ায় বিধায় নিজেদের নিরাপদ রাখতে প্রত্যেক ব্যক্তির হোম কোয়ারেন্টাইনে চলে যাওয়া বাধ্যতামূলক বা উত্তম অবলম্বন। যেহেতু এই ভাইরাস বায়ুবাহিত নয় এবং এই  অনুজীবটির আনবিক ওজন ভারী হওয়ায় নিজেদের সুরক্ষার জন্য একে অপর থেকে দুই মিটার বা ছয় ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। 

মাসুদ রানা, পেশায় পুষ্টিবিদ এবং উন্নয়নকর্মী। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, উগান্ডার এক মন্ত্রী বলেছিলেন কোভিড-১৯ নাকি মৌসুমি সর্দি-জ্বরের মতো, তাই ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তবে আসুন দেখি কথাটা কতটা সত্য জেনে নেই। প্রথমে দেখি, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ হার কেমন? সংক্রমণ হার মাপা হয় ‘আর নট’ ভ্যালু দিয়ে। একজন সংক্রামিত ব্যক্তি থেকে যদি পাঁচজন নতুন ব্যক্তিতে ছড়ায় তবে তার ‘আর নট’ ভ্যালু ৫। মৌসুমি সর্দি-জ্বরের ‘আর নট’ ভ্যালু ১.৩। মানে, একজন সংক্রামিত ব্যক্তি থেকে ১.৩ জন নতুন ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে আর কোভিড-১৯ এর আর নট ভ্যালু ৩। মানে, একজন সংক্রামিত ব্যক্তি থেকে ৩ জনে ছড়াতে পারে যা মৌসুমি সর্দি-জ্বরের চেয়ে ২.৩ গুন বেশি। এই মান কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে এত ব্যবস্থা নেওয়ার পরও মৌসুমি সর্দি-জ্বরের চেয়ে বেশি। আর যদি কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হতো তবে কি হতো একবার ভেবে দেখুন।

মাসুদ রানা বলেন, না ভেবে চলুন হিসাব করি। প্রতিবছর মৌসুমি সর্দি-জ্বরে বিশ্বের ৯ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়। যদি আমরা কোভিড-১৯-কে মৌসুমি সর্দি-জ্বরের সঙ্গে তুলনা করি তবে বিশ্বব্যাপী ২০.৭ শতাংশ মানুষ তথা, ১৪৫ কোটি মানুষ কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে পারে। বর্তমানে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে মৃত্যুর হার ৩.৪ শতাংশ। তাই কোভিড-১৯-এ মারা যেতে পারে প্রায় ৫ কোটি মানুষ। তাই এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে বর্তমানে লক ডাউন ছাড়া উপায় নেই। 

মাসুদ রানা হোম কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা সফল করতে হবে জানিয়ে বলেন, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বুঝতে সময় লাগে প্রায় ১৪ দিন। এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তিটিও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। কে সুস্থ আর কে সুপ্তভাবে আক্রান্ত পার্থক্য করা মুশকিল। তাই লক ডাউন বা হোম কোয়ারেন্টাইন ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

মো. শরীফ উদ্দিন অপূর্ব সৌখিন ফটোগ্রাফার, প্রশিক্ষক এবং ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের জন্য জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ বদলে গেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকলেও আমি এই সময়ে ছবি এডিটিং, ছবি বাছাই এবং ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে সময় পার করছি। ছবির মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক পোস্ট করে জনগণকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করছি। এই সময়ে মানসিক, শারীরিক সুস্থতার জন্য ব্যায়াম জরুরি। ভিটামিন-সি, সবুজ সবজিসহ সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি সবাইকে। আমি নিজের গামছা আলাদাভাবে ব্যবহার করছি। জরুরি কারণে বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করছি, ঘন ঘন হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিচ্ছি। ঘরের দরজার হাতলে স্যানিটাইজার মিশিয়ে টিস্যু দিয়ে পরিষ্কার  রাখছি, নিজের কম্পিউটার, ফোন পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করছি। আমি মনে করি, এই দুর্যোগময় মুহূর্তে আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে কোয়ারেন্টাইনে থাকার গুরুত্ব বুঝতে হবে। দুর্যোগকালে বাঙালি জাতি সব সময় ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করার ঐতিহ্য রয়েছে।


ঢাকা/হাসনাত/তারা