ঢাকা, রবিবার, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৩১ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ভাইরাস ছড়িয়ে চীনের বিশ্ব দখলের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

খালেদ সাইফুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৬ ৩:৩০:০১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৬ ৭:১৬:৩৩ পিএম

করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী বিপর্যস্ত করে তুলেছে মানুষকে। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ভাইরাসটি ছড়াতে শুরু করে।

ভাইরাস ছড়ানোর পেছনে চীনকেই দায়ী করছেন অনেকে। কন্সপিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথাও বলছেন অনেকে। বিশ্বের অনেক মানুষের মধ্যেই এই বিশ্বাস রয়েছে যে, চীন জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করে বিশ্ববাণিজ্য হাতের মুঠোয় আনতে চায়। বিষয়টি নিয়ে ইউটিউবে অনেক ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ সেগুলো আগ্রহ ভরে দেখছে। অনেকে মন্তব্যও করছে। ভিডিওগুলো ইতোমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। দিন যত যাচ্ছে এসব কারণে মানুষ কথাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তাদের সেই বিশ্বাসের পালে হাওয়া দিচ্ছে সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনা।

জীবাণুু অস্ত্রের মাধ্যমে কারোনা ছড়ানোর দায়ে চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার একটি আদালতে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে চীনের বিরুদ্ধে জীবাণুু অস্ত্র ছড়ানোর কথা প্রথম বলে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি শোহাম। তার সঙ্গে সুর মেলান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে ঠিক উল্টোটাই করেছে চীন এবং ইরান। এই দুই রাষ্ট্র আঙুল তুলেছে ট্রাম্পের দিকে। চীন ও ইরানসহ বিশ্বের অনেক মানুষই কোভিড-১৯-কে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি জীবাণুু অস্ত্র বলে বিশ্বাস করেন। তবে ভাইরাসটি ছড়ানোর পরপরই উহানের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিল ভাইরাসটি ছড়িয়েছে স্থানীয় একটি মাছ-মাংসের বাজার থেকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, এই ভাইরাস চীনের উহানের স্থানীয় পশুর মার্কেট থেকে ছড়িয়ে পড়েছে, এখন পর্যন্ত এটাই প্রমাণিত। বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাসের যে জিন রহস্য (জীবনরহস্য), তা পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে, এটি গবেষণাগারে তৈরি কোনো ভাইরাস নয়।

ভাইরাস ছড়ানোর দায়ে চীনকে যারা দুষছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের আধিপত্যের লড়াইকে বারবার সামনে নিয়ে আসছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের আধিপত্যের লড়াইটা মূলত বাণিজ্য ক্ষেত্রে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উপনিবেশ গুটিয়ে নিতে শুরু করলে বিশ্বব্যাপী একচেটিয়া কর্তৃত্ব বিস্তার করে আমেরিকা। নয়া সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্বে বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় দেশটি। তখন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক উন্নতির ইতিহাস খুবই অল্প সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাত্রা বৃদ্ধি পায় ৯০-এর দশকে। মাত্র ৩০ বছরে তারা উল্লেখযোগ্যভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে। বাণিজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়ে বিশ্বের সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে চীন। বর্তমানে বিশ্বের মোট সম্পদের ১০ শতাংশ চীনের দখলে। ২০১৮ সালে চীন ২৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য উৎপাদন করে বিশ্ব অর্থনীতিতে শীর্ষে অবস্থান করে, যেখানে আমেরিকা ২০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার উৎপাদন করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

চীনের এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সেখানকার অল্প মূল্যের শ্রম। চীনের রয়েছে বিপুল দক্ষ জনবল। এই জনবল কাজে লাগিয়ে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে পারে চীন। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে চীনের পণ্যের বিপুল চাহিদা। ইলেকট্রনিক্স পণ্য থেকে শুরু করে মোটরযান উৎপাদনে চীন হয়ে উঠেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিশ্বের সর্ববৃহৎ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশও চীন। এছাড়াও চীনের পণ্য পরিবহণের গতিও সবচেয়ে দ্রুতগামী। এসব কারণে দেশটির সাথে বাণিজ্য চুক্তিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। ফলে সেসব দেশে আমেরিকার পরিবর্তে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের এই আধিপত্যের ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধও চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্য রপ্তানির উপর শুল্ক বাড়িয়ে ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের উপর শুল্ক বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়না কোম্পানি হুয়াওয়ের পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপও করেছিল, যদিও পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এত কিছুর পরও বিশ্ব নেতৃত্বে নিজ অবস্থান ধরে রেখেছে আমেরিকা। তবে করোনা পরবর্তী বিশ্বের নেতৃত্বে আমেরিকা থাকতে পারবে কিনা এমন সংশয় তৈরি হয়েছে ইতোমধ্যে। কারণ করোনার সংক্রমণ চীনে প্রথম শুরু হলেও এখন সেখানকার লকডাউন তুলে নেওয়া হয়েছে। চীনের পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ স্বাভাবিক। অন্যদিকে আমেরিকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দেশটির অর্থনীতি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এমতাবস্থায় করোনা শনাক্তের কীট থেকে শুরু করে চিকিৎসাসরঞ্জাম, সব কিছুর জন্যই চীনের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব। এভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে আমেরিকা থেকে চীনের উপর নির্ভরশীল হবে অনেক দেশ। ফলে ধীরে ধীরে বিশ্বের নেতৃত্ব চীনের হাতেই আসবে এমন ধারণা করছেন অনেকেই। এ কারণেই অনেকে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে বলতে শুরু করেছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই চীন এই দুর্যোগ ডেকে এনেছে।


ঢাকা/তারা