ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

এসো মীনা’র কথা শুনি

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-৩০ ২:০৫:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-৩০ ২:০৫:২২ পিএম

করোনার ক্রান্তিকাল চলছে। প্রকৃতির নিয়ম সবই ঠিক আছে। নিয়ম ভেঙেছে শুধু জনজীবনের ধারাবাহিকতা। এর প্রভাব পড়েছে শিশুদের জীবনে। শৈশবের দৈনন্দিন রুটিন এমন হওয়ার কথা ছিল না; তবুও হয়েছে। প্রভাব পড়েছে শিক্ষায়, চাপ বেড়েছে মননে। করোনাকালীন নিষেধাজ্ঞায় কেমন আছে প্রান্তিকের শিশুরা? এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ শেষ পর্ব।

‘বাবা, তুমি জানো না! মীনা এভাবে হাত ধোয়া শিখিয়েছে। যেখানে-সেখানে থুথু ফেললে রোগবালাই হয়। ভাইরাস আক্রমণ করে।’- শিশু আয়শা কিংবা সনিয়া বাবা সানাউল্লাহ সানুকে এভাবেই বুঝিয়ে দেয় মীনার শিক্ষা। উপকূলের বহু স্থানে দেখা গেছে বাবা-মায়ের বদলে শিশুদের আইডল হয়ে উঠছে মীনা। আয়শা সিদ্দিকা আর সানিয়া আক্তার দুই বোন। একজন পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণীতে; আরেকজন স্কুলে পা রাখেনি এখনও। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মার্টিন গ্রামে তাদের বাড়ি। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সেই অবধি পৌঁছেছে মীনার বার্তা। 

আয়শা-সানিয়ার মতো এমন আরও অনেক শিশু মীনাকে অনুসরণ করে। তবে প্রান্তিকের অনেক শিশুর কাছে মীনার বার্তা পৌঁছেনি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে কিংবা ইন্টারনেট সুবিধা না থাকা এর কারণ। কমলনগরের তোরাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সানাউল্লা সানু বলেন, শিশুদের জন্য মীনা কার্টুন সিরিজ খুবই কার্যকর। এই সিরিজ যারা দেখছে; ওদের কাছে বাবা-মায়ের চেয়েও মীনা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন আমার মেয়েরা আমাদের কথা শোনে না। তারা শোনে মীনার কথা। মীনার রেফারেন্স দিয়ে বলে, মীনা এভাবে করেছে। ওভাবে বলেছে।
ভাইরাস প্রতিরোধ বিষয়ক মীনার কার্টুনটি ছেলেমেয়েরা দেখলে তাদের সচেতনতা বাড়বে জানিয়ে সানাউল্লা সানু বলেন, তারপরও ভয় তো আমাদের আছেই। কেননা, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ। ফলে বহু ছেলেমেয়ের লেখাপড়াও বন্ধ। এ কারণে শিশুমনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

খুলনার মংলা উপজেলার চিলা গ্রামের চতুর্থ শ্রেণী পড়–য়া শিশু হাফসা নূর মীনাকে চেনে। টেলিভিশনে মীনাকে দেখে হাতধোয়া এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বার্তা সে পেয়েছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হরিনগরের পঞ্চম শ্রেণী পড়–য়া শিশু রাফসানও এভাবেই শিখেছে করোনাকালে কীভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে। 

বিশ^ব্যাপী করোনার ভয়াবহতা বিস্তার হওয়ার পর শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার ও বিশ^ নেতাদের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মন্দা এগিয়ে আসছে, এতে ২০২০ সালে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে। জাতিসংঘের শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে। শিশুরা খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। বিশে^ ৩১ কোটি স্কুল শিশুর নিয়মিত পুষ্টি জোগাতে স্কুলগুলোতে যে খাবার সুবিধা দেয়া হতো, তা থেকে এই শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৮৮টি দেশে স্কুল বন্ধ রয়েছে। এতে ১৫০ কোটির বেশি শিশু ও তরুণ দুর্ভোগে পড়েছে। বাংলাদেশের শিশুরা এর বাইরে নয়।   

করোনা পরিস্থিতির এই সময়ে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়ে ইউনিসেফ সুস্পষ্ট পরামর্শ দিয়ে বলেছে, শিশুরা কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে সে সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতে হবে। সর্বোত্তম পদ্ধতিতে হাত ধোয়া ও স্বাস্থ্যবিধি বা হাইজিন অনুশীলন পদ্ধতি প্রচার করা ও হাইজিন পণ্য সরবরাহ করতে হবে। এছাড়াও স্কুল ভবনগুলো, বিশেষত পানীয় এবং স্যানিটেশন সুবিধাসমূহ, পরিস্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে বলা হয়েছে। ইউনিসেফের পরামর্শে আরো বলা হয়েছে, শিশুদের শারীরিক সুস্থতার দিকে নজর রাখা এবং অসুস্থ হলে তাদের ঘরে রাখতে হবে। শিশুদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে এবং তাদের উদ্বেগগুলো প্রকাশ করতে উৎসাহিত করতে হবে। টিস্যুপেপার বা নিজের কনুই দিয়ে ঢেকে কাশি বা হাঁচি দেওয়া এবং নিজের মুখমন্ডল, চোখ, মুখ এবং নাক স্পর্শ না করার পরামর্শও রয়েছে। মীনা কার্টুন সিরিজের ‘মীনার অভিযান’ পর্বটি যেন ইউনিসেফের এই বার্তা বহন করছে। ফলে মীনা কার্টুনের এই বার্তা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্রগুলো বলছে, করোনা পরিস্থিতিতে শিশুরা দু’ধরনের চাপে পড়ে আছে। প্রথমত, করোনার ভয়; দ্বিতীয়ত বাবা-মায়ের ভয়। এই সমস্যা মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থায় মস্তিস্ক চাপমুক্ত রেখে আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করার তাগিদ দেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হলে শিশুদের জন্য আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, শিশুদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়াতে পারে শিল্পচর্চা। অভিনব চিন্তার মাধ্যমে শিশুরা বহুবিধ শিল্পচর্চার সুযোগ পেলেই তার সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। এভাবে সে অসাধারণভাবে ভাবতে শেখে, চিন্তা করতে শেখে। আর এগুলোই তাকে সমস্যা সমাধানের পথ দেখাতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, প্রথমত এখন শিশুরা ঘরে বন্দি আছে। বিদেশে বাচ্চাদের তাদের মতো ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘরে থাকলেও ওরা ওদের মতো থাকুক। ওরা ওদের মতো বড় হওয়ার সুযোগ পেলে মেধার বিকাশ ঘটবে। ওরা কোনো বিষয়ে উদ্বিগ্ন হবে না। শাসন মানে তো এক ভয়। এই ভয় কাটিয়ে তুলতে হবে।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মো. মাহবুবুর রহমান হৃদয় বলেন, আমরা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সবাই আতঙ্কিত, অনেক বেশি ভীত হয়ে পড়ছি। যা থেকে আমাদের মানসিক চাপটা বাড়ছে। যেটাকে জেনারেল আ্যাঙজাইটি ডিসঅর্ডার বলে। এ অবস্থায় শিশুদের প্রতি বিশেষ যতœ নিতে হবে। শিশুদের অনন্দঘন পরিবেশ দিতে হবে। শিশুদের সঙ্গে বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে খেলতে হবে। পড়াশোনার জন্য চাপ দেওয়া যাবে না। শিশুদের নিজেদের মতো করে লেখাপড়া করার সুযোগ দিতে হবে। ছবি এঁকে, নাচ-গান করে তাদের ভালো রাখতে হবে।

ইউনিসেফের শিশু বিশেষজ্ঞ ইকবাল হোসেন বলেন, বড়দের উৎকণ্ঠার প্রভাব শিশু মনকে প্রভাবিত করে। দৈনন্দিন একাডেমিক প্ল্যান করে ওদের পড়াশোনায়  উৎসাহ দিতে হবে। যাতে শিশুরা এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ঘরের পরিবেশ যতটা সম্ভব আনন্দময় রাখতে হবে; যাতে শিশুদের কাছে ঘর উপভোগ্য হয়।

প্রথম পর্ব : করোনাকালে বন্দি দুরন্ত শৈশব

দ্বিতীয় পর্ব : আবার কবে স্কুলে যাবো?


ঢাকা/তারা