ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনায় মায়েদের আত্মত্যাগ

শাহিদুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১০ ১:৪৪:২১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১০ ১:৫২:০৮ এএম

মা। এক অক্ষরের এই শব্দটি যেন ভালোবাসা ও ত্যাগের পরিশব্দ। করোনার এই কঠিন সময়ে হাজারো মা নিজেদের কথা, স্বামী-সন্তানের কথা ভুলে মানব সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। বিশ্ব মিডিয়ার উঠে এসেছে তেমন কয়েকজন মায়ের আত্মত্যাগের কাহিনী।

রাইচেল প্যাটজার
মহামরী বিশেষজ্ঞ রাইচেল কাজ করেন নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে। তার স্বামীও ডাক্তার। তাদের সন্তানের বয়স মাত্র তিন সপ্তাহ। তবে এতটুকু দুধের বাচ্চাকে মাতৃ আদর থেকে বঞ্চিত রেখে রাইচেল নিজেকে সঁপে দিয়েছেন করোনা রোগীদের সেবায়। হাসপাতাল থেকে কাজ শেষ করে রাইচেল বাসার নিচতলার একটি গ্যারেজে থাকে। স্বামী ও দুধের শিশুকে দুর থেকে একনজর দেখাই তার নিয়তি।

রাইচেলের এই ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টুইট করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এমন সম্মান পেয়ে অবিভূত রাইচেল। ডেইলি মেইলকে তিনি বলেন, ছোট্ট শিশুকে ফেলে এই সংকট কালীন সময়ে দায়িত্ব নেয়া আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু আমি তো ডাক্তার। একজন ডাক্তার হয়ে মহামারীতে আমার রোগীদের অপ্রতুল চিকিৎসায় মরতে দিতে পারি না।'

জেসিকা চ্যান
জেসিকা চ্যান নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল হাসপাতালের একজন নার্স। ব্যক্তিগত জীবনে দুই বছর বয়সী যমজ সন্তানের জননী তিনি। গত দুইমাস ধরে টানা হাসপাতালে ডিউটি করছেন জেসিকা। সন্তানদের পাঠিয়ে দিয়েছেন নিউইয়র্কের বাইরে দাদা-দাদীর কাছে। সন্তানেরা কোনভাবেই জেসিকাকে ছেড়ে যেতে রাজি ছিল না। কিন্তু মানব সেবার ব্রত নেয়া জেসিকার কাছে সন্তানের কান্না নয় করোনা রোগীর কান্না কানে বেশি লেগেছে। আর তাইতো তাদের আর্ত চিৎকারকে উপেক্ষা করে জেসিকা দিনরাত এক করে করোনা রোগীদের সেবা করছেন।

ডা. শিরিন
ডা. শিরিন কর্মরত রয়েছেন ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। বাংলাদেশের করোনা রোগীদের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল।ব্যক্তিগত জীবনে ডা. শিরিন এক সন্তানের জননী। তার মেয়ের বয়স ছয় বছর। দুইমাস আগে বাংলাদেশে যেদিন প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয় ডা. শিরিন সেদিন থেকেই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। এই দুই মাসে তিনি একবারের জন্যও তার মেয়েকে আদর করেননি, কাছে টানেননি। টানা কয়েকদিন হাসপাতালে ডিউটি করে বাড়ি ফিরে দুর থেকে মেয়েকে, স্বামীসহ পরিবারের সবাইকে দূর থেকে দেখছেন। থাকছেন একেবারে আলাদা কক্ষে। এভাবেই গত দুইমাস কাটছে এই ডাক্তার মায়ের।

বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডা. শিরিন বলেন, আমি আমার মেয়েকে বুঝিয়েছি, করোনা ভাইরাস কতটা বিপজ্জনক। কিভাবে এটা মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। সে বুঝেছে। তবে আমি বুঝি সে আমাকে কতটা অনুভব করে।

জেসোইন ইকোলাই
জেসোইন ইকোলাই কাজ করতেন ইংল্যান্ডের হ্যারোগেট ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে। ব্যক্তিগত জীবনে পাঁচ সন্তানের জননী তিনি। ইংল্যান্ডে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই তিনি হ্যারোগেটে কাজ করছেন। কিছুদিন কাজ করার পর হঠাৎ হাসপাতালে পিপিই সংকট দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে অনেকে কাজ বন্ধ করলেও পিপিই ছাড়াই কাজ চালিয়ে গেছেন জেসিকা। তার সন্তানেরা অনেক অনুরোধ করেও জেসিকাকে পিপিই ছাড়া কাজ করতে বিরত রাখতে পারেনি। ফলাফল সেবা করতে করতে তিনিও করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়েন। গত সপ্তাহে জেসিকা মারা যান। মারা যাওয়ার আগে গণমাধ্যমকে জেসিকা বলেন, আমি হয়ত সন্তানদের কথ শুনলে আরও কিছুদিন বেচে যেতাম। তবে মানবতার কাছে হেরে যেতাম।'

ডা. ফারহানা হক হ্যাপী
ডা. ফারহানা হক হ্যাপীও কাজ করছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। ব্যক্তি জীবনে ডা. ফারহানা এক সন্তানের জননী৷ তার মেয়ের বয়স মাত্র সাত মাস। এখনও বুকের দুধ পান করে। তবে কর্তব্যের কাছে নিজের এই ছোট্ট সন্তানের মায়াকে উৎসর্গ করেছেন তিনি। কোন ধরনের চাপে পড়ে ডা. ফারহানা কিন্তু সাত মাসের সন্তান ফেলে এই দায়িত্ব নেননি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এনেস্থেসিয়ায় ডিপ্লোমা শেষ করে স্বেচ্ছায় করোনা রোগীদের সেবায় নিজেকে সপে দিয়েছেন। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ডা. ফারহানা বলেন, আমরা যদি সেবা না দেয় তাহলে এইসব রোগীরা কোথায় যাবে? যে কোন পরিস্থিতে সেবা করাই তো ডাক্তারের ধর্ম। আমি যদি এই ধর্ম পালন না করি সেটা হবে অনুচিত ও অনৈতিক।


শাহিদুল ইসলাম/নাসিম