ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

বিতর্কিত স্মৃতিস্তম্ভ

ইকবাল মাহমুদ ইকু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:১২, ১০ জুলাই ২০২০  

পৃথিবীর নানা দেশে বিখ্যাত অনেক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। সাধারণত এসব স্মৃতিস্তম্ভ সম্মান প্রদর্শনের জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। কারণ বিশ্বে অনেক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধী, স্বৈরাচার নেতার। নানা সময় মানুষের তোপের মুখে অনেক স্তম্ভ ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আবার অনেক বিতর্কিত স্মৃতিস্তম্ভ এখনো দণ্ডায়মান। এমন দশটি বিতর্কিত স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন।

মাউন্ট রুশমোর

পাহাড়ের খাঁজ কেটে তৈরি করা হয়েছে মাউন্ট রুশমোর স্মৃতিস্তম্ভটি। গাটজন বর্গলাম নামে এক ব্যক্তি এটি ডিজাইন করেছেন। এই ভাস্করের সঙ্গে আমেরিকার বিতর্কিত শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য-বাদী সংস্থা কু ক্লুক্স ক্লান (কে, কে, কে)-এর জোড়াল সম্পর্ক রয়েছে। এই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য-বাদী সংস্থাটির প্রধান টার্গেট ছিল কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান-আমেরিকানরা। রুশমোর পাহাড়টি দক্ষিণ ডাকোটা অঞ্চলের বসবাসকারী ন্যাটিভ আমেরিকান অর্থাৎ রেড ইন্ডিয়ানদের এই গোত্র ‘সিয়োক্স’-এর ধর্মীয় এলাকা। পাহাড়টিকে তারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের আত্মার স্মরণে ‘সিক্স গ্র্যান্ডফাদার’ নামে নামকরণ করেছিল।

তবে শ্বেতাঙ্গরা রীতিমতো জোর করে তাদের কাছ থেকে পাহাড়টি নিয়ে নেয় এবং এখানে চারজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান নেতার মূর্তি স্থাপন করার মাধ্যমে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য-বাদকে আরো মজবুত করার চেষ্টা করে। এ চার নেতা হলেন—জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, থমাস জেফারসন এবং থিয়োডোর রুজভেল্ট। যদিও ১৯৮০ সালের দিকে আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট সিয়োক্স আদিবাসীদের পাহাড়টি ফিরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু তারা এটি ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে।

স্টোন মাউন্টেন

জর্জিয়া আটলান্টার অদূরেই স্টোন মাউন্টেন নামক এই প্রস্তর পাহাড়ে পাথর খোদাই করে তৈরি করা এই স্থাপত্যশিল্পটি দেখতে দারুণ হলেও পেছনে রয়েছে বিতর্কিত ইতিহাস। এই পাহাড়ে যে তিনজন আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ নেতার মূর্তি খোদাই করা হয়েছে, সেই তিনজন হলেন জেফারসন ডেভিস, জেনারেল রবার্ট লি এবং স্টোনওয়েল জ্যাকসন।

১৯১৫ সালের দিকে এই পাহাড়ে আফ্রিকান-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ গোত্রকে ভয় দেখানো এবং হুমকি প্রদর্শন স্বরূপ  ক্রুশ পোড়ানো হতো। এর মাধ্যমে তৎকালীন আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য-বাদকে প্রতিষ্ঠিত করা হতো। বিতর্কিত শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য-বাদী সংস্থা ‘কু ক্লুক্স ক্লান (কে. কে. কে)’ দ্বারা এই যজ্ঞটি পরিচালিত হতো।

নেলসন’স কলাম

লন্ডন শহরের একদম মধ্যভাগে ট্রাফেলগার স্কয়ারে এডমিরাল হরাশিও নেলসনের স্মৃতি স্মরণে মূর্তিটি স্থাপন করা হয়। এডমিরাল হরাশিও নেলসন ১৮০৫ সালে ট্রাফেলগার যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রিটিশদের কাছে তিনি রীতিমতো জাতীয় হিরো ছিলেন, কেননা তিনিই ফ্রেঞ্চ নেতা নেপোলিয়নকে পরাস্থ করেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখেন।

তবে চমৎকার এই বিষয় ছাড়াও এডমিরাল হরাশিও নেলসনের সঙ্গে বিতর্কিত ইতিহাস জড়িত আছে। আর সেটা হলো—তিনি দাস ব্যবসার একজন জোরাল সমর্থক ছিলেন। আর এ কথা আর নতুন করে বলাই বাহুল্য যে, তিনি ছিলেন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীর একছত্র অনুসারী।

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মূর্তি

ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের গল্প সবারই জানা। তবে কলম্বাসের যে গল্পটি আমাদের অনেকেরই জানা নেই, তা হলো—তিনি ছিলেন একজন বর্ণবাদী, এমনকি আমেরিকান আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে তার আচরণও ছিল বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। বলা হয় আদিবাসী আমেরিকানদের উপর তিনি রীতিমতো ভয়াবহ অত্যাচার করেছিলেন। কিছুদিন আগেই জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গা থেকে কলম্বাসের মূর্তি অপসারণ করা হয়েছে।

ক্যাপ্টেন জেমস কুক মূর্তি

ক্যাপ্টেন জেমস কুকের ইতিহাস প্রায় অনেকটাই কলম্বাসের সঙ্গে মিলে যায়। জেমস কুকও অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেছিলেন। তিনিও ঠিক কলম্বাসের মতো স্থানীয়দের উপর নির্দয়ভাবে অত্যাচার চালিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের এই মর্মান্তিক ইতিহাস বর্তমানে জেমস কুকের ঢালাও প্রশংসায় অনেকটা চাপা পড়ে আছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার হাইড পার্কে এখনো ক্যাপ্টেন জেমস কুকের  মূর্তি দণ্ডায়মান।

দ্য ইয়াকুসুনি শ্রাইন

জাপানের টোকিওতে ১৮৬৯ সালে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছিল। এই স্মৃতিস্তম্বে যে শুধু দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা মানুষদের নাম খোদাই করা আছে তা নয়, বরং বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীদের নামও এখানে উল্লেখ করা আছে।

এ তালিকায় রয়েছেন—দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় পার্ল হারবারে বোমা নিক্ষেপের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সেই জেনারেলের নাম।

ভ্যালি অব ফলেন

স্পেনে স্থাপিত বিতর্কিত মূর্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি! স্মৃতিসৌধটি প্রাথমিকভাবে স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারে মৃতদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে তৈরি করা হয়েছিল। তবে ঠিক একই জায়গায় স্পেনের স্বৈরাচার শাসক ফ্রানসিসকো ফার্নোর কবরও রয়েছে। এই স্বৈরাশাসক ইতালির ফ্যাসিবাদী এবং জার্মানির নাজিদেরকেও সাহায্য করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাকে এই ভ্যালি অব ফলেনে কবর দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৯ সালের দিকে স্প্যানিশ সরকারের কবরটি সরিয়ে মাদ্রিদে নিয়ে যায়।

দ্য ডন জুয়ান দান্তে এলক্যাড

নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত এই মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে জুয়ান দান্তে স্মরণে। তিনি রিও গ্র্যান্ড এলাকায় বিভিন্ন কমিউনিটি স্থাপন করেছিলেন। তবে এই প্রশংসা জুয়ান দান্তের বিতর্কিত ইতিহাস ঢাকতে পারেনি। কারণ তিনি নৃশংস স্বৈরাশাসক ছিলেন। একোমা পাবলো নামক স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ান আদিবাসীদের প্রায় নির্বংশ করে ফেলেছিলেন তিনি। ২০২০ সালের জুন মাসে বিক্ষোভের মুখে মূর্তিটি সাময়িকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়।

দ্য ব্রাউন ডগ

লন্ডনের এই স্মৃতিস্তম্ভটি অনেকবার সংস্কার করা হয়। ১৯০৩ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে একটি কুকুরের উপর গবেষণা করা হয়েছিল এবং তৎকালীন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণী নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছিল। এই কুকুর স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভটি প্রাথমিকভাবে তৈরি করা হয়েছিল। তবে এই ঘটনা তৎকালীন অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করে। অনেক মেডিক্যাল ছাত্রদের দাবি ছিল গবেষণা করার সময় কুকুরটিকে অবশ করে নেওয়া হয়েছিল এবং সব ধরণের আইন মেনেই এই গবেষণাটি করা হয়েছিল। তবে এই বিতর্ক স্থানীয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্রদের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ছাত্রদের মধ্যে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার কারণে ১৯১০ সালে মূর্তিটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে তার ৭৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে প্রাণী অধিকারের উপর উৎসর্গ করে মূর্তিটি পুনস্থাপন করা হয়।

জোসেফ স্টালিনের মূর্তি

স্টালিনকে ঘৃণার হাজারো কারণ রয়েছে। তিনি নিজের অনুসারীদেরকেও জোরপূর্বক শ্রম শিবিরে পাঠিয়েছিলেন। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নে তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করতেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাক্তন বিতর্কিত স্বৈরাশাসক জোসেফ স্টালিনের বহু মূর্তি এখনো সগৌরবে দণ্ডায়মান।

 

ঢাকা/শান্ত

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়