ঢাকা, সোমবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হারিয়ে যাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহ্য ‘ঢোপকল’

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৪-০৩-১৮ ৮:১১:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৪-০৩-১৯ ৩:৩৪:৫৩ এএম

তানজিমুল হক
রাজশাহী, ১৮ মার্চ : ‘ঢোপকল’ শব্দটির সঙ্গে যুক্ত রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এমনকি রাজশাহীর সভ্যতাও জড়িয়ে আছে ঢোপকলগুলোর সঙ্গে। প্রায় ৮০ বছর আগেই রাজশাহীতে আধুনিক পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে ওঠে এ ঢোপকলের মাধ্যমে।

তবে এ ঢোপকলগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে বিকল। মহানগরীর বেলদারপাড়া, ফায়ারব্রিগেড মোড়সহ হাতেগোনা কিছু এলাকায় কয়েকটি ঢোপকল থেকে এখনো পানি সরবরাহ করা হয়। তবে ঢোপকলের জন্য পানিসরবরাহের যে ব্যবস্থা চালু ছিল, সেটা এখন আর নেই। ঢোপকলে পানির সংযোগ এখন মহানগরীর উপকণ্ঠে স্থাপিত পানি শোধনাগারের সঙ্গে।

ব্যতিক্রমী এবং যথেষ্ট আগ্রহোদ্দীপক এ পানিকলগুলো আবার চালু করার দাবি রাজশাহী মহানগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং রাজশাহী ওয়াসা কর্তৃপক্ষও চিন্তাভাবনা করছে ঢোপকলগুলো চালু করার জন্য।

জানা গেছে, এসব ঢোপকল স্থাপন করা হয় ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে। সে সময় রাজশাহী শহরে বিশুদ্ধ পানির অভাব ছিল। এ কারণে নোংরা ও জীবাণুযুক্ত পানি পান করার ফলে শহরবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কলেরা ও আমাশয়সহ নানা রকম পেটের পীড়া। এসব রোগে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুও ঘটে।

আর এ কারণে বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা পেতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য রাজশাহী পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান রায় ডি এন দাশগুপ্ত ঢোপকল স্থাপনের উদ্যোগ নেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে পানির কল বসানো হবে।

১৯৩৭ সালের আগস্ট মাসে মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস নামে পানি সরবরাহ ও বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। আর এ খাতে ব্যয় করা হয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা।

এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করা হয়। সেই সূত্র ধরেই মহারানি হেমন্তকুমারী নিজেই দান করেন প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। তার নাম অনুসারেই এই প্রকল্পের নাম রাখা হয় ‘হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। কালের পরিক্রমায় পানির কলগুলো ‘হেমন্তকুমারী ঢোপকল’ নামেই পরিচিতি পেতে থাকে।

ঢোপকলগুলো লম্বায় ভূমি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু এবং ব্যাস প্রায় ৪ ফুট। এগুলো তৈরি করা হয়েছিল সিমেন্টের মাধ্যমে ঢালাই করে। ঢোপকলের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ঢেউ খেলানো একটা প্লাস্টার করা হতো। এ ধরনের নকশা করা হতো টিনের সাহায্যে। চারপাশে টিনের একটা রাউন্ড বানিয়ে তার মধ্যে সিমেন্ট আর ইটের খোয়ার ঢালাই ঢেলে দেওয়া হতো।

রাজশাহী মহানগরীর প্রবীণ ব্যক্তি ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন। রাজশাহীর বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তিনিও সম্পৃক্ত। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে প্রায় আট যুগ আগে ঢোপকল স্থাপনের মাধ্যমে আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এ ঢোপকলের সঙ্গে রাজশাহীর সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িত। আমরা এ ঢোপকলগুলো পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের দাবি জানাই।’

রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সংগঠন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট গবেষক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা বলেন, ‘রাজশাহী শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি ঢোপকলগুলোও আমাদের ঐতিহ্য বহন করে। কিন্তু প্রায় দেড় যুগ থেকে এইসব ঢোপকল থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য ঢোপকলগুলো আবার চালু করা উচিত।’

রাজশাহীর সাংবাদিক নেতা আকবারুল হাসান মিল্লাত বলেন, ‘ঢোপকলগুলো রাজশাহীর উন্নত পানি সরবরাহ-ব্যবস্থার স্মারক। তাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেগুলো তুলে ধরার জন্য মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে ঢোপকলগুলো সংরক্ষণ করা উচিত।’

এ ব্যাপারে রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ধীরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে রাজশাহী মহানগরীতে পানি সরবরাহের জন্য পদ্মা নদীর পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এজন্য মহানগরীর উপকণ্ঠে পানি শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাজশাহী মহানগরীর ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। এ ইতিহাসের সঙ্গে ঢোপকল সম্পৃক্ত। ইতিমধ্যে মহানগরীতে পানি সরবরাহের জন্য আরো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা রাজশাহী ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য কিছু ঢোপকল চালু রাখতে চাই। যেগুলো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে রাজশাহী মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু মোড়ে।’

 

রাইজিংবিডি/তানজিমুল হক/রিশিত খান/ক.কর্মকার/কে. শাহীন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন