ঢাকা, বুধবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘লেবাসসর্বস্ব নয়, আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে’

মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১৬ ৯:৪৫:৪৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-১৭ ১০:৩৯:৪১ এএম

মোহাম্মদ নঈমুদ্দীন : ‘আমরা লেবাসসর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে।’ ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জবাবে দৃঢ়তার সঙ্গে একথা বলেছিলেন।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ এর টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। যারা প্রকৃত ইসলাম ধর্মের অনুসারি ছিলেন। নামাজ, রোজাসহ এবাদত বন্দেগীতে সবাই ছিলেন খাঁটি মুসলমান।

শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ ছিলেন দরবেশ শেখ আউয়াল। (শেখ মুজিবুর রহমান, পিতা শেখ লুৎফর রহমান, পিতা শেখ আবদুল হামিদ, পিতা শেখ তাজ মাহমুদ, পিতা শেখ মাহমুদ ওরফে তেকড়ী শেখ, পিতা শেখ জহির উদ্দিন, পিতা দরবেশ শেখ আউয়াল।) তিনি বিখ্যাত অলি হজরত বায়েজিদ বোস্তামির (রহ.)-এর প্রিয় সঙ্গী ছিলেন। ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি বাগদাদ থেকে বঙ্গে আগমন করেন। পরবর্তীকালে তাঁরই উত্তর-পুরুষেরা অধুনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। জাতির জনক হচ্ছেন ইসলাম প্রচারক শেখ আউয়ালের সপ্তম অধঃস্তন বংশধর। বঙ্গবন্ধুর মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। নানার নাম ছিল শেখ আব্দুল মজিদ।

বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমানের (মৃত্যু : ১৯৭৪ খ্রি:) সুখ্যাতি ছিল সূফী চরিত্রের অধিকারী হিসেবে। পারিবারিক শিক্ষায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এভাবেই বেড়ে ওঠেন। তিনি যেমন ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি, তেমনি ছিলেন একজন খাঁটি ঈমানদার। তিনি আমাদের প্রিয় নবী হজরত (সা.) এর প্রকৃত আশেক ছিলেন। ঠিক তেমনিভাবে তাঁর ছেলে মেয়েদেরও সেই শিক্ষায় গড়ে তোলেন।

কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্াচনে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী অপপ্রচার চালানো হয়। নির্বাচনের আগে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশনে  এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ বিষয়ে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, ‘আমরা লেবাসসর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে।’

জাতির জনক বলেছিলেন, আমাদের ইসলাম হজরত রাসূলে করিম (স.)-এর ইসলাম, যে ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বারবার যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে। যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান সে দেশে ইসলাম বিরোধী আইন পাশের কথা ভাবতে পারেন তারাই, যারা ইসলামকে ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফারস্থা করে তোলার কাজে।’

বঙ্গবন্ধুর সেই বক্তব্য ব্যাপক প্রভাবিত করে ভোটারদের। মানুষের হ্রদয়ে জায়গা করে নেন বঙ্গবন্ধু। তার নেতৃত্বে ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি স্বৈরশাসকগোষ্ঠী, হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর-দালালেরা ইসলামের অপব্যাখ্যা করে মুক্তিযুদ্ধকে ইসলাম-বিরোধী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অমুসলিম আখ্যা দেয়। তারা স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করে, নারীদের ধর্ষণ করে। অসংখ্য ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়; আর তথাকথিত ‘গনীমতের’ মাল হিসেবে লুট করে মুক্তিকামী মানুষের সহায় সম্পত্তি।

অথচ এসবই ছিল সম্পূর্ণ ইসলাম-বিরোধী এবং অবৈধ। মুক্তিযুদ্ধকালে ইসলামের তথাকথিত ধ্বজাধারীদের এহেন ঘৃণ্য অপকর্ম সবাইকে হতবাক ও স্তম্ভিত করে দেয়। ইসলামের নাম ভাঙিয়ে, ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তারা যেসব ঘৃণ্য অপকর্ম সংঘটিত করেছে এদেশের মাটিতে, তা পবিত্র ইসলামকে কলংকিত করে। এই কালিমালিপ্ত ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির কাছে ইসলামের প্রকৃত পথ ও মতের কথা তুলে ধরেন। মুখোশ খুলে দেন ইসলামের লেবাসধারী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুর এই সংক্ষিপ্ত ভাষণে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাঁর মাঝে ইসলামের চিরন্তন কল্যাণকারী বৈশিষ্ট্য ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর এ ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (স.)-এর ইসলাম, ইসলামের সুমহান শিক্ষা; অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ইসলামের আপোসহীন অবস্থান; প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, মোনাফেকির বিরুদ্ধে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের প্রতি তার সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

স্বাধীনতার পরও বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ইসলাম ধর্ম নিয়ে একই ধরনের প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণা দেখা যায়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর ওই দিনই তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক বিশাল সমাবেশে ঘোষণা দেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না ...এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’

ঠিক এর কিছুদিন পরে ধর্মের লেবাসধারীদের ব্যাপারে দেশ ও জাতিকে সতর্ক করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয় সংসদে প্রদত্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।

তিনি ঘোষণা দেন, এদেশের  মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আল-বদর পয়দা করা বংলার বুকে আর চলবে না।

ইসলামী আদর্শ মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঠিক ব্যাখ্যা সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু এত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য প্রদান করা সত্তেও  ইসলামের লেবাসধারী মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এই মহলটি বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে ইসলাম-বিরোধী বলে অব্যাহতভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যায়, আর এই অপপ্রচার এখনো অব্যাহত রয়েছে। অথচ জাতির জনক ধর্মকে কখনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেননি, করতেও চাননি। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে সব মানুষের নিজ নিজ ধর্মের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধু যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন তার উৎস ছিল মদিনা সনদের সেই শিক্ষা, যেখানে উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল- মদিনায় ইহুদি-নাসারা, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। জাতির জনক খাঁটি ঈমানদার ছিলেন বলে যখন যে অঙ্গিকার করেছিলেন জীবদ্দশায় তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।

১৯৭০ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে শতকরা ৯৫ জন মুসলমানের দেশে ইসলাম-বিরোধী কোনো আইন পাস করা হবে না বলে তিনি যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সেই প্রতিশ্রুতি পালনে তিনি বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি।

এখানেই থেমে থাকেনি বঙ্গবন্ধুর ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার। বঙ্গবন্ধু মনে প্রাণে খাঁটি ঈমানদার ছিলেন বলেই তার শাসনামলে ইসলামের প্রচার প্রসারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই দেশে সুপ্রাচীনকাল থেকে ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চা ও লালন হয়ে আসছে। ইসলামের এই সমুন্নত আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চা ও প্রসার কার্যক্রমকে আরো বেগবান করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু। প্রভাবশালী দেশের বিরোধিতা সত্বেও ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও স্থাপন করেছিলেন।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ আগস্ট ২০১৯/নঈমুদ্দীন/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন