ঢাকা, বুধবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৪ ৪:৩৪:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-২৪ ৪:৩৪:১৬ পিএম

হাসান মাহামুদ : ১৯৯৯ সালে সরকারি জোর প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে আমরা আমাদের মাতৃভাষার যথাযথ মর্যাদা দিতে পারছি না। সঠিকভাবে এর ব্যকহার বা প্রয়োগ হচ্ছে না। সাইনবোর্ড লেখা হয় ইংরেজিতে। বাংলা লেখা হলে বানানে থাকে ভুল। বাংলা একাডেমি এ ব্যাপারে প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু সফলতা আসেনি। অথচ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

ইতিহাসবিদরা বলেন, বঙ্গবন্ধু থাকলে বাংলার এই অবস্থা থাকতো না।  কারণ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের কর্মপরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তিনি তার এ সংক্রান্ত বেশকিছু পরিকল্পনার কথা জানিয়েও গিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার ঘোষণা দিয়েছিলেন সার্বজনীন বাংলা ভাষার চর্চাকে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়, দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর ব্যাপারে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য, সাক্ষাৎকার এবং রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরে বাংলা চালুর এই পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমিতে শহীদ দিবস (ভাষা শহীদ দিবস) উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপি অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর ব্যাপারে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার বাংলা একাডেমি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শুনতে প্রখ্যাত লেখক, কবি, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছিলো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ।

বঙ্গবন্ধু এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। বাংলা একাডেমির সেসময়ের চেয়ারম্যান প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মুরতজা আলীর সভাপতিত্বে সেদিন স্বাগত বক্তব্য দেন বিশিষ্ট লেখক ও বাংলা একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক কবির চৌধুরী।

ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, তার দল ক্ষমতায় আসলে শুরুতেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা হবে। তিনি সেদিন সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর জন্য কীভাবে বাংলা পরিভাষা তৈরি করা হবে সে ব্যাপারেও পরামর্শ দেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সরকারি অফিস আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে।'

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করে। সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বৈদেশিক যোগাযোগ ছাড়া দেশের রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। তা সত্ত্বেও এখনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাভাষা খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলা ভাষায় বই ও পরিভাষার অভাবের অজুহাতে এখন উচ্চ আদালতে দাপ্তরিক কাজে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় সর্বস্তরে বাংলা চালুর ব্যাপারে তাগিদ দেন এবং পরিভাষার জন্য অপেক্ষা না করে তা ‘তখনই' শুরু করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষার অপেক্ষা করবো না। তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনদিনই বাংলা চালু করা সম্ভবপর হবে না।'

স্বাধীনতার মহান স্থপতি বলেন, ব্যবহারের মধ্যে দিয়েই বাংলা ভাষার উন্নয়ন হবে। কেননা ভাষা সব সময় মুক্ত পরিবেশে বিস্তার লাভ করে। ‘ভাষার গতি নদীর স্রোতের ধারার মতো। ভাষা নিজেই তার গতিপথ রচনা করে নেয়। কেউ এর গতি রোধ করতে পারে না। '

এছাড়াও তিনি লেখক, কবি এবং নাট্যকারদের মুক্তমনে লেখার আহবান জানিয়ে বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে গণমুখী ভাষা হিসেবে গড়ে তুলুন। জনগণের জন্যই সাহিত্য। এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের লেখনীর মধ্যে নির্ভয়ে এগিয়ে আসুন। দুঃখী মানুষের সংগ্রাম নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করুন।' তিনি বলেন, আমাদের প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহারের মধ্যে দিয়েই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।

বঙ্গবন্ধুর অন্যান্য অনেক বক্তৃতার মতই সেদিনের বক্তৃতাও দেশের প্রধান প্রধান বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয়।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ আগস্ট ২০১৯/হাসান/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন