ঢাকা, শুক্রবার, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই আধুনিক কৃষির যাত্রা

এসকে রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৭ ৭:৩৬:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-২৭ ৭:৩৬:৫০ পিএম

এসকে রেজা পারভেজ : প্রচণ্ডরকম দুরদর্শী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝেছিলেন গতানুগতিক কৃষি ব্যবস্থা দিয়ে দ্রুত ক্রমবর্ধমান দেশের মানুষের খ্যদ্যের যোগান সম্ভব নয়। সেজন্য অন্যান্য খাতের চেয়ে কৃষিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এর আধুনিকীকরণের দিকে হেটেছিলেন তিনি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষির ব্যাপক আধুনিকীকরনের কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। মুলত তার হাত ধরেই আধুনিক কৃষির যাত্রা শুরু হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য কৃষি শিল্পের উন্নয়ন ছাড়া বিকল্প নেই। সেজন্য ওই সময়ে কৃষকদের খাদ্যশস্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু কিছু দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যাতে কৃষকরা ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে। কৃষির সার্বিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু যে কতটুকু গুরুত্ব দিয়েছিলেন তা ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া তার ভাষণেই ফুটে ওঠে যা একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে আজও সাক্ষ্য দেয়।

তিনি বলেছিলেন, ‘কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। সবুজ বিপ্লবের কথা আমরা বলছি। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের যে অবস্থা, সত্য কথা বলতে কী বাংলার মাটি, এ উর্বর জমি বারবার দেশ-বিদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ও শোষকদের টেনে এনেছে এই বাংলার মাটিতে। এই উর্বর এত সোনার দেশ যদি বাংলাদেশ না হতো, তবে এতকাল আমাদের থাকতে হতো না। যেখানে মধু থাকে, সেখানে মক্ষিকা উড়ে আসে। সোনার বাংলা নাম আজকের সোনার বাংলা নয়। বহু দিনের সোনার বাংলা। বাংলার মাটির মতো মাটি দুনিয়ায় দেখা যায় না। বাংলার মানুষের মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলার সম্পদের মতো সম্পদ দুনিয়ায় পাওয়া যায় না।'

‘যেভাবে মানুষ বাড়ছে যদি সেভাবে আমাদের বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে, তবে ২০ বছরের মধ্যে বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সে কারণেই আমাদের কৃষির দিকে নজর দিতে হবে। আপনাদের কোট-প্যান্ট খুলে একটু গ্রামে নামতে হবে। কেমন করে হালে চাষ করতে হয়, এ জমিতে কত ফসল হয়, এ জমিতে কেমন করে লাঙল চষে, কেমন করে বীজ ফলন করতে হয়। আগাছা কখন পরিষ্কার করতে হবে। ধানের কোন সময় নিড়ানি দিতে হয়। কোন সময় আগাছা ফেলতে হয়। পরে ফেললে আমার ধান নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো বই পড়লে হবে না। গ্রামে যেয়ে আমার চাষি ভাইদের সঙ্গে প্রাকটিক্যাল কাজ করে শিখতে হবে। তাহলে আপনারা অনেক শিখতে পারবেন’-বলেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধু জানতেন কৃষিশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষার্থী না আসলে এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই কৃষিশিক্ষায় আকৃষ্ট করার জন্য ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন মঞ্চে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াদের মতো কৃষিবিদদের চাকরিক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা ঘোষনা দেন। তার ওই ঐতিহাসিক ঘোষণার পথ ধরে আজ কৃষিবিদরা সরকারি চাকরিক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত। জাতির জনকের দেওয়া কৃষিবিদদের ঐতিহাসিক এ সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণভাবে কৃষিবিদরা দিবসটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার সময় দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ এবং মোট জাতীয় আয়ের অর্ধেকেরও বেশি কৃষি নির্ভর ছিল। বঙ্গবন্ধু এটি ভালভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া দেশের অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হবে না। এজন্য তিনি ‘কৃষক বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ শ্লোগানে সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। স্বাধীনতার পর সহায়-সম্বলহীন ২২ লাখ কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসন করেছে। তাদের পুনর্বাসনে স্বল্পমূল্যে এবং অনেককে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দেয়া হয়। তার সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ এবং পরিবার প্রতি সর্বোচ্চ একশ’ বিঘা জমির সিলিং নির্ধারণ করেন। ১৯৭২ সালের শেষে স্বল্পমূল্যে কৃষকদের ৪০ হাজার অগভীর, ২ হাজার ৯শ’ গভীর এবং ৩ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল দেয়া হয়। এর ফলে ১৯৬৮-৬৯ সালের তুলনায় ১৯৭৪-৭৫ সালে সেচের জমি এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ লাখ একরে দাঁড়ায়। সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কেবল ১৯৭২ সালে ১৭ হাজার ৬১৬ টন উচ্চ ফলনশীল ধান ও গমের বীজ বিতরণ করা হয়। এছাড়া বিশ্ব বাজারের তুলনায় কম মূল্যে সার সরবরাহ করা হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৭০ শতাংশ, কীটনাশক ৪ শতাংশ এবং উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর সরকার কৃষকদের মাঝে দেড় লাখ গবাদিপশু ও ৩০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করে। বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ধান, পাট, তামাক ও আখসহ প্রধান প্রধান কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার কৃষি গবেষণায় গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি কৃষি সংশ্লিষ্ট উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৭৩ সালে ৮ মাসে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প পুন:উদ্যোমে চালুর ব্যবস্থা করেন। সরকারিভাবে খাদ্য মজুতের জন্য ১৯৭২ সালের মধ্যে ১শ’ গোডাউন নির্মাণ করে। কৃষির উন্নয়নে কৃষক, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের উৎসাহ প্রদানে জাতীয় পর্যায়ে ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকের’ প্রবর্তন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কৃষি ও কৃষক তথা আপামর জনগণের মুক্তির জন্য আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

কৃষিকে বঙ্গবন্ধু যে কিভাবে গুরুত্ব দিতেন তা তার এক বক্তব্যে উঠে এসেছিলো। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয় জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে দ্বিগুণ ফসল ফলাতে পারব না, তিনগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণও করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না। ...আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে, যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্টপরা, কাপড়পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই জমিতে যেতে হবে, ডবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডবল ফসল করতে হবে। যদি ডবল ফসল করতে পারি আমাদের অভাব ইনশাআল্লাহ হবে না।’

১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ১৩৫-এ বঙ্গবন্ধুর কৃষি সংস্কার আর কৃষকদরদি মনোভাবের আরো কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। এই আদেশে বলা হয়েছে, নদী কিংবা সাগরগর্ভে জেগে ওঠা চরের জমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে হতদরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা। মহাজন ও ভূমিদস্যুদের হাত থেকে গরিব কৃষকদের রক্ষাই উদ্দেশ্য ছিল তার। কৃষিজপণ্যের ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের শুল্ক থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আমলে। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে দারুণ মনোযোগী ছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু কৃষি সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, বীজ ও সার সরবরাহের প্রতিষ্ঠান বিএডিসিকে পুনর্গঠন এবং সারাদেশে এর বীজকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ১৯৭৫ সালে। এই বিএডিসিই আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থার প্রচলন করে এদেশে। কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য তিনি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। একইসঙ্গে কৃষি গবেষণা ছাড়া যে কৃষির উন্নতি সম্ভব নয়, বঙ্গবন্ধু তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এদেশে কৃষি গবেষণাধর্মী কাজ পরিচালনার জন্য তেমন কোনো সমন্বয়ধর্মী প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাই তো ১৯৭৩ সালেই কৃষিতে গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল।

১৯৭৩ সালে ১০ নম্বর অ্যাক্টের মাধ্যমে নতুন নামে পুনর্গঠন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। তখনই ঢাকার আণবিক গবেষণাকেন্দ্রে কৃষি পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (ইনা) প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন, যা ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তরিত হয়। স্বাধীনতার পর জুট অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে প্রাক্তন জুট অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পুনর্গঠন করা হয়।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ আগস্ট ২০১৯/রেজা/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন