ঢাকা, শুক্রবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২২ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘গ্রাম’ গড়তে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৯ ৭:৫৮:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-৩০ ৮:৩০:৫৮ এএম

হাসান মাহামুদ : স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন অবহেলিত রয়ে গেছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকে গ্রাম উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। গ্রামেই শহরের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে কিছু প্রকল্প। কিন্তু এর অধিকাংশই জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পিত কিছু উদ্যোগের অংশ।

গ্রামকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বায়ত্ত্বশাসিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা প্রথম করে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকার বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কর্মসূচী গ্রহণ করলেও বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগগুলো চাপা পড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কারণে এখনো গ্রামীন জনপথগুলো অবহেলিত থেকে গেছে।

কৃষি ও শিল্পায়নকে যথাযথভাবেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন কৃষি শুধু যে মানুষের খাবারের যোগান দিবে তাই নয়, বরং আরও বহু বছর এ দেশের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে থেকে যাবে। এছাড়াও দারিদ্র্য নিরসনের পাশাপাশি শক্তিশালি কৃষি খাত দেশের বর্ধিষ্ণু শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের যোগান দিবে।

তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই বঙ্গবন্ধু দেশের কৃষির বিকাশের জন্য বেশ কিছু সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- যুদ্ধ বিধ্বস্ত কৃষি অবকাঠামো দ্রুত পুননির্মাণ, হ্রাসকৃত মূল্যে বা বিনা মূল্যে জরুরিভিত্তিতে কৃষি যন্ত্রাদির সরবরাহ, বীজের যথেষ্ট সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, পাকিস্তান আমলে কৃষকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, কৃষি পণ্যের জন্য সর্বোচ্চ ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ, দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য রেশন সুবিধা ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের শুরুর দিকেই তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার এসব পদক্ষেপ নিয়েছিল। এসব পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন এ কারণে যে তিনি জানতেন কৃষি উন্নয়ন হলো টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বঙ্গবন্ধু কৃষি ও শিল্প খাতের পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়েও ছিলেন সচেতন। যেমন- সার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ। তাই বঙ্গবন্ধু সারা দেশে সার কারখানা স্থাপন ও সেগুলো চালু করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

ইস্টার্ন একাডেমিক থেকে প্রকাশিত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলামের ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও বাংলাদেশের গ্রাম’ শীর্ষক গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর গ্রাম উন্নয়নের বিভিন্ন পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে এনেছেন। গ্রন্থে তিনি লিখেছেন- বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ভাষণে প্রস্তাব রেখেছিলেন, ‘গ্রামের প্রত্যেকটি কর্মঠ মানুষ এই বহুমুখী সমবায়ের সদস্য হবে। যার যার জমি সে-ই চাষ করবে, কিন্তু ফসল ভাগ হবে তিন ভাগে—কৃষক, সমবায় ও সরকার।’ এই গ্রামীণ সমবায়কে তিনি নতুন গ্রাম সরকার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁদের হাতেই উন্নয়ন বাজেটের অংশবিশেষ তুলে দেওয়া হবে, ওয়ার্কস প্রোগ্রামও থাকবে তাঁদের হাতে। তিনি বলেছিলেন, ‘এরা মাথা উঁচু করে দাঁড়ালে একসময় ইউনিয়ন কাউন্সিলের টাউটদের বিদায় হবে।’

‘বঙ্গবন্ধু যে সমবায়ের কথা বলছেন, তা চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কলখোজ বা কালেকটিভ ফার্মিংয়ের থেকে কিছুটা ভিন্ন হলেও তা সমাজতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা দ্বারা অনুপ্রাণিত, তাতে ভুল নেই। নজরুল ইসলাম ধরিয়ে দিয়েছেন চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবের ফারাক কোথায়। তিনি কৃষকদের মালিকানাধীন জমি ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলেননি। বঙ্গবন্ধু প্রস্তাব করেছিলেন চাষ হবে যৌথভাবে, আর সে চাষের ফসল সবাই ভোগ করবে।

অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করেন, বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাস থেকেই এই সমবায় ব্যবস্থার প্রস্তাবনা ছিল। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু নিজেই সমাজতন্ত্রে তার বিশ্বাসের কথা জানিয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না।’

সমবায় গ্রামের এই প্রস্তাব করার আগে বঙ্গবন্ধু ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে যে ভূমিস্বত্ত্ব আদেশ তিনি জারি করেন, তাতে পরিবারপিছু সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা সিলিং আরোপিত হয়। এর অতিরিক্ত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টনের উদ্দেশ্যে সরকার অধিগ্রহণ করবে। কিন্তু নিজ দলের ভেতরে প্রতিরোধের কারণে এই আদেশ কার্যকর হয়নি। যারা দলের নেতা বা পার্লামেন্টের সদস্য, তাদের অধিকাংশই তো জোতদার। ফলে এই আইনের মাধ্যমে খুব সামান্য জমি উদ্ধার করে তা ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করা সম্ভব হয়।

নজরুল ইসলাম মনে করেন, ভূমি সংস্কারের বদলে সমবায়ভিত্তিক যৌথ চাষের যে প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু করেন, তা রাজনৈতিকভাবে আপসমূলক হলেও এটি ছিল অধিক বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ এত কম যে বাধ্যতামূলক সিলিং আরোপ করে যে উদ্বৃত্ত জমি মিলবে, সব ভূমিহীনের মধ্যে তা বণ্টন অসম্ভব। তা ছাড়া বণ্টিত জমির আয়তন ক্ষুদ্র হওয়ায় তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জমির নতুন মালিক প্রতিবেশী জোতদারের কাছে তা বিক্রি করতে বাধ্য হবেন। এই অবস্থায় একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে জমির যৌথভিত্তিক চাষাবাদ। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদেরাও যার যার মতো করে এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শুধু যে যৌথ চাষাবাদের প্রস্তাব রাখেন তা-ই নয়, তিনি পুরো গ্রামকে একটি সমবায়ী ব্যবস্থাপনার অধীনে আনার কথা ভেবেছিলেন। এ কথার অর্থ, গ্রামের যাবতীয় সম্পদ—তার জমি, ফসল ও পানি—এর ব্যবস্থাপনায় থাকবে গ্রামের মানুষের যৌথ ভূমিকা। এই সমবায়ী গ্রামের প্রশাসনিক কাঠামো বিস্তৃতভাবে বলার সময়-সুযোগ তিনি পাননি, তবে তিনি কী চান, তার নানা ইঙ্গিত রেখে গেছেন। যেমন গ্রাম সমবায়ের মাধ্যমে যে বাড়তি আয় হবে, তার সুষম ব্যবহার ও বণ্টনের জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ‘গ্রাম তহবিল’ এর কথা ভেবেছিলেন। এই তহবিলের আয় আসবে উৎপাদিত ফসলের একাংশ থেকে, বাকিটা আসবে সরকারের বরাদ্দ থেকে।

বাংলাদেশের চিরাচরিত গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর একটি অন্যতম রূপ হচ্ছে সংঘবদ্ধ থাকা। পরিবার প্রথাভিত্তিক গোষ্ঠীতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মূল শক্তি হচ্ছে সম্মিলিত উদ্যোগ, সামাজিক বন্ধন এবং সমষ্টিগত উন্নয়ন। এই বিষয়টিকেই কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুর। এক্ষেত্রে গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে সমবায় দর্শন ছিল বেশ টেকসই এবং কার্যকরী হাতিয়ার।

বঙ্গবন্ধুর গ্রাম উন্নয়নের পরিকল্পনাগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনাগুলো নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ আগস্ট ২০১৯/হাসান/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন