ঢাকা, বুধবার, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী জয়-ই কি কানাডার ব্যবসায়ী তারেক?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৭ ১১:৩৯:১৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-০৭ ৩:০৯:৪৯ পিএম

দু’জনের মধ্যে কী ভীষণ মিল! নামে। ছবিতে। শরীরী চিহ্নে। পিতৃ পরিচয়ে। জন্মতারিখে। সব কিছুতে বড় আশ্চর্য রকমের মিল। কিন্তু, তারেক রানার দাবি তিনি কিছুতেই বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসী খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয় নন! 

কিন্তু কলকাতা থেকে গিয়ে ২০১৪ সাল থেকে তিনি যে দেশে থাকছিলেন, সেই কানাডা থেকেই রানা পালিয়ে গিয়েছেন। বর্তমানে ‘বেপাত্তা’! ফলে বাংলাদেশ-ভারত-কানাডার গোয়েন্দারা তো বটেই, খোদ ইন্টারপোলও নিশ্চিত, তাদের জারি করা ‘রেড কর্নার নোটিস’ যার বিরুদ্ধে, সেই খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয় এবং কানাডার প্রতিশ্রুতিমান উদ্যোগপতি তারেক রানা আদতে একই ব্যক্তি। খবর আনন্দবাজার অনলাইন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী জয় বাংলাদেশে কয়েক ডজন খুন, চাঁদাবাজি ও অপহরণ মামলায় অভিযুক্ত। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের অনুরোধে ইন্টারপোল ‘রেড কর্নার নোটিস’ জারি করে তার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, ২০০৬ সালের ১৪ মে বিদেশে কাজের জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া সংস্থা ‘তুর্কি অ্যাসোসিয়েট’-এর মালিককে আট লাখ মার্কিন ডলার চেয়ে ফোন করে জয়। টাকা না দেওয়ায় ওই সংস্থার অফিসে ঢুকে ছয় জনকে গুলি করে খুন করে জয়ের দলবল।

এর পরের ঘটনা খাস কলকাতায়। ২০০৭ সালে বাগুইআটির চিনার পার্কের একটি বাড়ি থেকে জয়কে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি। দেখা যায় ভোল বদলে তারেক রানা নামে সে গা ঢাকা দিয়ে ছিল বাগুইআটির ওই ভাড়া বাড়িতে। ভুয়া নথির মাধ্যমে তারেক রানা নামে সে তত দিনে ভারতীয় পাসপোর্ট থেকে শুরু করে ড্রাইভিং লাইসেন্স— সবই জোগাড় করে ফেলেছে। কলকাতায় তার পরিচয় তখন ‘জি ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাক সংস্থার মালিক! সিআইডি তার বিরুদ্ধে পাঁচটি আলাদা আলাদা মামলা করে। সেই সময় সিআইডির ডিআইজি (অপারেশনস) ছিলেন সিআইডির বর্তমান এডি়জি রাজীব কুমার। তার নেতৃত্বেই তৈরি হয় স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ। তারাই গ্রেপ্তার করে জয়কে। এই মামলাগুলো যখন চলছে, তখনই জয়কে ফেরত পেতে ভারতকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ। সেই সময়ে স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আনন্দবাজারকে জানান, ওই প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই জামিন পেয়ে যায় জয়। তার পর প্রায় কর্পূরের মতো উবে যায় সে কলকাতার বুক থেকে।

এর পর জয়ের আর কোনো ‘খোঁজ’ পাওয়া যায়নি।

কানাডার অভিবাসন দফতর সূত্র জানায়, ২০১১ সালে পর্যটক ভিসা নিয়ে সে দেশে তারেক রানা নামে এক ব্যক্তি যান। সেই তারেক রানাকেই ২০১৪ সালে কানাডার অভিবাসন দফতর ১০ বছরের ভিসা দেয়। তখন থেকেই তিনি সেখানে আছেন। ইতোমধ্যে কলকাতা থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে কানাডার টরোন্টোর শহরতলি আয়াক্সে ওই ‘ভারতীয়ের’ নাম এক জন সফল ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তারেকের দাবি, তার জন্ম থেকে বড় হওয়া— সবটাই কলকাতায়। আয়াক্সের অভিজাত এলাকায় তাঁর ‘এসজে ৭১’ সংস্থার বিশাল অফিস রয়েছে। নিয়মিত তাকে সেখানকার ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেখা যায়। বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থসাহায্য করেন তিনি। এমনকি সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলির তহবিলেও দেন মোটা চাঁদা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তারেককে এক জন উদ্যোগপতি হিসাবেও বর্ণনা করা হয়। কারণ হিসাবে বলা হয়, তিনি সে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, এনেছেন বিনিয়োগও।

 

 

কলকাতার উদ্যোগপতি হিসাবে আয়াক্সে থাকা তারেক রানার সঙ্গে কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি শীর্ষ সন্ত্রাসীর একের পর এক সা়দৃশ‌্যের হদিশ পান কানাডার পুলিশ কর্মকর্তারাও। গোয়েন্দারা নির্দিষ্টভাবে কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করছেন—

১) ২০০৫ সালে খোন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয়ের যে ছবি ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিসে রয়েছে, তার সঙ্গে ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেপ্তার হওয়া জয়ের ছবি এবং তারেক রানার সাম্প্রতিক ছবিতে সাদৃশ্য রয়েছে।

২। খোন্দকার তানভীরের বাবার নাম এবং তারেক রানার বাবার নাম এক— খোন্দকার নজরুল ইসলাম।

৩। খোন্দকার তানভীর এবং তারেক রানার জন্মসাল এক— দু’জনেরই ১৯৬৭ সালে জন্ম।

৪। অতীতে দু’জনেরই দু’পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে। তার চিহ্নও দু’জনের শরীরে রয়েছে।

শুধু কানাডার অভিবাসন দফতর নয়, সিআইডির কর্মকর্তারাও যারা জয়কে ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেপ্তার করেছিলেন, তারাও কানাডার তারেক রানার ছবি দেখে এক মুহূর্তে চিনতে পারছেন। তারা নিশ্চিত, বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী খোন্দকার তানভীর ইসলামই আসলে এই তারেক রানা। সিআইডি যখন জয়কে চিনার পার্ক থেকে গ্রেপ্তার করে, তখন সে বাড়িতে শয্যাশায়ী অবস্থায় ছিল। গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগে একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার হয়। সে কারণে তাই জয়ের গ্রেপ্তারির পর এমআর বাঙুল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য তাকে ভর্তি করেছিল সিআইডি। কানাডার অভিবাসন দফতরের কাছে ভারতীয় হিসাবে পরিচয় দেওয়া তারেক রানার ফাইলেও রয়েছে পায়ের অস্ত্রোপচারের তথ্য।

কলকাতার সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন,  ‘কানাডাতে ঠিক যে ভাবে প্রভাবশালীদের সঙ্গে ওঠাবসা করে উদ্যোগপতি হয়ে উঠেছিল জয় ওরফে তারেক রানা, ঠিক সেই মন্ত্রেই এই দেশ ছেড়েছিল বাংলাদেশের দাউদ।’

গত অক্টোবরে কানাডায় আনন্দবাজারের সাংবাদিককে তারেক বলেছিলেন, ‘সম্প্রতি এটা আমারও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। ওই অপরাধীর সঙ্গে আমার মুখের অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। এখানকার পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘তবে, আমি তানভির ইসলাম জয় নামে কাউকে চিনি না।’

তারেক দাবি করেন, জীবনে কখনও কোনো অপরাধের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ফলে গ্রেপ্তারের প্রশ্নই নেই।

তা হলে কলকাতা হাইকোর্টে ২০০৭ সালের আগস্টে খোন্দকার তানভীর ইসলাম জয় ওরফে তারেক রানা হিসাবে তিনি কেন তার বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতে চলা মামলা খারিজের আবেদন জানিয়েছিলেন? সেখানে তো তারেক রানার সঙ্গে মোস্ট ওয়ান্টেড খোন্দকার তানভীর ইসলাম জয় নামটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন। কেন? এ সব প্রশ্নের কোনো জবাব অক্টোবরের ওই কথোপকথনের সময়ে তারেক দেননি।

অক্টোবরেই কানাডার অভিবাসন দফতর একাধিক বার তারেককে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হঠাৎ তিনি ‘উধাও’ হয়ে যান। কানাডায় তার পরিচিতদের তারেক জানিয়েছিলেন, তিনি কলকাতায় যাচ্ছেন। ২৮ নভেম্বরের মধ্যে তিনি ফিরবেন আয়াক্সে। ৬ ডিসেম্বরের পর্যন্ত তিনি কানাডায় ফেরেননি। তিনি কোথায় আছেন জানতে তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে ওই মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, তারেক রানা বর্তমানে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে রয়েছেন। কানাডা পুলিশ জানাচ্ছে, তার আয়াক্সের অফিস তালাবদ্ধ। পাওনাদাররা টাকা না পেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।



ঢাকা/শাহেদ