ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনায় আটকা ট্রান্স ফ্যাট নির্ণয়ের নীতিমালা

আরিফ সাওন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৮ ৪:৪৫:৩৪ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৮ ১০:২৬:৩৫ এএম

বেশ জোরেসোরেই এগোচ্ছিল খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা নির্ণয়ের কাজ। ২০২৩ সালের মধ্যে মাত্রা নির্ণয়ের প্রজ্ঞাপন জারি করে তা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টরা নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এ লক্ষ্যে গঠিত ট্যাকনিক্যাল কমিটি দুই দফা বৈঠকও করেছে। কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যাচ্ছে না।

করোনা পরিস্থিতির কারণে আটকে গেছে খাদ্যে ২ শতাংশ ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা নির্ণয়ের কাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা আবার এটা নিয়ে এগোবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সহকারী পরিচালক (কৃষি ও খাদ্য) এনামুল হক বলেন, ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দুটি মিটিংও হয়েছে। মার্চের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত থাকলেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিষয়টি আটকে আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ট্রান্স ফ্যাট এক ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি। ভেজিটেবল অয়েল (পাম, সয়াবিন ইত্যাদি) এর সাথে হাইড্রোজেন যুক্ত (হাইড্রোজেনেশন) করলে তেল জমে যায় এবং ট্রান্স ফ্যাট উৎপন্ন হয়। এই পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল আমাদের দেশে ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো খাবার সংরক্ষণের সুবিধার্থে এবং বিভিন্ন ভাজা-পোড়া ও বেকারি খাদ্যপণ্যের স্বাদ, ঘ্রাণ ও স্থায়িত্ব বাড়াতে আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া, ভাজা-পোড়া খাদ্যে একই ভোজ্য তেল উচ্চ তাপমাত্রায় বারবার ব্যবহারের কারণেও খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট সৃষ্টি হয়।

মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে ভালো কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয়, যা হৃদরোগজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেকোনো খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে পৃথিবীর অনেক দেশে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি কমাতে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়ন ও সরকারের ইতিবাচক মনোভাব প্রয়োজন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই।

সম্প্রতি বিএসটিআই দেশে প্রচলিত ফাস্ট ফুড, বেকারি পণ্য, স্ট্রিট ফুড কিংবা রেস্তোরাঁয় তৈরি করা ভাজা-পোড়া খাদ্যপণ্য তৈরিতে হাইড্রোজেনেটেড তেলের ব্যবহার কমাতে এবং ভোজ্য তেল বারবার ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির দৈনিক ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত মোট খাদ্যশক্তির ১ শতাংশের কম, অর্থাৎ দৈনিক ২০০০ ক্যালোরির ডায়েটে তা হতে হবে ২.২ গ্রামের চেয়েও কম। ট্রান্স ফ্যাটের ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে ডেনমার্ক বিশ্বে প্রথম ২০০৩ সালে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে।

ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরানসহ ৩০টি দেশে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ কার্যকর করেছে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উৎস পিএইচওর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্টান্ডার্ডস অথরিটি ২০২২ সালের মধ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশে কমিয়ে আনার পাশাপাশি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট পরিহার করার ঘোষণা দিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এখনো ৫০০ কোটি মানুষ শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণজনিত ঝুঁকির মধ্যে আছে, যাদের অধিকাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালে রিপ্লেস অ্যাকশন প্যাকেজ ঘোষণা করে, যেখানে ২০২৩ সালের মধ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটমুক্ত বিশ্ব অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেছেন, ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশে কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদকে আহ্বায়ক করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়ে। আশা করি, শিগগিরই এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

ঢাকা/সাওন/রফিক