ঢাকা, শনিবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৩০ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সফল উদ্যোক্তার কষ্টের গল্প

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৯ ৭:০৬:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২০ ১২:২০:৫৩ পিএম

কাজী সাজিদুর রহমান। পরিবেশবান্ধব কাগজ শিল্পে যার বিচরণ।  ২০০৩ সালে বিএসসি (সিএসই) শেষ করেছেন।  তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি।  যেখানে তৈরি হয় কাগজের কাপ, প্লেট, বক্সসহ নিত্য নতুন পণ্য। ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে সেরা এসএমই উদ্যোক্তা ও ২০১৯ সালে বর্ষসেরা এসএমই উদ্যোক্তা নির্বাচিত হন।  দীর্ঘ ৮ বছর সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন।  নিম্নমানের পেপার কাপ আমদানি, আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে পণ্য আমদানি, কাঁচামালের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে এই শিল্প এখন নানা সংকটে। সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে রাইজিংবিডির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির প্রধান প্রতিবেদক এম এ রহমান মাসুম।  

রাইজিংবিডি: কাগজের কাপ-প্লেটের ব্যবসা শুরু কীভাবে?

কাজী সাজিদুর রহমান: ২০১০ সালে সৌদি আরবে হজ পালনের সময় একদিন মসজিদের প্রথম সারিতে বসে ইফতার পেয়েছিলাম। ইফতারের আইটেমগুলোর মধ্যে ছিল বড় এক কাপ খেজুর।  নামাজ শুরুর আগে পানি ও কয়েকটি খেজুর দিয়ে ইফতার করি।  তবে বাকি খেজুরগুলো কাগজের এই কাপে মুড়িয়ে পকেটে রাখি।  রাতে হোটেলে আসার পর ক্ষুধা লাগলে কাগজের কাপ খুলে খেজুর খাওয়ার সময় ব্যবসার পরিকল্পনা মাথায় আসে।  এরপরই নিজের কাছে থাকা ১০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু।  ব্যবসা যখন প্রসার লাভ করলো, তখন ব্যাংক ঋণ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি নামে কারখানা স্থাপন করি।

রাইজিংবিডি: বর্তমানে কাগজের কাপ-প্লেটের ব্যবসা কী পর্যায়ে রয়েছে?

সাজিদ: আমার কারখানায় বর্তমানে ২৮ ধরনের কাপ ও ৪ ধরনের প্লেট তৈরি হয়।  বাংলাদেশে এই ধরনের উদ্যোগ অনেকেই নিয়েছেন।  আমার জানা মতে, ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০টির মতো কারখানা স্থাপন হয়েছিল।  বর্তমানে বাংলাদেশেই সাড়ে ১২ কোটি টাকার পণ্যের চাহিদা রয়েছে এ শিল্পে।  উচ্চ শুল্কায়নের কারণে আমরা তিনটি ফ্যাক্টরি মাত্র সাড়ে ৩ কোটি টাকার চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি।  তাও এখন হুমকির মুখে।  তবে এ শিল্পে বর্তমানে বিশ্বে ৩১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে।

রাইজিংবিডি: এ  ব্যবসায় কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?

সাজিদ: আমার ব্যবসা ৮ বছর চলমান।  প্রথম চার বছরে সফলতা আসতে শুরু করে।  তবে যখন আমরা পেপার কাচের বড় বাজারে প্রবেশ করলাম তখনই জটিলতা সামনে আসলো। আমরা দেখলাম বিদেশ থেকে খুবই কমমূল্যে প্লাস্টিকের কাপ বাজারে অবাধে প্রবেশ করছে।  শুরুতে আমাদের প্রধান কাঁচামাল পি কোটেট বোর্ড ও পিএলএ কোট বোর্ডের ২০১২ সালে শুল্ক-কর ছিল ৬১ শতাংশ।  ওই সময়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের উদ্যোগে ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৪১ শতাংশ শুল্ককর বিদ্যমান।  তারপরও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।  শুধু তাই নয় বর্তমান ব্যবসার যে পরিস্থিতি তাতে আগামী ৬ মাস পর্যন্ত টিকে থাকা যাবে কিনা সেটাই ভাবছি।  ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে পারছি না ঠিকমতো।

আমাদের দেশে চীন, কোরিয়া ও ভারত থেকে বেশি আমদানি হয়।  আমি যখন তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে চাই কিংবা রপ্তানি করতে চাই তখন উৎপাদন মূল্যে তাদের সঙ্গে পেরে উঠছি না। যেহেতু পুরো শিল্পের উপকরণ পরিবেশবান্ধব তাই পেপার কাপের কাগজের আমদানি মূল্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশে অনেক কম কিংবা শূন্য শুল্ক।  যেমন-ভারতে শূন্য শুল্ক, নেপালে সাড়ে ৭ শতাংশ, মিয়ানমারে ৫ শতাংশ।  মধ্যপ্রাচ্যে মাত্র ৫ শতাংশ।  কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ৪০ শতাংশ।  এর মধ্যে শুল্ক ১৫%, ভ্যাট ১৫%, এআইটি ৫% ও এটিপি ৫%।  তাই তাদের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতায় পারছি না।

রাইজিংবিডি: এ অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব?

সাজিদ: কাঁচামালের ওপর শুল্ক-কর যদি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নামিয়ে আনা যায়, তাহলে এই সেক্টরে ব্যাপক প্রসার করা যেত।  রপ্তানি বলেন কিংবা কর্মসংস্থান বলেন সবদিকেই দেশের জন্য ইতিবাচক হতো। আমরাও ব্যবসায় টিকে যেতে পারতাম।  উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ২০০ মিলি লিটারের একটি কাগজের কাপের হিসাব ধরি।  রপ্তানির বিষয়টি বিবেচনা করলে বর্তমানে কাপ প্রতি উৎপাদন খরচ হয় ১.১০ পয়সা।  যেখানে বিদেশি ক্রেতারা কাপ প্রতি ৭৫ পয়সায় অর্ডার দিতে চায়। যদি শুল্ক-কর ১০-১৫ শতাংশ করা সম্ভব হতো এবং একই সঙ্গে দেশীয় পণ্যের সুরক্ষায় আমদাানিকৃত ফিসিড পণ্য কেজি প্রতি ১.৫ ডলার থেকে বৃদ্ধি করে সাড়ে তিন ডলার করা যেতো তাহলে আমরা মার্কেট ধরতে পারতাম।  অন্তত ১০০ করাখানা স্থাপন হতো বাংলাদেশে।

রাইজিংবিডি: আপনার নতুন পণ্যের বিষয়ে বলুন..

সাজিদ: আমি এই মুহূর্তে সুপারির পাতা দিয়ে কাপ ও প্লেট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।  যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।  ইতিমধ্যে বেশি কিছু পণ্য বিক্রিও করেছি। এছাড়া পলিথিনের বিকল্প হিসাবে কাগজের ব্যাগ তৈরি করতে সক্ষম। তবে আর্থিক টানাপোড়নের কারণে এই প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে পারছি না।

রাইজিংবিডি: তরুণ উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ..

সাজিদ: তরুণদের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে—আসলে কী করতে চান।  আধুনিক যুগে ব্যবসার নতুন নতুন পথে হাঁটতে পারেন তারা।  তবে হুট করে ব্যবসায় না নেমে চিন্তা-ভাবনা করে নামা উচিত।  আগে বাঁধাগুলো চিহ্নিত করে, তা কীভাবে দূর করা সম্ভব সেই পলিসি নিয়ে ব্যবসায় নামতে হবে।  আর একটি বড় বিষয় হলো ধৈর্য।  এটা না থাকলে তিনি সফল উদ্যোক্তা হতে পারবেন না।  এর সঙ্গে সততা ও পরিশ্রম অবশ্যই প্রয়োজন।  যেমন-ওয়ালটন।  ধৈর্য, সততা ও পরিশ্রম ছিল বলেই ওয়ালটন বাংলাদেশে আইকন।  আধুনিক বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা।

রাইজিংবিডি: রাইজিংবিডির পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন?

সাজিদ: রাইজিংবিডির সাথে আমার সম্পর্ক ব্যবসার শুরু থেকেই।  আমি যখন সেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পাই, তখন প্রথম নিউজ করে রাইজিংবিডি। এরপর দেশের সব জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিউজ হয়।  রাইজিংবিডি ইতিবাচকভাবে দেশের ছোট ছোট ঘটনা তুলে আনে—এটা বড় ধরনের অর্জন, সবচেয়ে বড় ইতিবাচক।




এম এ রহমান/সাইফ