ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘ওয়ালটন পুঁজিবাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের অবশ্যই ভালো হবে’

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২১ ১:৩৮:১৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২২ ৭:২৮:০০ পিএম

ড. এ. বি. মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম। ‘মির্জ্জা আজিজ’ নামে তিনি সমধিক পরিচিত। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, বরেণ্য এই ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামস কলেজ থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর এবং বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন শুরু হয় ঢাবিতে শিক্ষক হিসেবে। জাতিসংঘে কাজ করেছেন দীর্ঘ সময়। ছিলেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান। ২০০৭-০৮ সালের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে হয়েছেন প্রশংসিত।
দেশের শীর্ষ ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানি ওয়ালটনের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ইতিবাচক দিক, শেয়ারবাজার চাঙ্গা করতে করণীয়, পুঁজিবাজারে গুজব এড়িয়ে নিশ্চিত বিনিয়োগের উপায়- রাইজিংবিডির সঙ্গে তাঁর একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে ইত্যাদি বিষয়। কথোপকথনে ছিলেন রাইজিংবিডির প্রধান প্রতিবেদক এম এ রহমান মাসুম। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।  

 

রাইজিংবিডি: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনি পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারও সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আনতে চাইছে- এ প্রসঙ্গে আপনার অভিমত জানতে চাই।

মির্জ্জা আজিজ: আমি দায়িত্ব পালনকালে বড় একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তিতাস গ্যাসকে পুঁজিবাজারে নিয়ে এসেছিলাম।  আরো কয়েকটি ওয়েল কোম্পানি আমি এনেছিলাম। এরপর সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব ২৬টি কোম্পানি আইডেন্টিফাই করে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখনই বলেছিলাম, বিষয়টি আপনার সার্বক্ষণিক নজরে রাখতে হবে। না হলে হবে না। কারণ এখানে কিছু লোকজনের কায়েমি স্বার্থ আছে। ফলে বাধার সম্মুখীন হবেন। যেমন- তিতাস গ্যাসের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হয়েছিল। পরে আমি একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম- শ্রমিকদের একটা সুবিধা দেব। ১০ শতাংশ শেয়ার আমি শ্রমিকদের জন্য রিজার্ভ রাখব। তাহলে তাদের ব্যক্তিস্বার্থ এবং অংশগ্রহণও থাকবে। এই ধরনের সার্বক্ষণিক নজর না রাখলে হবে না। এখন পর্যন্ত ২৬টি কোম্পানির একটিও আসেনি। এখন আবার শুনছি, ব্যাংকগুলোকে আনার কথা হচ্ছে। সরকারি ব্যাংকের মধ্যে দু’একটির অবস্থান খুবই নাজুক। সেই ব্যাংকগুলো আসতে চাইলে আমি যদি এসইসি’র চেয়ারম্যান থাকতাম হয়তো অনুমতি দিতাম না। কারণ আমি চাই না, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকির মুখে পড়ুক।


রাইজিংবিডি: সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার ক্ষেত্রে এবং বাজার চাঙ্গা করতে করণীয় কী বলে মনে করেন?

মির্জ্জা আজিজ: আমাদের দেশে লাভজনক সরকারি-বেসরকারি অনেক কোম্পানি আছে। বিদেশি এবং দেশি মালিকানাধীন বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে এসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং অর্থমন্ত্রণালয়কে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যদিও এই প্রচেষ্টা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না। আবার আমাদের মার্চেন্ট ব্যাংকসহ অন্যান্যরা এ বিষয়ে কিছু করতে পারছে না। দুই বছরে অন্তত একটা যদি ভালো ইস্যু না আসে তাহলে লাইসেন্স বাতিল করার নিয়ম আছে। তাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আবার যখন নতুন কোম্পানি মার্কেটে আসতে চায় তখন তাদের ভ্যালুয়েশন নিয়ে হাজার ধরনের সমস্যা থাকে।

 

রাইজিংবিডি: গতিশীল পুঁজিবাজারের পথে বাধাগুলো কী?

মির্জ্জা আজিজ: সরকার প্রণোদনাসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রণোদনা দিয়ে পুঁজিবাজারের উন্নতি সম্ভব নয়।  এটা অনেকটা সাময়িক ওষুধ দেওয়ার মতো, স্থায়ী সমধান নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আরো শানিত করতে হবে। যাতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। মার্চেন্ট ব্যাংকসহ যে সব সংস্থা রয়েছে তাদের পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে আরো বেশি ভূমিকা জরুরি। একই সঙ্গে নতুন নতুন ভালো কোম্পানি আনার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশি বা বিদেশি কিংবা সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসাবেও আমরা এশিয়ার ভেতরে অনেক পিছিয়ে আছি।
 


 

রাইজিংবিডি: নতুন কোম্পানি বাজারে আনার ক্ষেত্রে সরকার কীভাবে তাদের প্ররোচিত করতে পারে?

মির্জ্জা আজিজ: যারা পুঁজিবাজারে আসবে তাদের কর্পোরেট কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। মোবাইল কোম্পানিগুলোর বর্তমান অবস্থান ভালো। তবে মোবাইল কেম্পানিগুলো আনার ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম ট্যাক্স রেট দিয়ে উৎসাহিত করা উচিত। সম্প্রতি ওয়ালটনসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসছে। ওয়ালটনকে আমি যতটুকু দেখেছি তাতে মনে হয়েছে- ওয়ালটন সন্তোষজনক প্রতিষ্ঠান। তারা তো রপ্তানি মার্কেটেও যাচ্ছে। দেশের ভেতরে ওয়ালটন পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। এটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান। তবে যে কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার আগে প্রিমিয়ামসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনা করা উচিত নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর।

 

রাইজিংবিডি: দেশের শীর্ষ ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানি ওয়ালটনের পুঁজিবাজারে আসার বিষয়টিকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আপনার অভিমত কী?

মির্জ্জা আজিজ: ওয়ালটন নিঃসন্দেহে ভালো কোম্পানি। এর যথেষ্ট সুনাম আছে। আমি মনে করি, এ ধরনের কোম্পানি পুঁজিবাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো হবে। তবে প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে বাজার অস্থিতিশীল না হয়। এ ধরনের কোম্পানিগুলোর আরো বেশি শেয়ারবাজারে আসা উচিত।

অন্যদিকে, পুঁজিবাজারের বড় একটি অংশ হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এই খাতের অবস্থা আমরা জানি। এদের দর পতন হলে তখন সার্বিকভাবে সূচক কমে যায়। আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা সূচক বুঝে অন্য খাতে বিনিয়োগ করে। আবার অনেকেই ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ করে। সেই ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। শেয়ারবাজারও সেভাবে উন্নতি হচ্ছে না। সম্প্রতি একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ১২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হবে। ব্যাংকগুলো দুই হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করতে পারবে। এ হিসাবে ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ লিমিটের বাইরে রাখা হবে। এরপর কিছুদিন শেয়ারবাজারের সূচকের উন্নতি হয়েছিল। এখন করোনাভাইরাসের কারণে সূচক পুনরায় নিন্মমুখী।

 

রাইজিংবিডি: শেয়ারের মূল্য নিয়ে গুজবের কথা প্রায়ই শোনা যায়- বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

মির্জ্জা আজিজ: পুঁজিবাজারে গুজব কাজ করে। কারণ বিনিয়োগকারীরা জেনেশুনে অনেক সময় বিনিয়োগ করেন না। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না। তবে বিশ্বজুড়ে যে অভিজ্ঞতা, তাতে দেখা যায় পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ লাভজনক। স্বল্প মেয়াদে লাভ এবং ক্ষতি দুটোই হতে পারে। আমরা যদি হুজুগে বিনিয়োগ করি তাহলে ক্ষতির মুখে পড়তেই হবে।

 

রাইজিংবিডি: গুজব রোধে করণীয় কী বলে মনে করেন?

মির্জ্জা আজিজ: আজ বিনিয়োগ করে কালকেই লাভ- বিনিয়োগকারীদের এরূপ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সাধারণত দুই থেকে তিন বছর ধরে জেনেশুনে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ করে তবেই লাভ পাওয়া যায়। যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করব তার আর্থিক ভীত কতটা মজবুত যাচাই করতে হবে। আর একটি হচ্ছে, একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ না করে অনেক কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সঞ্চয়ের সবটুকু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করা। তাহলে ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ থাকে। সমস্যা হলো বিনিয়োগকারীরা এগুলো হিসাব না করেই পুঁজিবাজারে আসছে। (চলবে)



ঢাকা/তারা