ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘করোনায় আক্রান্ত হওয়া মানেই মৃত্যু নয়’

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-৩১ ১১:১৮:৫৩ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-৩১ ৩:১০:৪৩ পিএম

প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত এই পৃথিবীর মানুষ। এ এক মহামারির কাল আজ উপস্থিত। এ সময় মানুষকে যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি রাখতে হবে দৃঢ় মনোবল। কেননা আমরা সবচেয়ে খারাপ পরিণতি কল্পনা করে অবান্তর প্রতিক্রিয়া দেখাই এবং সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের যে ক্ষমতা রয়েছে তা ভুলে যাই। করোনাকালীন এই দুযোর্গে গুজব, আতঙ্ক কটিয়ে উঠতে করণীয় জানাচ্ছেন কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল। কথোপকথনে ছিলেন ছাইফুল ইসলাম মাছুম।  

মাছুম: করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারি রোধে ঘরে থাকাটাই এখন একমাত্র উপায়। কিন্তু অনেকেই বিষয়টি মানছেন না বা বুঝতে চাইছেন না। মানুষকে ঘরে ফেরাতে সেনাবাহিনীকে পর্যন্ত মাঠে নামতে হয়েছে। 

মোহিত কামাল: এ জন্য বাঙালির দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিশ্বজুড়ে একই চিত্র দেখছি। গতকাল  বিশ্বের ৩৬০টা চ্যানেল ঘুরিয়ে দেখলাম, সব জায়গায় পুলিশ-আর্মি জনগণকে ঘরে ফেরাতে কাজ করছে। মানুষ সচেতন না হওয়ায়, গুরুতর বিষয়কেও পাত্তা দিচ্ছে না। আমরা বড়ো ঝুঁকিতে আছি। তবে এখনো আমাদের দেশে যে হারে আক্রান্ত হওয়ার কথা, সে হারে হয়নি। হবে না, তা নয়। তারপরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখনো অসচেতন। এছাড়া যারা টেলিভিশন দেখছেন না, রেডিও শুনছেন না, পত্রিকা পড়ছেন না, তারাই মূলত না-জেনে করোনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। পাড়ায় পাড়ায় জীবন সংহারক আসল বাঘ (করোনা) ঢুকে পড়েছে। এই বাঘকে সাহসের সঙ্গে গণনায় রাখতে হবে। উপেক্ষা করা হবে মূর্খতা। এই দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তি অর্জনের জন্য নলেজ নিতে হবে। এজন্য মাঝারি ধরনের ভয় থাকা ভালো। অতি আতঙ্ককে শাসন করার কৌশল যেমন শিখতে হবে, তেমনি একদম ভয় না-থাকাও বিপজ্জনক। মনে রাখতে হবে সবাইকে।    

মাছুম: সরকার বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে বলে আপনি নিজে মনে করছেন?

মোহিত কামাল: সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখছে। তবে উর্দ্ধতন ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলেছেন; মিডিয়াতে শুনেছি, চিকিৎসকদের সবার জন্য পিপিই দরকার নেই। দুঃখজনক কথা এটি। সামর্থ নেই এক কথা, দরকার নেই আরেক কথা। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকলে, সে সহজে সংক্রমিত হয়ে তার পরিবারকে আক্রান্ত করবে। সমস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আক্রান্ত করবে। ইতোমধ্যে দেশবরেণ্য কয়েকজন চিকিৎসক সেলফ কোয়ারেন্টাইনে আছেন। কেউ বা করোনায় পজিটিভ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সেনাবাহিনী-পুলিশ মাঠে নেমেছে, তারাও পুরাপুরি নিরাপদ না। কারণ কে আক্রান্ত, আর কে আক্রান্ত না- কেউ জানে না। আক্রান্ত মানুষ অবশ্যই নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখবেন। সরকারের দেওয়া হটলাইনে যোগাযোগ করে চিকিৎসা সুনিশ্চিত করতে হবে। কারণ সারা পৃথিবীতে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের জন্য অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এ যুদ্ধের সময় যেন প্রকৃত যোদ্ধারা অগ্রাধিকারভিত্তিতে পিপিই পায় খেয়াল রাখতে হবে।

মাছুম: এ সময় অনেক গুজব ছড়াচ্ছে। যে কারণে মানুষের মাঝে নানাবিধ আতঙ্ক ভর করছে। গুজবকে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করতে পারি?

মোহিত কামাল: যুদ্ধের ময়দানেও গুজব রটে, মহামারির ময়দানেও রটে। এই গুজবে সবাই আক্রান্ত হবে না, কেউ কেউ আক্রান্ত হবে। তবে বড় সত্য হচ্ছে, মানুষ নলেজের অভাবে গুজবে বিশ্বাস করে। মানুষ ফেইসবুকে, ইউটিউবে এটা-সেটা দেখে মনে করে- এটা করলে বেঁচে যাবো। মানুষ বিপদে খড়কুটো খেয়ে বেঁচে থাকতে চায়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে নির্দেশনা দিচ্ছে, মানুষের তা গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু কেউ যদি গুজবে বিশ্বাস করে থানকুনি পাতা খায়, সেটা তার মতো করে খাক, সেটা একান্ত তার অন্ধবিশ্বাস। তবে একথা মিডিয়াতে প্রচার করা অনুচিত।  রটানো অপরাধ। আবেগের বশে জটলা, গণজিকির এগুলো করাও উচিত না। এতে রোগ আরো দ্রুত ছড়াবে। এটা ধর্মের শুদ্ধ চর্চা না, ধর্মের অপব্যাখ্যা হবে। আমাদের নবীজি বলেছেন, তোমার এলাকা যখন মহামারিতে আক্রান্ত হবে, তখন যেখানে আছো- সেখানে থাকবে। এখানে-ওখানে যাবে না। নবীজির এ ধরনের সতর্কবার্তা আমরা অনেকে জানি না, জানতেও চাই না। কেবল হুজুগে নাচি। সবাইকে সত্য তথ্য দিয়ে আলোকিত করতে হবে। এই ভাইরাস যেহেতু মানুষ থেকে মানুষে স্থানান্তর হয়। মানুষের দেহে আশ্রয় নিয়ে বংশবিস্তার করে। এজন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার কথাও প্রচার করা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

মাছুম: অনেকে আবার খাবার মজুদ করে রাখছেন...

মোহিত কামাল: ধনীরা খাবার মজুদ করছে, গরিবেরা তো আর পারছে না। ধর্ম বলছে, নিজের ঘরে খাবার থাকলে হবে না, প্রতিবেশীর ঘরে খাবার আছে কিনা, সেই খোঁজও রাখতে হবে। প্রয়োজনে ভাগ করে খেতে হবে।

মাছুম: অনেকেই কোয়ারেন্টাইনে আছেন। কেউ স্বেচ্ছায় আছেন। এ সময় আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার উপায় কী?

মোহিত কামাল: বলেছি মাঝারি ধরনের ভয় থাকা ভালো। তবে অতি আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। আতঙ্কিত হলে আমাদের মানসিক শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। আমরা কাহিল হয়ে পড়ব। আমাদের সাহসী হয়ে উঠতে ঘরের মধ্যে আনন্দময় পরিবেশ বজায় রাখতে হবে, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা দিতে হবে। বাচ্চাদের সঙ্গে ইনডোর গেমস খেলা যেতে পারে। মূল কথা কোয়ারেন্টাইনে থাকা সময় উপভোগ্য করে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে করোনা মুক্ত থাকবো, আতঙ্ক থেকেও রেহাই পাবো। মনে রাখতে হবে, করোনায় আক্রান্ত হওয়া মানেই মৃত্যু নয়। পরিসংখ্যান বলে আক্রান্তদের সবাই মারা যায় না। অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এসব তথ্য মাথায় থাকলে মৃত্যু ভয়ে ভেঙে পড়বে না আক্রান্তজন। তাই অতিমাত্রায় আতঙ্কিত হবেন না। ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্তির সাহস বাড়াবে। পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এটিও এক মনস্তাত্ত্বিক ওষুধ। মানবদেহ-মনে শক্তিশালী রক্ষাব্যুহ তৈরি হয়ে যাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এ বিপজ্জনক অবস্থায় কথাটার গুরুত্ব ছড়িয়ে দিতে হবে বিশ্বজুড়ে জনগোষ্ঠীর মাঝে।

 

ঢাকা/তারা