ঢাকা, রবিবার, ৩ কার্তিক ১৪২৬, ২০ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘মুক্তবুদ্ধির যুক্তিবাদী সাংবাদিক ছিলেন মাহফুজ উল্লাহ’

এসকে রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১৩ ৪:৫৫:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-১৩ ৪:৫৫:২৭ পিএম

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : প্রয়াত মাহফুজ উল্লাহ ছিলেন মুক্তবুদ্ধির, যুক্তিবাদী একজন সাংবাদিক।  অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন অকৃপণভাবে। সকল ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে মাহফুজ উল্লাহ সবসময় সকলের ঐক্যের কথাই বলে গেছেন।  তার পছন্দের দল-মত থাকলেও তিনি অন্যের মতের প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল।’

সোমবার প্রয়াত সাংবাদিক-কলামিস্ট মাহফুজ উল্লাহর স্মরণে আয়োজিত এক স্মরণ সভায় বক্তারা এ মূল্যায়ন করেন।

স্মরণ সভায় ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘স্বৈরতন্ত্র অনেকবার চেষ্টা করেছে এদেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে, চিরস্থায়ী হতে। কেউ কিন্তু পারে নাই। সেই কারণে নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নাই।’

‘এখানে উপস্থিত সকলেই ঐক্যের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিতে পারি, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের কোনো জায়গা নেই। যারা মনে করেন স্বৈরতন্ত্রকে চাপা দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে, বিভিন্ন রকমের প্রভাব খাটিয়ে চিরস্থায়ী হতে পারে তারা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করছেন।’

মাহফুজ উল্লাহর স্মৃতিচারণ করে কামাল হোসেন বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহকে শ্রদ্ধা জানাতে সব মহলের লোক এখানে একত্রিত হয়েছে। উনাকে সম্মান জানাচ্ছেন কেন? কারণ তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন, সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যখন উচিত কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তখন তিনি উচিত কথা বলেছিলেন।’

মাহফুজ উল্লাহর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহর সঙ্গে আমার এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যে, তিনি আমার পাশে থাকবেন না, তা কখনো ভাবিনি। এক সময় তিনি বিএনপির সমালোচনা করেছিলেন। তিনি সত্যকে সত্য বলতেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কঠিন সময়ে গণতন্ত্রবিহীন, অধিকারবিহীন রাষ্ট্রে মাহফুজ উল্লাহ সত্য কথা বলার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে জাগিয়ে তুলেছেন। তিনি বেশ সাহসী ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি অনুপ্রাণিতও করতে পারতেন। তার অভাব পূরণ হবে না কোনোদিন। আসুন, আমরা তার চিন্তা বাস্তবায়নে অবদান রাখি। আর সেজন্য আমাদেরকে জেগে উঠতে হবে।’

প্রয়াত মাহফুজ উল্লাহকে মুক্তবুদ্ধির, যুক্তিবাদী একজন সাংবাদিক অভিহিত করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘যে দেশে গণতন্ত্র নাই, সে দেশে মুক্তিবুদ্ধি চর্চা ও লেখা কঠিন। কিন্তু মাহফুজ উল্লাহ তা পেরেছেন। যেখানে সমাজের কথা বলা দুঃসহ। সেখানে তিনি কথা বলেছেন, লিখে গেছেন।’

স্মরণ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপচার্য ড. এমাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এমন একটি সময় তাকে (মাহফুজ উল্লাহ) আমরা হারিয়েছি যখন তার সততা, স্বচ্ছতা, সাহসিকতা জাতির খু্ব প্রয়োজন ছিল।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহর সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। মুক্তিযুদ্ধের পরে আমি প্রথম যাকে খুঁজেছি তিনি হলেন মাহফুজ উল্লাহর ভাই মাহবুব উল্লাহ। তারা দুই ভাই ছিলেন এক বৃন্তে দুই ফুলের মতো। মাহফুজ উল্লাহর মূল অবদান হচ্ছে, পরিবেশ সাংবাদিকতা। পরিবেশ সাংবাদিকতায় অনেকদিন অমর হয়ে থাকবেন। সেইসঙ্গে তিনি ছিলেন বিশিষ্ট লেখক। তার লেখা অত্যন্ত বিচক্ষণ ছিল।’

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহকে আমি জানি ছাত্র অবস্থা থেকে। তিনি অনেক লিখেছেন, এর মধ্যে একটি লেখায় তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তা হচ্ছে ছাত্র ইউনিয়নের ইতিহাস।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহকে যখন দরকার ছিল তখন তিনি ছেড়ে গেলেন। কোনো হুমকি ভয়ভীতি মাহফুজ উল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পারেনি। মৃত্যুর সময় আত্মতুষ্টি নিয়ে যেতে পারেননি। মাহফুজ উল্লাহ জনগণের ঐক্য ও আন্দোলনের কথাই বলে গেছেন। ’

দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহ যুক্তিতে কথা বলতেন। যদিও যুক্তির জোর এখন কম। মাহফুজ উল্লাহ ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের একজন নির্মোহ বক্তা।’

বিশিষ্ট সাংবাদিক নুরুল কবির বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তার যে বৈশিষ্ট্য ছিল, তা তিনি শেষদিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন।’

আওয়ামী লীগের প্রাক্তন প্রেসিডিয়াম সদস্য নুহ-উল-আলম লেলিন বলেন, ‘আমি আর মাহফুজ উল্লাহ ছিলাম একই ব্যাচের। তিনি ঢাকা কলেজের এবং আমি জগন্নাথ কলেজের। রাজনৈতিকভাবে আমরা ছিলাম দুই মেরুর। তবে আমাদের দুজনের ছিল ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘যে দেশে মুক্তচিন্তা নেই সেখানেও মাহফুজ উল্লাহ যুক্তি দিয়ে সত্যকে বলার চেষ্টা করছেন। যে সমাজে কথা বলা ছিল কঠিন তিনি সেখানেও যুক্তি দিয়ে কথা বলেছেন। এ দেশে তিনি কথা বলার জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘মাহফুজ উল্লাহ কোনো দলের অনুগত ছিলেন না। তার পছন্দের দল ছিল, মত ছিল। তিনি একটা ভারসাম্য রেখে কথা বলতেন। মাহফুজ উল্লাহ ছিলেন ওয়ান ম্যান আর্মি।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘দেশ একজন স্বীকৃত পেশাজীবীকে হারিয়েছে। তার শেষ বই দুইটা কী ধরনের গবেষণাধর্মী, সেখানে তিনি স্পষ্ট হয়েছেন। তিনি ওসমানীকে নিয়ে বই লিখতে শুরু করেছিলেন।’

প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, ‘এমন নির্ভীক সত্যকে সত্য বলার সাংবাদিক খুব কম। মাহফুজ উল্লাহ মেরুদণ্ড সোজা করে হাঁটতেন। তার মতো সাংবাদিক পাওয়া দুস্কর। তিনি মানুষ হিসেবেও ছিলেন অনন্য একজন ভালো মানুষ। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, ভালোবাসা জানাতেন। তিনি চিন্তা-চেতানায় অনেক অগ্রগামী ছিলেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অত্যন্ত সজ্জন একজন ব্যক্তি ছিলেন মাহফুজ উল্লাহ। আমরা একই রাজনীতি করেছি। মাহফুজ উল্লাহর টকশোর কথায় আমি ছিলাম মুগ্ধ। তার বইগুলো এত সুন্দর ছিল, যা প্রশংসনীয়।’

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘আজকে আমাদের জাতীর জীবনে যেরকম অন্ধকার নেমে এসেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে ওইটা মৃত সমাজ। এক্ষেত্রে মাহফুজ উল্লাহ ছিলেন ব্যতিক্রম। মাহমুজ উল্লাহ ছিলেন সত্য প্রকাশে আপোষহীন।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাক্তন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, ‘স্বাধীন সাংবাদিকতা আর নেই। যেখানে ভোটাধিকার থাকে না সেখানে কথা বলার স্বাধীনতা থাকে না। পেশাজীবী আইনজীবী, আর সাংবাদিকরা যদি দলীয় কর্মী না হতেন তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানের সভাপতিত্বে শোক সভায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপির প্রাক্তন নেতা শমসের মুবিন চৌধুরী, পিএসসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. সাদাত হোসেন, সিপিডি ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ মে ২০১৯/রেজা/সাইফুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন