ঢাকা, রবিবার, ৩ কার্তিক ১৪২৬, ২০ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পহেলা বৈশাখ কি পান্তা-কালচার? || সৌমিত্র শেখর

সৌমিত্র শেখর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-১৩ ৫:৩৪:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-১৫ ১২:০৬:২৮ পিএম

আজ চৈত্রসংক্রান্তি। বছরের শেষ দিন। কাল পহেলা বৈশাখ। নববর্ষের প্রথম দিন আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে পালনের জন্য চারিদিকে ‘সাজ সাজ’ রব যেন! শহরে এই ‘সাজ সাজ’ ভাবটা বেশি দেখা যায়। গ্রামে আয়োজন প্রক্রিয়াটি ভেতরে ভেতরে চললেও প্রস্তুতির আড়ম্বর সেখানে কমই চোখে পড়ে। তবু পহেলা বৈশাখ আসে গ্রাম ও শহর উভয় জায়গায়; পালিতও হয়। পহেলা বৈশাখ পালনের নানা আয়োজনের মধ্যে দেশি পোশাক, দেশি খাবার, লোকসামগ্রী তৈরি ইত্যাদি প্রত্যেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর পাশাপাশি পান্তা পরিবেশন ও খাবারের খবরও আসে। গত কয়েক বছর ধরে নগর ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বল শহরগুলোতে পহেলা বৈশাখের দিন পান্তা-পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ খাবারের ব্যাপারটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আয়োজন করতে পারলে এবং পকেটে টাকা থাকলে এর সঙ্গে ইলিশ মাছ যুক্ত হচ্ছে। ওপরের তলার শহরবাসীদের আগ্রহে এই পান্তা-পেঁয়াজ-ইলিশের পত্তন। আর তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণে এর বিস্তার। তারা এখন অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করে পহেলা বৈশাখের দিন পান্তা-পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ গিলছে বেশি বেশি। এসব আবার তারা সাধারণ থালায় খাচ্ছে না। খাচ্ছে মাটির সানকিতে। জিজ্ঞেস করলে তারা বলছে, এটাই নাকি বাঙালির ঐতিহ্য! ঢাকার অভিজাত এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে পহেলা বৈশাখের ‘মেনু’ও এগুলো। তাদের বক্তব্য, পহেলা বৈশাখে সানকিতে পান্তা খাওয়াই বাঙালি সংস্কৃতি! সত্যি ভেবে দেখা দরকার এবং তাদের জানানো প্রয়োজন, পান্তা-কালচার বাঙালির কি না! এ বিষয়টি ঠিকঠাক বুঝবার জন্য গত বছর পহেলা বৈশাখের বিকেলে আমি ঢাকা থেকে দূরবর্তী বেশ কয়েকটি গ্রামের ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে কিছু মানুষের সঙ্গে ফোনালাপ করেছি। জেনেছি, পহেলা বৈশাখের দুপুরে তারা পান্তা-পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ বা পান্তা-ইলিশ খায় নি। আমার শৈশব-কৈশোরেও পহেলা বৈশাখে আমরা পান্তা খাই নি। আজ তাহলে শহরে সানকিতে পান্তা-পেঁয়াজ-কাঁচামরিচের এতো হিড়িক কেন?

এ ব্যাপারে আমাদের প্রাচীন গ্রন্থগুলো কী বলে? বাঙালির প্রাচীন গ্রন্থ ‘চর্যাপদ’-এ আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের যে চিত্র মেলে তাতে ধান থেকে চাল বের করে ভাত খাবারের কথা আছে। দারিদ্র্যের কারণে মৃণাল বা পদ্মের ডাঁটা খাবার কথাও জানা যায়। এখনো সেই ধারাবাহিক স্বাদের কারণে পদ্মের ডাঁটা অনেকের প্রিয়। একদিন গোয়াল ভরা গরু ও গোলা ভরা ধান বাঙালির ঠিকই ছিলো, কিন্তু তা সবার নয়। সেদিনও দারিদ্র্য অধিকাংশ মানুষকেই গ্রাস করেছিল। তাই ‘চর্যাপদ’-এ অর্থাৎ প্রাচীনকালেই বলা হয়েছে: হাঁড়িতে ভাত নেই, কিন্তু প্রতিদিনই লোক আসছে। মধ্যযুগের বাংলা গ্রন্থ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ দারিদ্র্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ আছে পান্তা খাবারের কথা। এই গ্রন্থের চরিত্র ফুল্লরা দারিদ্র্যের কারণে তার মাটির পাত্র অর্থাৎ সানকি পর্যন্ত বন্ধক দেয়। যেহেতু সানকি বন্ধক দেয়া হয়েছে, সেহেতু পান্তা রাখা হয় মাটি গর্ত করে। কী ভয়াবহ দারিদ্র্য! ফুল্লরার আকুতি এভাবে: ‘দুঃখ কর অবধান, দুঃখ কর অবধান/ আমানি খাবার গর্ত দেখ বিদ্যমান’।


শহরগুলোতে বাঙালি সংস্কৃতির নামে যে পান্তা-কালচার চলছে, তাকে সংস্কৃতির বিবর্তন কোনোভাবেই বলা চলে না; এটাকে বলতে হয় বিক্রিত ও বিকৃত সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখে পান্তা খাওয়া আর গরিবের দারিদ্র্য নিয়ে মশকরা করা একই কথা


বাঙালির প্রাচীন ও মধ্যযুগে যেমন, এযুগেও তেমনি পান্তা বা আমানি দুঃখের প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত। দারিদ্র্যের এই যুগে গরিবেরা বাধ্য হয়ে বছরের প্রায় প্রতিদিনই পান্তা খায়। আমাদের দেশের আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত দারিদ্র্যের কারণে পান্তা খাওয়া প্রায়ই দেখা যেতো। এই মানুষেরা একটু গরম ভাত পেলে জীবন ধন্য মনে করে। তাই গ্রামাঞ্চলে ‘ভাগ্যবান পরিবার’ বলতে সে পরিবারকেই বোঝায়, যাদের প্রতিদিন গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মাছের ঝোল ও সামান্য শাকের অভাব হয় না। পান্তা ধনীরা খেত না তা নয়। অতি গরমে দু-একদিন সামান্য পান্তা খেয়ে শরীর জুড়ানোর কাজটি তারা ঠিকই জানতো। তবে সে পান্তায় শুধু পেঁয়াজ-মরিচ মিশ্রিত ছিলো না, ছিলো জিভে জল আসা নানা পদের সমন্বয়।

বিশ্বাসপ্রবণ বাঙালির পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে পেঁয়াজ-মরিচ মিশ্রিত করে পান্তা খাবারের ব্যাপারটি তাই একেবারেই নেই। বাঙালিরা যুগ যুগ ধরে নববর্ষের প্রথম দিনে ভালো খাবার, ভালো পোশাক পরবার, ভালোভাবে থাকবার চেষ্টা করেছে এবং এখনো গ্রামাঞ্চলে তাই তারা করে। গত বছর আমি মুঠোফোনে সে রকমই সংবাদ পেয়েছি তাদের কাছ থেকে। তাদের বিশ্বাস, পহেলা বৈশাখে ভালো খেলে সারা বছর তারা ভালো খেতে পারবে; ওই দিন নতুন পোশাক পরলে সারা বছর পোশাকের কষ্ট তাদের হবে না; পহেলা বৈশাখের দিন প্রতিবেশী ও অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে সারা বছর ভালোভাবে কাটবে। এ দিন বাড়ির ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে প্রণাম বা সালাম করে আশীর্বাদ নেয়। বড়োরা আশীর্বাদের সঙ্গে পরবি (পর্ব >পরবই) দেন ছোটদের। ছোটরা সে টাকা দিয়ে মিষ্টি-ঝাল আর যাই কিনে খাক-না কেন, কেউ পান্তা কিনে খায় না। পান্তাকে গ্রামবাংলার বাঙালি কোনো দিনই ‘ভালো’ খাবার বলে নি। সাধারণ বাঙালিজন দারিদ্র্যের কারণে বছরের প্রায় প্রতিদিন পান্তা খেলেও বা খেতে বাধ্য হলেও পহেলা বৈশাখে পান্তা খাওয়া থেকে তারা দূরে থেকেছে। তারা খেয়েছে ‘ভালো খাবার’। বাঙালি জানে ‘ভালো খাবার’ কী? তাই পহেলা বৈশাখে তারা অন্তত গরম ভাত ও মাছ-মাংস খায়। মিষ্টিও তাদের খুব পছন্দ। মিষ্টি বলতে রসগোল্লা বা সন্দেশই পুরনো। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ভালো খাবারের একটি তালিকা মধ্যযুগের লেখক ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য ঘেঁটে তৈরি করা যায়: ঘণ্ট, ভাজা, নানা রকমের শাক, ঘন করে অড়হর ও ছোলার ডাল, মুগ বা মাষের ডালের বড়ি; দুধথোড় ডালনা; চিনিরসে কাঁঠালের বিচি। মাছের মধ্যে আম দিয়ে শৈল মাছের ঝোল বা চড়চড়ি; চিংড়ির ঝালবাগা; রুই-কাতল-বাচার উপাদেয় রন্ধন। কচি ছাগ বা মৃগ মাংসের ঝোল, কালিয়া, দোলমা ইত্যাদির বর্ণনাও ‘অন্নদামঙ্গল’-এ আছে। এ সবের পর টক বা অম্বল ভক্ষণ করা যায়। সবশেষে পিঠা বা মণ্ডা-মিঠাই। চিকন চালের ভাতে গাওয়া ঘি দিয়ে এসব বাঙালিরা ভালো খাবার হিসেবে খেতো। প্রতিদিন এ খাবার জুটতো না, এটা নিশ্চিত। কিন্তু প্রত্যাশা থাকতো এ ধরনের ভালো খাবার তারা খাবে নিয়মিত। বাঙালির এ ধরনের ভালো খাবারের সঙ্গে পান্তার কোনো যোগ নেই।

ইতিহাসের পালাবদলে বাঙালির চিরায়ত ভালো খাবারের তালিকায় উপর্যুক্ত খাদ্যের বাইরে মোগল-পাঠানদের খাবারের কিছু মিশ্রণ ঘটেছে; ইংরেজদের খাবারও যুক্ত হয়েছে। চাইনিজ খাবার এখন তো বাংলাদেশে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিয়ে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে মাংসের রোস্ট, রেজালা, কাবাব এখন বাঙালির ভালো খাবারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বোরহানি বা বোতলজাত পানীয়ের সমাদর বাঙালিদের কাছে বেড়েছে। কিন্তু এর কোথাও পান্তার স্থান নেই। তাহলে পান্তা-কালচারকে এতো জনপ্রিয় করা কেন? আজ শহরগুলোতে বাঙালি সংস্কৃতির নামে যে পান্তা-কালচার চলছে, তাকে সংস্কৃতির বিবর্তন কোনোভাবেই বলা চলে না; এটাকে বলতে হয় বিক্রিত ও বিকৃত সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখে পান্তা খাওয়া আর গরিবের দারিদ্র্য নিয়ে মশকরা করা একই কথা। পুস্তকে আছে: ‘পরের মুখে শেখা বুলি, পাখির মতো কেন বলিস; পরের ভঙ্গি নকল করে নটের মতো কেন চলিস?’ পহেলা বৈশাখে পান্তা খেয়ে শহরের অধিকাংশ বাঙালি নটের মতোই চলছে। বাঙালির উচিত হলো: দারিদ্র্যের প্রতীক পান্তা বর্জন করে পহেলা বৈশাখে সামর্থ্য অনুসারে সবার সাথে ভালো ভালো খাবার গ্রহণ করা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ এপ্রিল ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন