ঢাকা, সোমবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং মানবিক সংকট

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২৭ ১২:২৬:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২৭ ১২:২৬:৫০ পিএম
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং মানবিক সংকট

অলোক আচার্য: আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্র ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গৃহযুদ্ধের কারণে আজ পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার লড়াই দেশের জন্য কতটা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে আধুনিক সমাজে ইয়েমেন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গৃহযুদ্ধে ইয়েমেন এখন পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার পথে। মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতির সাক্ষ্য বহনকারী এই দেশটির প্রতিটি মানুষ বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। যদিও তারা জানে না ভাগ্য তাদের কোন দিকে নিয়ে যাবে। 

জাতিসংঘের মতে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে ইয়েমেনে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে যুদ্ধাবস্থা চলায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় সেখানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে বহু বেসামরিক মানুষ। ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, পানি শোধন কেন্দ্রসহ সব ধরনের সেবামূলক স্থাপনা। গত তিন বছরে সেখানে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। যারা অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এ কারণেই কথায় বলে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। বলা বাহুল্য, এই বেসামরিক মানুষের বড় অংশই শিশু। সেখানে প্রতি ১২ মিনিটে মারা যাচ্ছে একটি শিশু। সে হিসেবে একদিনে সেখানে ১২০টি শিশু মারা যাচ্ছে। এ ছাড়াও পাঁচ বছরের নিচের ৪ লাখ শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। সেখানকার শিশুরা জানে না তারা পরবর্তীতে কী খাবে অথবা তাদের সেই খাবার কোন উৎস থেকে সরবরাহ করা হবে। হাসপাতালগুলোতে অপুষ্টিতে ভোগা অসংখ্য শিশু মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে দেশটিতে চরম দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছে। ভালো খাবার দূরে থাক কোনোমতে সামান্য খাবার পেয়ে জীবন বাঁচানোটাই সেখানে আজ বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যও দেশটিতে এখন আকাশছোঁয়া।

তিন বছর আগে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের অনেক এলাকা দখল করে নিলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সমর্থিত সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশটির সরকারের পক্ষ নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তবে ইয়েমেনের এই সংকটকে সৌদি আরব আর ইরানের মধ্যে আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কৌশলগতভাবে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেশটি বাব আল-মানডারের ওপর বসে আছে, যা রেড সি আর গালফ অফ এডেনের সংযোগস্থল। এখান থেকেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের সরবরাহ হয়ে থাকে। ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি দেশটিতে ভয়াবহ অর্থ তারল্যের সৃষ্টি হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সাধারণত যা ঘটতে পারে ইয়েমেনে সেটাই ঘটছে। এ পরিস্থিতি তৈরির জন্য সৈদি আরবের রণনীতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়েমেনে সৌদি আরব নিকৃষ্টতম কৌশল ব্যবহার করছে। যা বোমা মেরে বা স্থাপনা উড়িয়ে দেয়ার চেয়েও ভয়াবহ। সেটা হলো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবরোধ। যার পরিণতিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ধ্বংসের অনুপাতে এর ব্যাপকতা ও স্থায়িত্ব অনেক বেশি। বলা চলে যুদ্ধ আর অবরোধে পুরোপুরি বিধ্বস্ত ইয়েমেনের মানুষ। এখনো আশেপাশের বাজারগুলোতে খাবার জিনিস পাওয়া যায়। তবে সেগুলোর দাম এতো বেশি যে, অধিকাংশ বাবার ক্ষুধার্ত সন্তানের জন্য সেই খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। বেশ কয়েকমাস আগে আমাল হোসেন নামের একটি শিশু ক্ষুধায় কাতর হয়ে মারা যাওয়ার ছবি বিশ্ব দেখেছিল। বহু মানুষের চোখের জল এসেছে সেই ছবি দেখে। আমালের মতো বহু শিশু দুর্ভিক্ষের কবলে রয়েছে ইয়েমেনে।

ইয়েমেনের এই অবস্থাকে ভায়াবহ বলা হচ্ছে। খাদ্যাভাব যে কতটা নিদারুণ তা আমরা ভালোভাবেই জানি। এই সোনার বাংলায় একসময় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষ আজ ইতিহাস। খাদ্যাভাবে তখন প্রায় এক কোটি মানুষের প্রাণহানি হয়। যে ঘটনাকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলা হয়। এরপরেও বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়েছে যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। সেসময় প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ মারা যায়। দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনা ঘটার জন্য কেবল সাময়িক খাদ্য সংকটই দায়ী নয়। মানুষের তৈরি করা লোভ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জেরে চলা যুদ্ধ বা এরকম কোনো সংকট দীর্ঘদিন ধরে চললে দুর্ভিক্ষের মতো মারাত্মক খাদ্যাভাব দেখা দেয়। সেই চলে আসা শাসক গোষ্ঠীর লোভ আর ক্ষমতার কারণেই শতাব্দীর ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষের মুখে আজকের ইয়েমেন।

ইয়েমেনের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। অথচ বিশ্ব বিবেক আজ নিশ্চুপ। ইয়েমেনে বর্তমানে এক কোটি ত্রিশ লাখ মানুষ অনাহারের শিকার বলে সতর্কতা জানানো হয়েছে জাতিসংঘ থেকে। এছাড়াও ইয়েমেনে অন্তত ১৮ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে যেসব অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে সেসব দেশের অবস্থা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিলেই যুদ্ধের নির্মমতার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধার চিৎকার আধুনিক অস্ত্রের শব্দের কাছে বড়ই ম্লান- ইয়েমেনে এটাই আজ বাস্তবতা। ইয়েমেনের নাগরিকরা বর্তমানে কোনো ধরনের মানবিক সহায়তা ছাড়াই বসবাস করছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা মূলত মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ইউনিসেফ-এর আঞ্চলিক পরিচালক জিয়র্ট কাপপেলারি এই অবস্থাকে ‘জীবন্ত নরক’ বলে অভিহিত করেছেন। ইয়েমেনে নিয়োজিত জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী লিস গ্রান্ডে বলেছেন, ইথিওপিয়ার মতোই ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। প্রসঙ্গত, ইথিওপিয়াতেও একসময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যুদ্ধ কেবল ধ্বংস করতে পারে। পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে সব জায়গাতেই রয়েছে পীড়িত মানুষের আর্তনাদ। যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের খাদ্যের অধিকার রয়েছে। কেউ ক্ষুধার্ত থাকার কথা না। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রতিটি জীব ক্ষুধা মেটানোর অধিকার রাখে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্ষুধা পেটে নিয়েই ইয়েমেনের মানুষ প্রতিদিন ঘুমাতে যাচ্ছে। তারা এটাও জানে না যে, ভোর দেখতে পাবে কিনা?

ইয়েমেনের এই সংকট স্পষ্টতই আঞ্চলিক ক্ষমতা এবং আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। এর সঙ্গে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের এবং দেশটির আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা এবং দখলের সম্পর্কও রয়েছে। তবে সবার আগে ইয়েমেনের জনগণের স্বার্থ এবং সেদেশের বর্তমান ভয়াবহতম পরিস্থিতির দিকেই মনোনিবেশ করা উচিত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ মে ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন