ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কোথায় সেই তরুণের দল || ম্যারিনা নাসরীন

ম্যারিনা নাসরীন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-২৯ ১:১৬:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-২৯ ৪:৩০:৩৪ পিএম
ম্যারিনা নাসরীন

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’- ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তিযুগল পাণ্ডুলিপি থেকে উঠে এসেছিল তরুণদের মুখে মুখে, স্লোগানে আর দেয়ালে দেয়ালে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আমরা জানি এবং সেসব ইতিহাসে তরুণদের আত্মদানের কথাও আমাদের অজানা নয়। ঘটনাগুলো কি খুব বেশি আগের? আজ কোথায় সেই তরুণেরা? দেশ স্বাধীন হয়েছে সত্যি কিন্তু সব যুদ্ধ কি শেষ হয়ে গিয়েছে?

দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ, বেকারত্বের সাথে যুদ্ধ, মৌলবাদের সাথে যুদ্ধ বা সামাজিক অবক্ষয়, অনৈতিকতার সাথে যুদ্ধ তো চলছেই। হেলাল হাফিজের এই পঙ্‌ক্তিযুগল এখনো তরুণদের প্রিয়; শুধু সেই অনুপ্রেরণাটুকু গ্রহণ করার কেউ নেই! প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি ধর্ষণ, খুন, লুট, রাহাজানিতে কুঁকড়ে উঠছে প্রিয় স্বদেশ। আর এসবে জড়িয়ে পড়ছে এদেশের তরুণেরা। তুচ্ছ কারণে তারা একে অপরের দিকে ছুটে যাচ্ছে চাপাতি নিয়ে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাজনীতির নামে, কখনো-বা ব্যক্তিগত আক্রোশে। বলি হচ্ছে অভিজিৎ, বিশ্বজিৎ অথবা রিফাত।

অস্থির একটা সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা। শুধু খুনখারাবিতে থেমে নেই। সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ রকমের নিষ্ঠুরতা আর বীভৎসতা। সম্প্রতি দেশে যে সমস্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে কয়েকটি এত বেশি বীভৎস যে শুনলে গা শিউরে ওঠে! এই বছরের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যেই ঘটে গেছে এমন অনেকগুলো রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড। নিজের মাদ্রাসাতেই কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো ফেনীর নুসরাতকে। এর মাত্র বারোদিনের ব্যবধানে ঢাকার মুগদায় হত্যা করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গৃহবধূ হাসিকে। গেল মে মাসে নারায়ণগঞ্জে সত্তর বছরের বৃদ্ধাকে হাত-মুখ বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। একই মাসের গোড়ার দিকে কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্সকে ধর্ষণ করে দুর্ঘটনা সাজাতে হাত-পা ভেঙে হত্যা করা হয়েছে।

খুনের মিছিল যেন থামছেই না! এই ধারাবাহিকতায় ২৬ জুন সকাল সাড়ে দশটায় বরগুনা কলেজের সামনে ঘটে যায় আরেকটি নারকীয় ঘটনা। শতেক মানুষের উপস্থিতিতে খুনীরা রিফাত নামের ২২ বছরের এক যুবককে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে এবং অস্ত্রসহ বীরদর্পে এলাকা ত্যাগ করে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোক ঘটনার ভিডিও করে, ছবি তোলে। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যাচ্ছে একটি যুবককে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে যাচ্ছে দুজন যুবক। যুবকটিকে বাঁচানোর জন্য একজন তরুণী বারবার সেই অস্ত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। একজন সন্ত্রাসীকে টেনে সরিয়ে দিচ্ছে তো, আরেকজন গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে যুবকটির ওপর। কিছুতেই কিছু হয়নি। তরুণীটির চিৎকারে সাহায্যের জন্য একটি লোকও এগিয়ে আসেনি। নিহত যুবকের নাম রিফাত শরিফ। আর তরুণীটি তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। হাসপাতালে নেবার পর অধিক রক্তক্ষরণে রিফাত মারা যায়। 

বরগুনার রিফাত হত্যার ভিডিও যারা দেখেছেন আমার ধারণা, তাঁদের প্রত্যেকের চোখের সামনে আরেকটি ছবি ভেসে উঠেছিল- ছবিটি বিশ্বজিৎয়ের।  সে কি এই কারণে যে, রিফাতের বয়স, বডি ল্যাংগুয়েজ বিশ্বজিৎয়ের সঙ্গে মিলে গিয়েছে বলে? নাকি ঠিক যেভাবে তাড়িয়ে বিশ্বজিৎকে লোকসম্মুখে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সেই একই কায়দায় রিফাতকে হত্যা করা হলো বলে? বিশ্বজিৎয়ের সেই হত্যাদৃশ্য দ্বীধাহীন চিত্তে ধারণ করেছিলেন মিডিয়া কর্মীরা, সাধারণ মানুষ। রিফাতের হত্যাদৃশ্যও ধারণ করেন উপস্থিত অনেকেই। তাতে দেখা যাচ্ছে এই দুই ঘটনায় বেশ খানিকটা মিল। এমনকি শাদা শার্টে ছেপে যাওয়া ছোপ ছোপ রক্তের দাগ পর্যন্ত।  পুলিশসূত্রে জানা গেছে, রিফাতের হত্যাকারী দুজনের মধ্যে একজনের নাম নয়ন বন্ড (২৫)। অন্যজনের নাম রিফাত ফরাজী। জেমস বন্ড- ০০৭ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে তারা এই হত্যাকাণ্ডের যাবতীয় পরিকল্পনা করে। এদের সঙ্গে আরো কয়েকজন জড়িত। নয়ন বন্ড এবং রিফাত ফরাজী দুজনই অপরাধ জগতের বেশ পরিচিত মুখ বলে জানিয়েছে বরগুনা পুলিশ। অস্ত্র এবং মাদকব্যবসায়ী নয়ন বন্ডের নামে প্রায় দশটি মামলা রয়েছে থানায়। এর আগেও সে প্রতিবেশী এবং একজন কিশোরকে কুপিয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে, হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সময় এসব অপরাধীর কেউ নিজেকে লুকানোর সামান্যতম চেষ্টা করেনি। এই যে অপরাধবোধ হীনতা, এই যে প্রকাশ্যে হত্যার সাহস- সমাজ আইন রাষ্ট্রকে কি সংকেত দেয়?

আরো একটা ভাবনার বিষয় হলো, একমাত্র রিফাতের স্ত্রী ছাড়া সেখানে উপস্থিত শতেক মানুষের মধ্যে কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না। অথচ তাদের প্রায় সকলেই বয়সে তরুণ। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। হয়ত এটাই তার কারণ যে, তারা একশ হলেও প্রত্যেকে ছিল নিঃসঙ্গ এবং আলাদাভাবে একজন। কিন্তু জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করার সাহস তাদের কেন হলো না? বা একাই কেউ ঝুঁকি নিতে পারলো না কেন? কারণ মৃত্যুভয়! আমি নিজে হলে কী করতাম জানি না, তবে মানবতার জন্য আত্মবলিদান দেয়ার উদাহরণ তো বাংলায় কম নেই। সেসব দিন হয়ত অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের জোটবদ্ধতা যতটুকু না দেখা যায়, তারচেয়ে অনেক বেশি জোটবদ্ধ তারা অন্যায় কাজে। এই ঘটনাটিতে সেই বিষয়টি স্পষ্ট।

মিন্নি নামের যে মেয়েটি জীবন তুচ্ছ করে স্বামীকে বাঁচাতে চেয়েছিল, দিনশেষে তার চরিত্রকে ব্যবচ্ছেদ করতে এদেশের বিশাল সংখ্যার মানুষ দিনের অনেকটা সময় অনলাইনে ব্যয় করছে। মেয়েটি কেন হিজাব পরেনি? মেয়েটি হিজাব পরেনি সুতরাং তার চরিত্র ভালো নয়। মেয়েটির পরকীয়া প্রেমের জন্যই স্বামীকে জীবন দিতে হলো। সে কেন কাজল চোখে ইন্টারভিউ দিলো? নানা জনের নানা কথা- সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি তো রয়েছেই। কিন্তু হত্যার সঙ্গে মেয়েটির পোশাকের কি সম্পর্ক? মানলাম, এই হত্যাকাণ্ড ত্রিভুজ প্রেমের ফল। বা হত্যাকারী মেয়েটির সাবেক স্বামী বা প্রেমিক ছিল। নানা কারণে প্রেম বা বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে যেতেই পারে, পারে না? তাই বলে সাবেক স্বামী বর্তমান স্বামীকে হত্যা করবে? এই চিন্তাটাই বা মাথায় কেন আসবে?

ট্রয় নগরী ছিল কি ছিল না, হেলেন মানবী ছিলেন নাকি দেবী ছিলেন- সে সম্পর্কে ব্যাপক সন্দেহের অবকাশ থেকে গেলেও নারী সংক্রান্ত কোনো ইস্যু এলেই এদেশের নারীদের শুনতে হয়, ‘গ্রীসের ট্রয় নগরী পর্যন্ত ধ্বংস হয়েছিল হেলেনের জন্য। তোমরা নারীরাই সকল ধ্বংসের মূল।’ রিফাত হত্যার পর এই বিষয়টি পুনরায় সামনে এলো। রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো হেলেনের জায়গায়। তার পোশাক, চরিত্র নিয়ে চলছে নির্মম ব্যবচ্ছেদ। এমনকি এদেশের একজন মাননীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পরোক্ষভাবে মিন্নির প্রেমকেই দায়ী করেছেন। কি অদ্ভুত জাতি আমরা!

এই যে সমাজে এত এত খুন, ধর্ষণ সেসব দেখেও মানুষের নির্বিকার অবস্থান। ক্ষয়ে ক্ষয়ে নুয়ে এসেছে যেন এমন একটা জাতি। এসবের পেছনে কারণ কী? বিচারহীনতা? নাকি সামষ্টিক মূল্যবোধের অবক্ষয়? কেন আজকের তরুণসমাজ সামাজিক আন্দোলনগুলোতে তেমন একটা সম্পৃক্ত হতে পারছে না? বেকারত্ব বা হতাশা? এজন্য কে দায়ী রাষ্ট্র, সমাজ নাকি পরিবার? অনেক অনেক প্রশ্ন। কারণ যাই হোক, এই অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে অচিরেই এই জাতি পঙ্কিলতার গভীরে নিমজ্জিত হবে। কথা হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? রাষ্ট্র বা আইন আমাদের রক্ষা করবে? রাষ্ট্র আমাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হয়ত কিছুটা দিতে পারছে কিন্তু জীবনের নিরাপত্তা কি দিতে পারছে? মানুষ যদি বাঁচার অধিকার না পায় বাকী আর সব অধিকারের মূল্যই বা কতটুকু? 

আমি আগের একটি লেখায় বলেছিলাম, আমাদের বাবা-মায়েরা একসময় বুঝতে শেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের হাতে ‘আদর্শলিপি’ তুলে দিতেন। ‘সদা সত্য কথা বলিবে, কদাপি মিথ্যা বলিবে না’, ‘জীবে দয়া কর’, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’। তখন মানুষ শিশু বয়স থেকেই এসব নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বড় হতো। বর্তমানে শিশুরা অক্ষরজ্ঞানের আগেই মোবাইল ফোনের নাড়ি নক্ষত্র জেনে ফেলে। সেন্ড বাটন, লগ-ইন বাটন চিনে নেয়। টিভির সিরিয়াল থেকে কার্টুন থেকে অথবা পারিপার্শ্বিকতা থেকে জেনে যায় মায়ের সঙ্গে কীভাবে মিথ্যা কথা বলতে হবে। সেটি হয় অপরাধের হাতে খড়ি। কিন্তু মানবজীবনের কোনটি মানবিক আর কোনটি অমানবিক সেটি সম্পর্কে তারা ধারণা পায় না। পরিবার থেকে যারা নৈতিক শিক্ষা পায় না, তারাই পরবর্তীকালে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই আমাদের পরিবার থেকেই প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলেই তৈরি হবে একটি আদর্শ তরুণসমাজ। 

কথায় কথায় আমরা সিভিলাইজেশনের কথা বলি। যথেষ্ট সভ্য হয়েছি বলে বড়াই করি। সভ্যতার চাকা ঘুরতে ঘুরতে আমরা একবিংশ শতাব্দীর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাচ্ছি কিন্তু আদৌ কি সভ্য হয়েছি? প্রতিনিয়ত কম্পিউটার আপডেটের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আমরা প্রযুক্তিগতভাবে আপডেট হচ্ছি কিন্তু নৈতিকতার দিকে আমাদের চারিত্রিক আপডেট কি আদৌ হয়েছে? কথা যা ভালো, তার সবকিছু মুহূর্তে মুহূর্তে অতীত হয়ে যাচ্ছে। তাইতো আজ আমরা ভিডিওতে বিশ্বজিৎ বা রিফাতের হত্যাদৃশ্য দেখে খুব স্বাভাবিকভাবেই হাত ধুয়ে ভাত খেতে বসি, খেলা দেখি, আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠি। কারণ রিফাত বা বিশ্বজিৎ আমাদের কেউ নয়। কিন্তু ভাবুন তো, এই ঘটনাটি যখন আমাদের সঙ্গে ঘটবে তখন?

লেখক : গল্পকার, প্রভাষক, ময়মনসিংহ কলেজ

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ জুন ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন