ঢাকা, সোমবার, ৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গুজব, সন্দেহ এবং সাম্প্রতিক নৃশংসতা

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-২২ ৫:২৭:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-২২ ৮:২৪:৫১ পিএম
গুজব, সন্দেহ এবং সাম্প্রতিক নৃশংসতা
Walton E-plaza

অলোক আচার্য: বর্তমানে আমাদের দেশে গুজব শব্দটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। নানা ধরনের গুজব বাতাসে ভেসে বেড়ায়। যা রীতিমতো বিশ্বাস করাও কষ্টকর সেই গুজবে নানা হিংস্র কর্মকাণ্ড ঘটছে। মানুষের প্রাণ যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। সেসব গুজবে কান দিয়ে মানুষ ও দেশের ক্ষতি হচ্ছে। গুজব বলতে সাধারণত বোঝায় কোনো ব্যক্তি, কোনো গোষ্ঠি বা কোনো দলের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যমূলক কোনো অপপ্রচার যার পেছনে বেশিরভাগ সময়ই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। কোনো অসত্য তথ্য বা প্রচার যা কারো ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়ও বিঘ্ন হতে পারে। আমরা খুব সহজেই গুজবে কান দেই। আমাদের শিক্ষা দীক্ষার কোনোকিছুর প্রয়োগ না করেই বিশ্বাস করে নিচ্ছি। কোনোকিছু শুনলেই বিশ্বাস করতে হবে? যেখানে চোখে দেখেও আজকাল বিশ্বাস করাটা বেশ কষ্টকর। সেখানে কারো কাছ থেকে কিছু শুনেই সেটা বিশ্বাস করা এবং তা নিজের মতো প্রচারের কাজে লেগে পরা! চিলে কান নিয়েছে শুনে কান উদ্ধারের জন্য সবাই চিলের পেছনে ছুটি। একবারো নিজের কানে হাত দিয়ে পরীক্ষা করার কথা মনে করি না। আমরা এতটাই নিষ্ঠুর যে কে সত্যিকার অর্থে ছেলেধরা তা বিচার বিবেচনা না করেই পিটিয়ে মেরে ফেলি! নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মেয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে দেখেছি। এছাড়াও একজন মহিলাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে কেবল সন্দেহের বশে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে আধমরা করা হয়েছে অনেককে। কেবল সন্দেহ করেই কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলছি আমরা! গণপিটুনিতে আহত হওয়ার ঘটনা দেশে বেশ কয়েক স্থানে ঘটেছে। কি আশ্চর্য! আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার গুজবে কান দিতে নিষেধ করলেও আমরা তা শুনছি না। কেউ অপরাধী হলে তার জন্য আইন আছে। আমরা পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারি। আইনের হাতে তুলে দেয়ার বদলে পিটিয়ে মেরে ফেলা কোনো সভ্য জাতির কাজ হতে পারে না। যদি জানা যায় সে নির্দোষ তবে তাকে কি আর ফিরিয়ে দেয়া যাবে? এটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় ছাড়া আর কিছু না। আমাদের কান গুজবের জন্য খোলা! কাউকে হেয় করার বা কোন হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। আজকাল গুজব ছড়াতে ডিজিটাল মাধ্যমই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় গুজব ছড়াতে। কারণ এসব মাধ্যমে কোনো অসত্য তথ্য প্রচার করা দ্রুততর এবং তুলনামূলক গুজব সৃষ্টিকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাময়িক নিরাপদে অবস্থান করতে পারে। গুজবের ক্ষেত্র আজকাল বিস্তৃত হয়েছে। রাজনীতি, ধর্মীয়, সামাজিক বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে গুজব ছড়ানো হয়। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য থাকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির বিরুদ্ধে অপপ্রচার কাজে লাগিয়ে হীন স্বার্থ উদ্ধার করা। গুজব ক্ষেত্রবিশেষে অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হতে পারে।

গুজবে প্রভাবিত হয়ে অনেক সময় নিরীহ মানুষও প্রভাবিত হয় এবং নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ে। আজকাল অনলাইনের যুগে গুজব সৃষ্টি করাটা বেশ সহজ হয়ে গেছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইট খুলে এসব ভুল তথ্য প্রচার করছে। একসময় দেখা যেত সুদূর গ্রামে গঞ্জে কোনো ভণ্ড কবিরাজ মিথ্যা রোগ-শোকের ভয় দেখিয়ে কোনো গুজব সৃষ্টি করতো। সেসময় মানুষ ছিল অশিক্ষিত। ফলে খুব সহজেই এসব গুজবে কান দিতো। এর প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল নিরীহ গ্রামবাসীকে ভয় দেখিয়ে পকেট ভর্তি করা। এছাড়া ওঝা, ভণ্ড পীর বা সন্ন্যাসী এসব গুজব কাজে লাগিয়ে মানুষের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। এসব পকেট ভারী করা মানুষ আগে যেমন ছিল, এখনো আছে। আজও আমাদের রাস্তা ঘাটে এসব টোটকা ওষুধের তথাকথিত গাছ গাছড়ার চিকিৎসা দেখা যায়। তাদের চারপাশের ভিড় করা মানুষগুলো নিমগ্ন চিত্তে তার কথা শোনে। এরা এমনভাবে রোগের বর্ণনা করে যে সে বিশ্বাস করে ফেলে। গুজব কেবল এসব ভণ্ড অপচিকিৎসকদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রবেশ ঘটেছে রাজনীতিতে নোংরা খেলায়। কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বিপদে ফেলতে গুজব ছড়ানোর নজির আামদের দেশে রয়েছে। এখন এটা হরহামেশাই ঘটছে। গুজব প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কাজও করে যাচ্ছে।   গুজবের প্রধান টার্গেট থাকে জনগণের সরলতাকে কাজে লাগানো। কোনো ষড়যন্ত্র যখন ব্যর্থ হয় তখন গুজব ছড়ানো হয়। আমাদের এই ভারতবর্ষেই গুজব ছড়ানোর অনেক ইতিহাস রয়েছে। সিপাহী বিদ্রোহের সময়কালে কার্তুজে গরু এবং শুকরের চর্বি ব্যবহারের গুজব তুলে হিন্দু এবং মুসলিম সৈনিকদের উত্তেজিত করে তুলেছিল। এরকমভাবে বহুবার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গুজবকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়ছে। বিভিন্ন সময় গুজবকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিলও করেছে গুজব সৃষ্টিকারীরা। চিলের কান নেয়ার কবিতাটা আমরা প্রায় সবাই জানি। কানের খোঁজে সেই যে ছুট দিল চিলের পেছনে কিন্তু সেই চিলটাকে আর ধরতে পারলো না। গুজব এরকমই হয়। কোনো গুজবে কান দিয়ে ছুটলে কেবল গুজবসৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্যই হাসিল হয়, কাজের কাজ কিছু হয় না। আমাদের অদৃশ্য কান মাঝে মধ্যেই চিল নিয়ে ছুট দেয়, আর আমরাও সেই চিলটার পেছনে ছুটতে থাকি। ছুটতে ছুটতে একসময় কানে হাত দিয়ে নিশ্চিত হই যে কান সাথেই আছে। সম্ভব-অসম্ভব, সত্য-মিথ্যা কোনো বিচার বিবেচনা না করেই গুজবের পেছনে ছোটা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। গুজব আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তি।

কীভাবে আমরা এই গুজবের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি নিজেকে? কোনো গুজব বিশ্বাস করার আগে প্রত্যেকের উচিত সেই ছড়ানো বিভ্রান্তি একবার হলেও ভালোভাবে যাচাই করে নেয়া। কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে। তারপর ঘটার সম্ভাবনা থাকলে ঘটনার পেছনে ছুটতে হবে। তবে অধিকাংশ গুজবই মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। যার পেছনে ছোটা কেবল সময়ের অপচয়ই নয় বরং থাকে জীবনের ঝুঁকি। আজকাল ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব সৃষ্টি হচ্ছে খুব বেশি। যেহেতু আমাদের সবার হাতে হাতে এন্ড্রয়েট চালিত মোবাইল ফোন রয়েছে এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট রয়েছে তাই কোনো মিথ্যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য ছড়িয়ে দিতে বেশি সময় প্রয়োজন হয় না। খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। তাই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া একটু সময়ের ব্যাপার। ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব সৃষ্টিকারীরা প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ হয়। তবে এ ধরনের গুজব প্রতিরোধে কতৃপক্ষ এখন আগের চেয়ে অনেক সজাগ রয়েছে। গুজব সৃষ্টিকারীরা কোনোভাবেই যেন বিভ্রান্তি না ছড়ায় সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নিজেদেরও কিছু দায়িত্ব থাকে। কোনো অদৃশ্য কানের পেছনে ছোটার আগেই যদি নিজের কানটা একবার দেখে নেয়া যায় তাহলে গুজবের পেছনে ছোটা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়, কোনো দুর্ঘটনা বা কিছু নিরীহ প্রাণ অযথাই ঝরে যাওয়া থেকে রক্ষা পায় কেবল একটু সচেতনতায়।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ জুলাই ২০১৯/শান্ত

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge