ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

তিতাসের মৃত্যুর দায় কার?

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-০৩ ১১:০৯:২৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-০৪ ৯:৫৯:৫১ পিএম

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : নড়াইলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষের পুরো জীবনটাই পড়ে ছিল। সে মাত্র ১২/১৩ বছরের ছিল। কিন্তু পৃথিবীর আর কোনো রূপ, রস, গন্ধ তাকে স্পর্শ করবে না। আড়োলিত হবে না ভালোবাসার আহ্বানে বা ভৎসনায় ব্যথিত হবে না। পদ্মা নদীর মাঝখানে প্রবল স্রোতের উপর ভাসতে ভাসতে তাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে। তার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রস্তুত রাখা অপারেশন টেবিল কাজে লাগল না। পদ্মা পার হয়ে ফেরি যখন মাওয়া ঘাটে পৌঁছাল, তথন তিতাসের নিথর দেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ফিরতি ফেরিতে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছে।

তিতাস মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ছিল, সন্দেহ নেই। ঠিক সমযে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে অপারেশন টেবিলে অথবা এর আগে বা পরেও মারা যেতে পারতো, এটাও ঠিক। তবে মারা যেতে পারতো বলে ফেরি আটকে রেখে মাঝ নদীতে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর মৃত্যু নিশ্চিত করার ক্ষমতা কাউকে দেয়া হয়নি। সেটা হতো মৃত্যু, এখন এটা হত্যা। তাকে তার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

তিতাসের মৃত্যুর ঘটনা তার পরিবারের মধ্যেই থেকে যেত, যদি তার এক আত্মীয় একদিন পর ফেসবুকে এই কষ্টকর অভিজ্ঞতা না লিখতেন। আরো বহু ঘটনার মতো এটিও আড়ালে থেকে যেত, যদি সংবাদ মাধ্যমে লেখালেখি না হতো। ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এরপর সরকারের নজরে আসে। প্রকৃত ঘটনা কী, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, কারো অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে।

‘তদন্ত কমিটি’ বিষয়টি মানুষের কাছে বহুল পরিচিত এবং বিরক্তের বিষয়। সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ন্যায্যতা নয়। প্রকৃত ঘটনা জানতে তদন্ত অপরিহার্য। কিন্তু দেশের মানুষ তদন্ত কমিটি গঠন পর্যন্ত জানতে পারে। তদন্ত রিপোর্ট এবং কী ব্যবস্থা নেয়া হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যায়। মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা। আমরা শুধু শাস্তি নয়, পাশাপাশি এমন পদক্ষেপ চাই, যাতে আর কোনো তিতাসের এভাবে মরতে না হয়।

তিতাসের পরিবার জানিয়েছে, বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সে তিতাসকে নিয়ে তারা ৮টার আগে কাঁঠাল বাড়ি ফেরিঘাটে পৌঁছান। তথন ঘাটে একটি ফেরি ছিল। ফেরি ছাড়ে রাত প্রায় ১১টায়, একজন যুগ্ম সচিবের গাড়ি ফেরিতে উঠার পর। আর মাঝ নদীতে তিতাসের মৃত্যু হয়। আমজনতার জীবনের চেয়ে যুগ্ম সচিবের সময়ের দাম বেশি ছিল ফেরি কর্তৃপক্ষের কাছে। এ ক্ষেত্রে আমি বলব, তিতাসের পরিবার কিছুটা হলেও সৌভাগ্যবান, কেননা যুগ্ম সচিব মহোদয় ১১টার এসে পৌঁছেছেন। উনি আরো ২/৩ ঘণ্টা পরেও আসতে পারতেন। তাহলে আমাদের মতো জনতার কী করার থাকতো। আমরা পাবলিকরা যা করতে পারি, তাহলো দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করতে। তিতাসের পরিবারও সেটা করেছিল। দায়িত্বরত পুলিশ, ঘাট কর্তৃপক্ষ, এমনকি ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে অনুরোধ করেন ফেরি ছাড়তে, কিন্তু তারা যুগ্ম সচিব না আসা পর্যন্ত ছাড়তে রাজি হননি।

একজন সরকারি কমচারীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য যে  সিস্টেম তিতাসকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে, সেই সিস্টেম বদলানো। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যারা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকেন, তাদের সময় খুব মূল্যবান। তারা ক্ষেত্র বিশেষে সময় বাঁচানোর জন্য বা নিরাপত্তার প্রশ্নে কিছুটা সুবিধা নিতে পারেন। কিন্তু একজন গুরুতর অসুস্থ মানুষকে পথে ৩ ঘণ্টা আটকে রাখতে পারেন না। তিন ঘণ্টা ফেরি আটকে থাকলে কত শত গাড়ির লাইন পড়ে যায়, সেটা ভাবতে হবে। এই গাড়িতে নারী-শিশুদের দুর্ভোগ, শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে।

একবার ভেবে দেখুন- ঘাটে আটকে থাকা প্রতিটি মুহূর্ত তিতাসের বাবা, মার কীভাবে কেটেছে। প্রাণপ্রিয় সন্তানের দিকে তাকিয়ে কতবার দুঃস্বপ্ন তাদের তাড়া করেছে। যুগ্ম সচিব মহোদয়কে বলব, নিজের সন্তানকে তিতাসের জায়গায় রেখে একবার ভেবে দেখুন কেমন অনুভূতি হয়। যেটা তিতাসের বাবা, মাকে পোহাতে হয়েছে।

রাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজনে কিছুটা বাড়তি সুবিধা নিতে পারেন কারা, অর্থাৎ এই ভিআইপি কারা? একজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মচারী এই সুবিধা পান কি না, যদি পান; দেশে ভিআইপি কত জন? যুগ্ম সচিব থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যায়ের বেসামরিক, সামরিক, জুডিশিয়ারির কয়েক হাজার কর্মকর্তা, আইনসভার সদস্যরা, উপমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত এবং রাষ্ট্রপতি; সব মিলিয়ে আট/দশ হাজার ব্যক্তি হবেন। সবাই যদি রাস্তা বা ফেরি আটকে রাখেন, তাহলে অবস্থা কি হবে, অন্তত আমি আন্দাজ করতে পারি না।

একজন যুগ্ম সচিব যদি ভিআইপি মর্যাদা পানও, তবুও তার জন্য ৩ ঘণ্টা ফেরি আটকে থাকা অন্যায়। সেটা ক্ষমতার অপব্যবহার। এটা জনগণকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। অবশ্য এটা শুধু তিনি নন, এটা কালচার হয়ে গেছে। দাযিত্বশীল ব্যক্তিরা অহরহ এ কাজটি করেন। একবারও ভাবেন না, তিনি ঠিক করছেন কি না। জনগণ ভোগান্তিতে পড়ছে কি না। এই কালচারের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

যেহেতু বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ঘটনা তদন্ত করতে। এখন আমরা আশাবাদী, প্রকৃত ঘটনা জাতি জানতে পারবে এবং যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত হবে।

আমরা চাই, দায়িত্বশীলদের এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অতি-উৎসাহী সিদ্ধান্তের খেসারতে জনগণকে জীবন দিতে না হয়। জনগণের সেবকদের কাছে জনগণ এমন দায়িত্ব প্রত্যাশা করে, যাতে তাদের ভোগান্তি লাঘব হয়। ভিআইপি কালচারের বিষয় ভেবে দেখার সময় এসেছে। অন্তত হাজার হাজার ব্যক্তিকে ভিআইপি মর্যাদা না দিয়ে রাষ্ট্রের অতি-গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ আগস্ট ২০১৯/বকুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন