ঢাকা, শনিবার, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৬ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মানুষের লোভের আগুনে পুড়ছে পৃথিবীর ফুসফুস

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-৩১ ২:৩৮:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-৩১ ৪:০৩:১৯ পিএম
আমাজনের আগুনের কারণে তৈরি হওয়া ধোঁয়া সুদূর আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে

অলোক আচার্য : ভয়ঙ্কর আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলছে পৃথিবীর বৃহত্তম চিরহরিৎ বনাঞ্চল ও পৃথিবীর ফুসফুস নামে পরিচিত সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমাজন। এই বন সম্পর্কে একসময় বলা হতো- কখনো ধ্বংস হবে না। বই, পত্রিকার পাতায় আমাজন নিয়ে বহু লেখা আমরা পড়েছি। বহু কল্পকাহিনী, সিনেমা এই বন ঘিরে তৈরি হয়েছে। তবে মানুষের ক্রমবিকশিত সভ্যতার কার্যকলাপে পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজনও আজ সংকুচিত। কারণ আমাজন দাউ দাউ করে জ্বলছে। এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ব্যক্তি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। এই লেখা যখন লিখছি ততদিনে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু আমাজনের পাশাপাশি আফ্রিকার ১০ লাখ বর্গমাইলের বেশি বনাঞ্চলও আগুনে জ্বলছে। মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার উপগ্রহের ছবিতে এমনটাই দেখা গেছে। গ্যাবন থেকে অ্যাঙ্গোলা পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যাঞ্চলে কঙ্গো অববাহিকার যে বনাঞ্চল পুড়ছে তাকে পৃথিবীর দ্বিতীয় সবুজ ফুসফুস ডাকা হয়। যদিও কঙ্গো অববাহিকার যে অংশে আগুন লেগেছে সেটি বনের সংবেদনশীল এলাকার বাইরে বলে নাসার ছবিতে দেখা যাচ্ছে। মানুষের লোভের ভয়াল থাবায় সাম্প্রতিক সময়ে এই মহাবন সংকুচিত হতে শুরু করেছে। গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে আমাজনে এখন অবৈধ উপায়ে নজিরবিহীনভাবে সোনার খনির খোঁজ করছে স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। হাজার হাজার অবৈধ খনির সন্ধানকারীরা সেখানে জীববৈচিত্রের তোয়াক্কা না করে খননকাজ পরিচালনা করছে। ফলে প্রতিদিনই আমাজনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। সাধারণ সৌন্দর্য হারাচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্যের ধারক আমাজন। বলা হয়, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বরসোনারা সরকারের সঙ্গে মিত্রতা রয়েছে এসব শিল্পকারখানা এবং খনির অনুসন্ধানকারীদের। এটি উন্নয়নের একটি রাস্তা হলেও প্রকৃতি যে নিজেই প্রতিশোধ নিতে পারে, তার প্রমাণ আজকের আমাজনের আগুন। এই আগুন নেভাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে!

বন সাবাড় হচ্ছে এবং নদীর তীর উপচে পড়ছে বাদামি রঙের কাদার স্তূপে। প্রতিবছর এখানে অন্তত ৩০ টন স্বর্ণ অবৈধভাবে কেনাবেচা হয়। এ পেশার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যারা অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের লোলুপ দৃষ্টির কারণে প্রতি মিনিটে জ্বলছে বনের প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দায়ি করা হচ্ছে স্থানীয় পশুপালক ও কৃষকদের। পরিবেশবাদীরা বলছেন, আমাজনকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করার জন্য ব্রাজিল সরকারি নীতির কারণেই আগুন লাগানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। কারণ যাই হোক, এই ঘটনায় শেষ ক্ষতিটা মানুষের। ফলে নড়েচড়ে বসেছে বিশ্ব পরিবেশ সংস্থাগুলো। তারা আমাজনের এই ভয়ঙ্কর দাবানলের পেছনের কারণ খুঁজতে শুরু করেছে। বহু যুক্তি তর্ক সামনে চলে এসেছে। সাধারণত দেখা যায় তীব্র খরার কারণে বনাঞ্চলে দাবানলের সৃষ্টি হয়। সেক্ষেত্রে আমাজনে এমন পরিস্থিতি এবছর তৈরি  হয়েছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে আইএনপিই গবেষকরা বলছেন, এ বছর আমাজনের জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নিয়ে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।

এই বক্তব্যের পর আমাজনের এই আগুন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, না মানুষের পরিকল্পিত অথবা কোনো দুর্ঘটনা তা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি রাখে। মানুষ প্রকৃতিকে বশ মানিয়েছে। তবে মানুষের প্রতিনিয়ত অত্যাচারে প্রকৃতিও আজ অসহায়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মাঝেমধ্যেই প্রকৃতির ধ্বংসলীলা চলে। এই ধ্বংসলীলার জন্য আজ পৃথিবীতে বহু মানুষ গৃহহীন। বহু প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। একথা সবাই জানে, বৈচিত্র্য সম্ভারে আমাজনের দ্বিতীয়টি আর নেই। অথচ সেই বনও আজ পুড়ছে আগুনে। সরকার দায় নিচ্ছে না। পরিবেশবাদীদের সঙ্গে তাদের অভিযোগও মিলছে না। তবে একথা ঠিক, আমাজনের এই আগুনের জন্য বনে কৃষি সম্প্রসারণ, বৈধ ও অবৈধ খনি এবং সরকারি নীতি মূলত দায়ী। আমাজন ওয়াচের এক বিবৃতিতে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর একটি খবরের দিকে আলোকপাত করা হয়। ওই খবরে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর নীতিতে উৎসাহিত হয়ে কৃষি জমির জন্য বনাঞ্চল পোড়াতে সমন্বিতভাবে আগুন দিবস পালন করেছে সেখানকার মানুষ। ছয়টি দেশে বিস্তৃত আমাজনের ২৪৫টি এলাকায় ২৩১২টি অবৈধ খনি রয়েছে বলে জানিয়েছে আমাজন সোশিও এনভায়রনমেন্ট। এসব কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আমাজনের আজকের এই পরিণতির জন্য মানুষের লোভ এবং লাভের হিসাবই সবচেয়ে বেশি দায়ী।

আমাজনে আগুনের এবারের ব্যাপকতা এত বেশি যে, গত এক দশকেও এমন মাত্রায় সেখানে দাবানল সৃষ্টি হয়নি। আগেই বলেছি আবহাওয়ার শুষ্কতা দাবানলের একটি কারণ। ফলে সেখানে বছরজুড়ে ছোটখাটো দাবানল সাধারণ ঘটনা। ব্রাজিলের স্পেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলে আমাজনের উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে চলতি বছর রেকর্ডসংখ্যক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির সরকারি হিসাব মতে,  চলতি বছর প্রথম আট মাসে ব্রাজিলের জঙ্গলে ৭৫ হাজারেরও বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। তবে এর মাত্রা এবারই এতো ভয়াবহ! আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। নতুন নতুন এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পরলেও সার্বিক প্রচেষ্টায় এর ভয়াবহতা কমতে শুরু করেছে। একসময় নিয়ন্ত্রনেও আসবে। কিন্তু যে বিশাল এলাকা আগুনে পুড়ে ছাই হলো সেই এলাকাগুলোতে পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে আনা আদৌ সম্ভব হবে কি? নাকি সেখানে বসতি গড়ে উঠবে বা কৃষি কাজ করা হবে বা অন্য কিছুর জন্য বেছে নেয়া হবে সেই অঞ্চল? এত বিশাল এলাকা পুড়ে যাওয়ার কারণে প্রাথমিকভাবে ঐ এলাকার সামগ্রিক পরিবেশের ওপর চাপ পরবে। বহু প্রাণী বনের পুড়ে যাওয়া অংশের ওপর নির্ভর ছিল। সদ্য সমাপ্ত হওয়া জি-৭ সম্মেলন থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য অর্থসাহায্য ঘোষণা করলে প্রথমে তা নিতে অস্বীকার করে ব্রাজিল। পরে অবশ্য সেই সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরে আসে। যে গাছপালা কমে যাওয়ার জন্য আমাদের জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়ত আমাজনে আগুনে সেই গাছ পুড়ে ছাই হচ্ছে।

এমনিতেই পৃথিবীতে উন্নয়নের কারণে বনাঞ্চল দ্রুত কমছে। এই সুন্দর পৃথিবীর এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। অথচ এই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল একসময় সুশীতল, বিষমুক্ত ছিল। সেই আগের মতো বায়ুমণ্ডল পেতে হলে ন্যূনতম এক লাখ কোটি গাছ রোপণ করতে হবে। তাহলে বায়ুমণ্ডল হবে শত বছর আগের মতো। এমনটাই জানিয়েছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ইটিএইচ জুরিখ) একটি গবেষণা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্স-এ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র গাছ লাগালেই আসন্ন সংকট থেকে সমাধান সম্ভব। মানুষের লোভের পরিণতিতে অথবা প্রাকৃতিক কারণেই হোক আমাজনের এই ক্ষত মানুষের জন্য শুভ নয়। প্রতিটি বনাঞ্চল রক্ষা করার দায়িত্ব মানুষের। যে উন্নয়নের নামে বনাঞ্চল ধ্বংস করে সম্পদের পাহাড় গড়ছি সেই সম্পদ একদিন মানুষের কাঁধেই বোঝা হয়ে সভ্যতা ধ্বংসের কারণ হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ আগস্ট ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন