ঢাকা, রবিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হংকংয়ে বিক্ষোভ, ভবিষ্যত কোন দিকে?

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-০৮ ৪:৩৩:৩৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-০৮ ৪:৪৩:৩৩ পিএম
হংকংয়ে বিক্ষোভ, ভবিষ্যত কোন দিকে?

মাছুম বিল্লাহ : যুক্তরাজ্য ১৯৯৭ সালে হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করে। বর্তমানে সেখানে আধা-স্বায়ত্বশাসিত শাসনব্যবস্থা চালু আছে। শুরুতে প্রত্যার্পণ বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলেও এখন সেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। এদিকে চলমান সংকটে চীন সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হংকং সীমান্তের নিকটবর্তী শেনঝেনের স্টেডিয়ামের মুখ বন্ধ রেখে কয়েক হাজার সেনার মহড়া চলছে সেখানে। স্টেডিয়ামের আশপাশে সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর গাড়ি মজুদ রয়েছে। সেখানে সশস্ত্র সেনা বহনকারী গাড়ি, বাস, জিপ ও জলকামানও আছে। ভয়েস অব আমেরিকায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেন, সাবধানে পা ফেলুন কারণ তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের কথা আমেরিকার মনে আছে। ১৯৮৯ সালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে চীনা সেনাবাহিনীর হামলা করার মতো কাজ আবারও করলে ‘বড় ভুল হবে’ চীনের। ট্রাম্প চীনকে বলেন, হংকং সংকট মানবিকভাবে সমাধান করতে হবে।

বিক্ষোভকারীদের দমনে হংকংয়ে চীনের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আরো জোরদার হয়ে উঠেছে। হংকং সীমান্ত থেকে মাত্র সাড়ে চার কিলোমিটার দূরের শেনঝেন স্টেডিয়ামে সাঁজোয়া যান প্রস্তত রেখেছে চীনা সেনাবাহিনী। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত এক পোস্টে চীনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, সীমান্তের অদূরবর্তী সৈন্য মোতায়েনের স্থান থেকে হংকংয়ের মূল শহরে হামলা চালাতে তাদের সময় লাগবে মাত্র দশ মিনিট। এদিকে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীরা এক বড় ধরনের সমাবেশের আয়োজন করেছে। তাদের দাবি, এ আন্দোলন সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও অহিংস। তবে, এর মধ্যে হংকং বিমানবন্দরে সংঘটিত এক অবস্থান ধর্মঘট শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় মোড় নেয়। বিক্ষোভকারীদের প্রতি হংকংয়ের স্থানীয় জনগণের সমর্থনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেই বড় আর একটি সমাবেশের ডাক দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। শেনঝেন স্টেডিয়ামে ক্যামোফ্লেজ পোশাক পরা চীনা সৈন্যদের কুচকাওয়াজেও বিষয়টিকে হামলা-পূর্ববতী মহড়া হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তবে, চীনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনও না আসায় শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের মত ঘটনার দিকে মোড় নাও নিতে পারে বলে কেউ কেউ প্রত্যাশা করছেন। তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে চীনা সৈন্যদের হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছিল, যার সংখ্যা আজও জানা যায়নি। ঐ ঘটনা চীনের গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। জনসাধারণের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলায়ও রয়েছে এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা, এক ধরনের ভয়।  তবে, এটি ছিল চরম মানবাধিকার লংঘন। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে চীন আবারও কি সেই একই ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছে হংকংয়ে? চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে অবশ্য বলা হয়, হংকংয়ের ক্ষেত্রে ১৯৮৯ সালের ৪ জুনের রাজনৈতিক ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি হবে না। কারণ চীন এখন আরো কার্যকর পন্থা অবলম্বনে সক্ষম। প্রশ্ন হচ্ছে সেটি কী? সেটি কি তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের চেয়েও ভয়াবহ?

প্রস্তাবিত প্রত্যার্পণ বিল নিয়ে হংকংয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিতর্কিত এ বিল নিয়ে স্মরণকালের প্রতিবাদের মুখে পড়েছে হংকং সরকার। হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শান্তিপূর্ন আন্দোলন করার পর গত ১৩ আগস্ট সেখানে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ হয়। বিতর্কিত ওই বিলে বলা হয়, ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত হংকংয়ের যে কোন বাসিন্দাকে তাইওয়ান, ম্যাকাউ বা চীনের মূল ভূ-খণ্ডে পাঠানো যাবে। তবে বহিঃসমর্পণের ক্ষেত্রে হংকংয়ের আদালতে অনুমতি নিতে হবে। বেইজিংপন্থী হংকং সরকারের দাবি বহিঃসমর্পণের সুযোগ না থাকায় চীনের অন্যান্য অংশের অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে হংকং। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী রাজনীতিকদের ওপর দমন পীড়ন চালাতে চীন ওই বিলকে কাজে লাগাতে পারে। পরে ওই বিল স্থগিত ঘোষণা করা হলেও আন্দোলন এখনও থামেনি।

হংকংয়ের সীমান্তজুড়ে ১৫ আগস্ট মহড়া শুরু করেছে চীনের আধা সমারিক বাহিনী। আশঙ্কা করা হচ্ছে এশিয়ার এই ব্যবসাকেন্দ্রিক শহরটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ দমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। সীমান্তে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সমাবেশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ। হংকংয়ের বিক্ষোভকে সন্ত্রাসবাদের কাছাকাছি বলছে চীন। ১৩ আগস্ট বিমানবন্দরে সরকারের সমর্থক সন্দেহে দুইজন নাগরিকের ওপর চড়াও হয় বিক্ষোভকারীরা। তারপর ১৪ আগস্ট ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ পর্যন্ত ৭৪৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে ৭৬বার হংকংয়ে থানা ঘেরাও ও হামলার  ঘটনা ঘটেছে। তাই, আন্দোলন সামাল দেয়ার ব্যাপারে কঠোর হচ্ছে পুলিশ।

আন্দোলনকারীদের বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে চীন। ওদিকে হংকংয়ে বিক্ষোভ সামাল দিতে চীনকে মানবিক হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে চীনের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করেছে দেশটি। ডোনাল্ড ট্রাম্প হংকং নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নাগরিকদের হংকং ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফ্রান্স আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করতে বলেছে চীনকে। কানাডা বলেছে চীনকে কৌশলী হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে। জাতিসংঘ হংকং কর্তৃপক্ষকে সংযত থাকার আহবান জানিয়েছে।

১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে চীনের অধিকারে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত  সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিক্ষোভকে। চীনের মূল ভূখণ্ডে বন্দি হস্তান্তর বিলের প্রস্তাব আনার পর থেকে এ বিক্ষোভের শুরু। গত এপ্রিলে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে কয়েখ লাখ মানুষ। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে জানতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: শিক্ষা গবেষক ও বিশেষজ্ঞ


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন