ঢাকা, বুধবার, ৭ কার্তিক ১৪২৬, ২৩ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মধ্যপ্রাচ্য সংকট, যুদ্ধ কি আসন্ন?

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১৯ ৩:০১:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-০৮ ২:১০:৪৭ পিএম

সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এখন বেশ উত্তপ্ত। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে বৈশ্বিক রাজনীতিও মুখোমুখি অবস্থানে। তেলক্ষেত্রে হামলার পর যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। সৌদি আরবে এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হচ্ছে। যদিও এর পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো মেলেনি। আবার ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা হামলার পরপরই দায় স্বীকার করেছে। তারপরও ইরানের দিক থেকে সন্দেহের তীর সরছে না। তেল স্থাপনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেশ করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী দেশ হলো সৌদি আরব ও ইরান। ক্ষমতার দিক থেকে দুই দেশের দ্বন্দ্ব বহুদিনের। প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি বা মোড়লীপনার রাজনীতিতে এই দুই দেশের কেউ পিছিয়ে নেই। সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্র যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই এই হামলার জন্য ইরানের দিকেই তোপ দাগছেন। প্রথমে অবশ্য তিনি বলেছিলেন এজন্য ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়াতে চান না। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে এই হামলার একটি জবাব দিতে চাইছেন ট্রাম্প। তবে ইরানের বিরুদ্ধে আঙুল তুললেও এখনও অকাট্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বা সাইবার হামলার সুপারিশ ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপন করেছে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। পরিকল্পনায় বিকল্প হিসেবে রয়েছে ইরানের তেল স্থাপনায় বা বিপ্লবী গার্ডের সম্পদে হামলা। এমন এক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায়  ড্রোন হামলা হলো যখন যুক্তরাষ্ট্র-তেহরান সম্পর্ক এমনিতেই বেশ ঝাঁঝালো হয়ে রয়েছে। পরমাণু ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলছে বাদানুবাদ।

পরিস্থিতি যখন আলোচনার সুরে এগুচ্ছে তখনই এই হামলার ঘটনা ঘটল। ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। যদিও এখন সেই সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই হয়। এর কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত ইরানের আগ্রহ। আলোচনার ব্যাপারে ইরানের মনোভাব খুব বেশি ইতিবাচক নয়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় যাবে না বলে জানিয়েছে সেদেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি। কোনো পূর্ব শর্ত ছাড়াই ইরানের সাথে আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নত স্বীকার করতে রাজি নয়। ইরানের মতে আলোচনা মানে ‘অযৌক্তিক চাপকে স্বীকার করে নেয়া’। আর ইরান আমেরিকার অযৌক্তিক চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। দ্বিতীয়ত সৌদি আরবে হামলার পর মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন আলোচনা করার পরিস্থিতিতে আছেন কি না সে এক প্রশ্ন বটে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের খেলা রয়েছে। সৌদি আরবের মিত্র যেমন যুক্তরাষ্ট্র তেমনি ইরানের মিত্র রাশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বৈশ্বিক রাজনীতির খেলায় মহাগুরুত্বপূর্ণ দুই দেশ হলো ইরান ও সৌদি আরব। দুই দেশই নিজেদের প্রভাব বিস্তারের খেলায় ব্যস্ত। দুই দেশের শাসনতান্ত্রিক পার্থক্যও বিদ্যমান। সৌদি আরব একনায়ক রাজতান্ত্রিক, ইরান ইসলামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিশ্লেষকদের মতে, প্রভাব বিস্তারের রাজনীতির কারণে দুই দেশের মধ্যে এমন দ্বন্দ্ব বিরাজমান। দুই দেশ মুসলিম প্রধান দেশ হলেও সৌদি আরব সুন্নিপন্থী এবং ইরান শিয়াপন্থী। কে মোড়লীপনা করবে বা ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এই নিয়ে চলছে রেষারেষি।

গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতির কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে গত ১৫ বছরে বেশি কিছু ঘটন-অঘটনের কারণে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। সবশেষে ২০১১ সালে আরব বসন্তে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের কাঠামো ভেঙে গেছে। নতুন করে প্রভাব বিস্তারের খেলায় মেতে উঠেছে দুই দেশ। সিরিয়া ও ইয়েমেনের পক্ষ অবলম্বণ করে নিজেদের শক্তির বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছে। এই দুই দেশেই সৌদি আরব ও ইরানের অবস্থান বিপরীতমুখী। এভাবে যখন শক্তির বিভক্তিকরণের খেলা চলছে তখন সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে হামলা সেই প্রতিযোগিতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সৌদি আরবে তেলক্ষেত্র আক্রান্ত হওয়ার পর রাশিয়া সৌদি আরবকে রুশ ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশ আলোচিত ইস্যু। কারণ এটি রাশিয়ার তৈরি একটি আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি অস্ত্রভাণ্ডারকে শক্তিশালী করার সাথে সাথে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করবে। প্রকাশ্যে সৌদি আরবকে এই প্রস্তাব দেয়ায় মার্কিন রাজত্বে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তেল, অস্ত্রসহ নানা কারণে মধ্যপ্রাচ্য পশ্চিমা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তাদের মিত্র দেশকে যে যথাসাধ্য সহায়তা করতে এগিয়ে আসবে তা বলা যায়। তবে সৌদি আরবের এই দুর্ঘটনার পর কি ইরানের সাথে আলোচনা সম্ভব? নাকি তা যুদ্ধের মতো চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসর হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে এটুকু বলা যায়- সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার পাল্টা জবাব দেয়ার সক্ষমতা রিয়াদের রয়েছে। দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদি এ মন্তব্য করেছেন।

তবে, যুদ্ধের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কয়েকটি বিষয় ভাবতে হবে। প্রথমত যুদ্ধ হলে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব বা ইরানের মধ্যেই সিমাবদ্ধ থাকবে না। দুই দেশের মিত্র দেশ রয়েছে এবং তারাও এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে না পরলেও এগিয়ে আসবেই। যুদ্ধ এমনিতেই ধ্বংসাত্মক ফল বহন করে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ হবে আরও ভয়ঙ্কর। এর প্রভাব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। তেলের বাজার অস্থিতিশীল হবে। ফলে এরকম একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিশ্ব নেতারা অবশ্যই দু’বার চিন্তা করবেন।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন