ঢাকা, রবিবার, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কূটনীতি আবেগ বা আনন্দ প্রকাশের বিষয় নয়

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৭ ১২:৩৪:৫৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৮ ৪:২৯:৪৭ পিএম

কূটনীতি জটিল বিষয়। গ্লোবালাইজেশনের যুগে বিষয়টি আরও কঠিন। বিশ্বে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌগলিক, অভিবাসন, শক্তি প্রদর্শন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে সংঘাত চলছে।বাংলাদেশ ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী। ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ভারত বৃহৎ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে শুধুই কৌশলগত। চীন ভারতের বৃহত্তম ও শক্তিশালী প্রতিবেশী। চীনের সাথে ভারত যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে না। পাকিস্তানের সাথে তার বৈরি সম্পর্ক সেই জন্মলগ্ন থেকেই। সামরিক শক্তিতে তারা প্রায় সমানে সমান। দুই দেশই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। দুই দেশেরই বৃহৎ এক সংখ্যা অপুষ্টি, অশিক্ষা ও  বেকারত্বে ভুগছে কিন্তু তাদের সামরিক প্রতিযোগিতা থেমে নেই। কাজেই বাংলদেশ এমন একটি দেশ যার সাথে তার সম্পর্ক ভালো রাখতেই হবে। বাংলাদেশ নেপাল, মালদ্বীপ কিংবা শ্রীলঙ্কা নয়। তাই ভারতও বলছে- বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ভারত সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নিমিত্তে। এ ছাড়াও তিনটি যৌথ প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন বিশ্বের সামনে বড় উদাহরণ।  দুই দেশের সম্পর্কের সোনালী যুগ চলছে। ... এ সম্পর্কের কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এখন অমিমাংসিত ইস্যু আর নেই বললেই চলে। সীমান্তে হত্যা এখন একেবারেই কমে গেছে। আগে যেখানে বছরে একশর বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে গত বছর মাত্র তিনজন নিহত হয়েছে। গত দশ বছরে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পরিস্থিতির এই উন্নয়ন অনেক বড় অর্জন। আর একটি অমীমাংসিত ইস্যু হচ্ছে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি। সেটাতেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কখনও না করেনি। প্রক্রিয়াগত কারণে এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে সময় লাগে। এটি সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

যে মন্তব্যগুলো করা হলো সেগুলো কূটনৈতিক ভাষা। বাস্তবে এর কতগুলোর সাথে একমত হওয়া যায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এবারের দিল্লী সফরের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, তিনি সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সভায় বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্য সময়োপযোগী ছিল। তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন, অর্থনেতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি ও বৈষম্য কমানোর বিষয়টি সামনে এনেছেন। একই সঙ্গে বহুত্ববাদের কথা বলেছেন। তাঁর উচ্চারণ সময়ের বিবেচনায় সাহসীও। দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক। সময়ের প্রয়োজনে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও বাণিজ্য খাতে সহযোগিতা খাতে সহযোগিতার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। এ বৈঠকে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির প্রসঙ্গটি উঠবে না, সেটি আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল। এ বৈঠকে সেটি ওঠা বা না ওঠার বিশেষ কোনো গুরুত্বও নেই। কারণ তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একমত। অতএব, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দিয়ে সব জটিলতার নিরসন হয়ে তিস্তার বন্টন চুক্তি হবে সে প্রত্যাশা রয়েছে।’

তিস্তার পানি প্রাপ্তির ব্যাপারে আমরা কত আশা করে বসে আছি কোনভাবেই সেটি যেন হচ্ছে না। অথচ জনাব দেলোয়ার বলছেন- এটি কোনো বিষয়ই নয়। আবার এভাবেও একজন কলামিস্ট মন্তব্য করেছেন: ‘সব সরকারপ্রধানই বিদেশ সফরে কিছু না কিছু আনতে যান। অভিযোগ আছে, ভারত সফরে গিয়ে আমাদের নেতানেত্রীরা সব কিছু উজাড় করে দেন। আর তাই, তারা সফরে গেলেই দেশের মানুষের উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। এবারও না জানি কী কী দিয়ে আসেন। প্রধানমন্ত্রীর বিগত ভারত সফরগুলোতে আমাদের প্রাপ্তি তেমন না হলেও ভারত পেয়েছে তাদের চাহিদামতো প্রায় সব কিছুই।’

দুর্গাপূজার কারণে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মমতা ব্যানার্জি যেতে পারবেন না। আর এ সময়েই সফরটি রাখা হলো। এটিই কূটনীতি। যদিও ভারতের সংবিধানের ২৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যে কোনো দেশের সাথে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনো চুক্তি করতে পারে। কিন্তু তারা বলছেন যে, বাংলাদেশ তাদের সর্বোচ্চ গুরুত্বের পর্যায়ে রয়েছে। তারা এমন কিছু দিবে, এমন আন্তরিকতা দেখাবে যে, মনে হবে দুই দেশের মধ্যে কোনো ধরনেরই সমস্যা নেই। ওই দেখানো আন্তরিকতা যে, মিডিয়ায় এবং সরকার প্রধান যে পার্টির তারা সেটিকে সহস্রগুণ বড় করে দেখাবে। ফলে অন্য কেউ বিষয়টি নিয়ে আর প্রশ্ন তুলবে না। বরং বলবে, ভারতের সাথে আমাদের সত্যিই তো কোনো সমস্যা নেই। যেমন দুজন সাবেক কূটনীতিক বলেছেন। সাবেক কূটনীতিকরাই যদি এভাবে বলতে পারেন, তাহলে পার্টির লোকজন বিষয়টিকে সহস্রগুণ বাড়িয়ে বলবেন না কেন? কোনো দেশ নিজের দেশের স্বার্থ বিকিয়ে কিছুই অন্য দেশকে দেয় না, একমাত্র যদি বাধ্য না হয়। কয়েক বিলিয়ন লাভ করতে হলে দু’এক মিলিয়ন খরচ করা যায় এটিও কূটনীতি, যা ভারত মাঝে মাঝে করে। যা দেখে অতি আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। ভারতের পার্শ্ববর্তী যেসব দুর্বল দেশ রয়েছে তাদের যতই সাধ থাক, সাধ্য তেমন কিছু থাকে না। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে মমতা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে ঢাকায় আসতে রাজি হননি। যদিও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এসেছিলেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকালে মমতা ঢাকায় এলেও তিস্তার বিষয়ে অনড় অবস্থানে ছিলেন। মমতা ব্যানার্জির ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে ‘দায়মুক্ত’ প্রমাণ করার চেষ্টা আগেও করেছেন, এবারও করলেন। এটিই কূটনীতি। তারা আমাদের পানি দিতে যাবে কেন? যদি দিতেই হয়, তবে যতটুকু পানি তাদের ক্ষতি করবে শুধুমাত্র সেটুকু আমাদের দিকে পাঠাবে। তা না হলে তারা এত বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করে ফারাক্কা বাঁধ দিতো না। 

ত্রিপুরার আগরতলায় বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যদি বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের কোনো সিদ্ধান্ত হয় সেটি কেমন হবে? বাংলাদেশ ও ভারত সাতটি দলিল সই করেছে। সেগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি, চারটি সমঝোতা স্মারক, একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর ও একটি কর্মসূচি। আওয়ামী লীগের প্রধান যখন সরকার প্রধান হিসেবে ভারত সফরে যান, বিএনপি কিংবা অন্যরা এমন ভাব দেখান বা এমন চেঁচামেচি করেন যে, তারা গেলে সবকিছু হয়ে যেতো। আসলে তারাও যে কিছুই করতে পারতেন না, তা তারাও জানেন। আবার আওয়ামী লীগ এমনভাবে সবকিছু ম্যাগনিফাই করে, ভারত থেকে আমরা যা এনেছি তা আর কেউ কখনও পারেনি, পারবেও না।

সত্যি বলতে ভারত থেকে আমরা খুব বেশি কিছু আনতে পারব না, তারা দিবেও না। কেন দিবে? তাদের সঙ্গে শুধু মৌখিক সম্পর্কটুকুও যদি ভালো থাকে তাহলেও আমাদের জন্য লাভ। আমাদের জন্য লাভ কেন? কারণ ভারত বিশাল প্রতিবেশী, শক্তিশালী প্রতিবেশী। আমরা ইতিমধ্যে এগারো লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাধ্য হয়ে আশ্রয় দিয়েছি যা গোদেড় ওপর বিষফোঁড়া। বাংলাদেশ নিজেই তার বিশাল জনসংখ্যার ভারে ক্লান্ত। একইভাবে ভারত আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) করার মাধ্যমে যদি তাদের সেই উনিশ লাখ অধিবাসীকে রোহিঙ্গাদের মতো জোর করে পাঠিয়ে দেয়, বাংলাদেশ তখন কী করবে? বিএনপির সময় এই ঘটনা ঘটলে বিএনপি কি করতো? ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতো? ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না? আর যুদ্ধ কোনো সমাধানও নয়। সম্পর্ক ভালো থাকলে হয়তো চক্ষুলজ্জার খাতিরেও এই কাজটি ভারত বাংলাদেশের সাথে করবে না। সেটিই আমাদের লাভ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত ব্যক্তিদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদারতার প্রশংসা করেন। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া সুগম করতে আরও বৃহত্তর প্রয়াস গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও তারা একমত। এগুলো সবই কূটনীতির অংশ, কূটনৈতিক ভাষা। আমাদের যা প্রয়োজন সেগুলো কি ভারতের কাছ থেকে পেয়েছি বা পাব সেটিই হলো প্রশ্ন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারত আমাদের সাথে যা কিছুই করুক না কেন, তাদের স্বার্থ রক্ষা করেই তা করবে। এ নিয়ে কোনো পক্ষের বাড়াবাড়ি, কঠোর সমালোচনা বা অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলা দেশের জন্য কোনোভাবে মঙ্গলজনক নয়। মনে রাখতে হবে এটি কূটনীতি। এটি শুধুমাত্র আবেগ ও অযথা আনন্দ প্রকাশের বিষয় নয়।


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন