ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৯ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আত্মহনন নয় প্রয়োজন আত্মোন্নয়ন

নাজমুল হুদা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১০ ৯:৪৫:০৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১০ ৯:৪৬:৩২ পিএম
ছবি : ইন্টারনেট

বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ এর উদ্যোগে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়।

এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মানসিক সাস্থ্যের উন্নয়ন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ’। মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ঘটছে আত্মহত্যা। বছরে ৮ লক্ষ মানুষ অত্মহত্যায় মারা যাচ্ছে। ৭৮ শতাংশ আত্মহত্যা ঘটে  নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে।

আত্মহত্যার আচরণের মধ্যে রয়েছে আত্মহত্যার চিন্তা বা পরিকল্পনা, আত্মহত্যার চেষ্টা ও আত্মহত্যা। দিন দিন তরুণদের মাঝে বাড়ছে অধৈর্য, অস্থিরতা, সহিংসতা, আত্মহত্যার ঝোঁক, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন মানসিক রোগ। যাদের মানসিক রোগ হয়, তাদের ৫০ শতাংশের ওই রোগের প্রথম লক্ষণ ১৪ বছরের মধ্যেই দেখা দেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা প্রবল। কৈশোর-তারুণ্যে আত্মহত্যা হচ্ছে বিশ্বে মৃত্যুর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)।

আমাদের এই অজ্ঞতা ও অসচেতনতা কাটিয়ে উঠতে হবে। কেননা জীবনকে সুন্দর, সার্থক, সুখী করতে হলে শৈশব থেকেই ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে।  (সেন্টার ফর ট্রান্স ইউথ হেলথ অ্যাট চিলড্রেন হসপিটাল, লস অ্যাঞ্জেলেস) এবং ২০ শতাংশ তরুণ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভোগে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)। প্রতি ১০ মিনিটে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন কিশোরী সহিংসতার কারণে মারা যায় (ইউনাইটেড ন্যাশনস চিলড্রেন ফান্ড); ৮৩ শতাংশ তরুণ মনে করে, বুলিং বা খ্যাপানো তাদের আত্মমর্যাদার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে (ডিসথেলেবল ডট অরগ); ট্রান্সজেন্ডার তরুণদের ৫১ শতাংশ আত্মহত্যার চিন্তা করে, ৩০ শতাংশ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরিবার ও অন্যত্র তরুণেরা শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। এ ছাড়া অবহেলা, বঞ্চিত হওয়ার বোধ তো রয়েছেই। সহিংসতা ও মাদকাসক্তি ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই প্রভৃতি মারাত্মক অপরাধমূলক কাজে অনেক তরুণ জড়িয়ে যাচ্ছে। গ্যাং কালচার, ডিজে পার্টিসহ নানারকম নিত্য নতুন চর্চা ও প্রবণতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ছে আমাদের সন্তানেরা। আবার আত্মহত্যার ইচ্ছে নেই, তবুও নিজ ইচ্ছায় নিজকে আহত করা কিছু আবেগতাড়িত তরুণ-তরুণীর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। পরিবার, দাম্পত্য জীবন বা প্রেমের সম্পর্কে সামান্য মানসিক আঘাত পেলে, আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে বা অপরকে ম্যানপুলেট করতে তারা হাত কেটে ফেলে, ঘুমের ওষুধ খায়, ক্ষতিকর কিছু গলাধঃকরণ করে। শরীরের অংশবিশেষ পুড়িয়ে ফেলে ইত্যাদি।

তবে কেউ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে কি না তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন বিষয়। মরতে চাওয়া, নিজকে হত্যা করতে চাওয়ার ইচ্ছা পোষণ; আশাহীন ও শূন্যতাবোধ, বেঁচে থাকার যুক্তি নেই মনে করা, আত্মহত্যার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা, জীবনের ঘেরাটোপে আটকে গেছি ও এর কোনো সমাধান নেই এমন মনোভাব, অসহ্য যন্ত্রণা (শারীরিক বা মানসিক), অন্যদের বোঝা হয়ে আছি মনে করা। পরিবার, বন্ধু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ক্রোধ দেখানো, প্রতিশোধ নেয়ার চিন্তা; আবেগ বা মন-মেজাজের অস্বাভাবিক ওঠানামা ইত্যাদি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে অনেক রোগী ‘রিলিফ’ ফিল করে ও সব যন্ত্রণার অবসান হতে যাচ্ছে ভেবে শান্ত থাকে। মনে রাখতে হবে যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, তাদের পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা করার ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেশি। আত্মহত্যার কথা বলা ও চেষ্টাকে তাই খাটো করে দেখার উপায় নেই।

তাহলে আত্মহত্যার প্রবণতা বন্ধের উপাই কি? সামান্য কিছু ভালো কাজই অনেকের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। আমেরিকায় নিউইয়র্কে ‘মেন্টাল হেলথ এডুকেশন ইন স্কুলস ল’ নামে একটি আইন পাস হয়েছে। এই আইনে নিউইয়র্কের কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে স্কুল-কলেজ থেকেই ‘সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং’ (এসইএল) শেখানো হয়। এতে থাকে আত্মসচেতন হওয়ার শিক্ষা; নিজেকে সামলানোর কৌশল; সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি; সম্পর্ক ও যোগাযোগ-দক্ষতা; দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা। আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে স্থান দিতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নানামুখী প্রচার ও প্রোগ্রাম রয়েছে। যেমন: হাত ধোয়া, দাঁত মাজা, ভালো পুষ্টি, ব্যায়াম। একই রকম প্রচার ও প্রোগ্রাম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য থাকবে না কেন? তবে আশার বিষয় হল ইদানীং অনেক বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলে মানসিক সাস্থ্য পরিচর্যা সরাসরি অনুষ্ঠান হচ্ছে। রোগীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন  বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে শেখাতে হবে যেকোনো চাপ, দুর্যোগ, বিপর্যয়ের পর কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় ও দুরূহ স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে সহযোগিতাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক; সমস্যা সমাধানে ভালো দক্ষতা; কখন, কোথায়, কার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে হবে তা জানা। এভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি ও সুন্দরের অনুশীলনের মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন ঘটাতে পারলেই আত্মহ্যার প্রবণতা কমে আসবে।

নাজমুল হুদা : আত্মোন্নয়নমূলক লেখক ও উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক


ঢাকা/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন