ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

যেভাবে বীর হয়ে উঠলেন কাশেম সোলাইমানি

শাহিদুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০৬ ১২:৪২:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০৬ ১:৩৪:১৬ পিএম

ইরানি মেজর জেনারেল কাশেম সোলাইমানি। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম। ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যার মেধা-সাহস, সামরিক নেতৃত্বের গুণাবলী ও যুদ্ধক্ষেত্রে বিচক্ষণতার গল্প মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। নিজ দেশ ইরানে তিনি পেয়েছেন জাতীয় বীরের মর্যাদা।

বহির্বিশ্বে জেনারেল সোলাইমানি নানা নামে পরিচিত হলেও নিজ দেশে তিনি পরিচিত ‘হাজি কাশেম’ নামে। সামরিক বাহিনীতে তিনি পরিচিত ‘জেনারেল কাশেম সোলাইমানি’ নামে। গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিদের্শে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে তাকে হত্যা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি এই জেনারেলের নাম মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সৌদি আরবের হিট লিস্টে ছিল। এর আগেও একাধিকবার তাকে হত্যা করার জন্য মার্কিন বাহিনী চেষ্টা করেছে। কিন্তু কেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যা করা এত জরুরি হয়ে পড়েছিল? কেন জেনারেল সোলাইমানি মার্কিন প্রশাসনের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন?

জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে সমকালীন অন্যতম সমরবিদ বলে বর্ণনা করা হতো। মধ্যপ্রাচ্যে তার সমর কৌশলের কাছে মার্কিন বাঘা বাঘা জেনারেলদের কৌশল বহুবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত এক দশকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রভাব বলয় তৈরিতে এতটাই সাফল্য অর্জন করেছিলেন যে, প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং সৌদি আরব শত চেষ্টায় তাকে মোকাবিলা করতে পারেনি।

মূলত ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে লিপ্ত। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র ইসরাইল জন্মলগ্ন থেকেই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার চেষ্টায় রত। তবে যুক্তরাষ্ট্র অনেকবার ইরানের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে জড়াতে চাইলেও ইরান বরাবরই এড়িয়ে গেছে। কারণ তেহরান ভালো করেই জানে সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা একেবারেই নস্যি। বহু আগে থেকেই তারা এটা আঁচ করতে পেরেছে যে, সম্মুখ সমরে যুক্তরাষ্ট্রকে দমন তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে তারা বেছে নিয়েছে প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধ। এই ছায়া যুদ্ধের মূল কলাকৌশল ছিল জেনারেল সোলাইমানির মস্তিষ্কপ্রসূত।

ইরানের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ চালানোর জন্য তেহরান জেনারেল সোলাইমানির নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে কুদস বাহিনী গড়ে তোলে। কুদস শব্দের অর্থ পবিত্র। নাম থেকেই বোঝা যায় এই বাহিনী গঠনের পিছনে ইরানের ধর্মীয় মতাদর্শ কাজ করেছে। গঠনের পর থেকে একটু একটু করে সোলাইমানি গত ২২ বছর ধরে কুদস বাহিনীর কর্ম পরিধি বড় করেছেন, অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কুদস ফোর্স ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন কাশেম সোলাইমানি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বদলে দিতে তিনি থ্রি এইচকে শক্তিশালী করেন। হুতি, হিজবুল্লাহ এবং হামাস এই তিন গেরিলা সংগঠনকে একত্রে বলা হয় থ্রি এইচ। ইয়েমেন যুদ্ধে তার কৌশলেই সৌদি-মার্কিন জোট ধরাশায়ী হয় হুতিদের কাছে। সিরিয়া যুদ্ধে হিজবুল্লাহ বাহিনী রাশিয়ার সঙ্গে মিলে আসাদের পক্ষে যুদ্ধ করার কারণে খড়কুটোর মত ভেসে গেছে আসাদবিরোধীরা। ক্ষমতায় টিকে গেছেন বাসার আল-আসাদ। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের হামাস ইসরাইলের জন্য বড় অস্বস্তির নাম। আর এই থ্রি এইচের দেখভাল করতেন হাজী কাশেম সোলাইমানি।

গত দুই দশক ধরে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জেনারেল সোলাইমানি ছিলেন এক অকুতোভয় সেনাপতি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের বাইরে বর্তমানে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, কাতার, সিরিয়ার সঙ্গে মিলে ইরান যে অক্ষশক্তি গঠন করেছে তা সোলাইমানির সামরিক নেতৃত্বের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। তাকে বলা হতো, ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। তার সমর কৌশলের কারণে ইরাক ও সিরিয়াতে আাইএস-এর পতন ঘটেছে।

তিনি ইরানের অভিজাত বিপ্লবী বাহিনীর একজন কমান্ডার হলেও অলিখিতভাবে তার পদমর্যাদা দেশটির যেকোনো সামরিক কর্মকর্তার ওপরে ছিল। কাশেম সোলাইমানি কাজের জন্য দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খোমেনি জেনারেল সোলাইমানিকে গত বছরের মার্চে ‘অর্ডার অব জুলফিকার’ পদক দেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর কাশেম সোলাইমানি প্রথম ব্যক্তি যিনি ইরানের সর্বোচ্চ এই খেতাব পেয়েছেন। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি খোমেনির কতটা আস্থাভাজন ছিলেন।

তবে কাশেম সোলাইমানির উত্থান এলাম, দেখলাম, জয় করলাম- এমন নয়। বিভিন্ন সময়ে তাকেও চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। বহুবার গুপ্তহত্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। মৃত্যুদূত সঙ্গে নিয়ে ছুটে বেড়াতে হয়েছে উত্তপ্ত মরুর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ১৯৫৭ সালে কাশেম সোলাইমানি ইরানের কেরমান প্রদেশের কানাত-ই-মালেক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম একেবারেই সাদামাটা কৃষক পরিবারে। কৈশর এবং যৌবনে তিনি নানা ধরনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ইসলামী বিপ্লবের পর সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তার নেতৃত্বে ইরানি বাহিনী বেশ কিছু সফলতা অর্জন করে। তার নেতৃত্বে  ইরাকের সীমান্ত পেরিয়ে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়। তখন থেকেই ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনীতে তার প্রভাব বাড়তে থাকে। তিনি হয়ে ওঠেন ইরানের অভিজাত রিভ্যুলেশনারী গার্ডের অন্যতম নীতি নির্ধারক।

তবে প্রভাবশালী সোলাইমানির জীবনাচার ছিল অতি সাদাসিধে।  ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী জেনারেল হয়েও তার শরীরী ভাষায় ঔদ্ধত্য ছিল না। সরাসরি রণাঙ্গনে ঘুরতে পছন্দ করতেন।  সামরিক পোশাকে নয়, অধিকাংশ সময় সাধারণ একটা জ্যাকেট পরা অবস্থায় দেখা যেত তাকে।

খামেনি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তার মেলামেশা ছিল একেবারেই কম। ২০১৭ সালে তাকে ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি নির্বাচন করতে অস্বীকৃতি জানান। শিক্ষা-দীক্ষায়ও  তিনি উঁচু মাপের ছিলেন না। কথিত আছে, জেনারেল সোলাইমানির সামরিক প্রশিক্ষণের মেয়াদও ছিল মাত্র ছয় সপ্তাহ। আবার কেউ কেউ বলেন ছয় মাস।

মূলত ইরানের জাতীয় স্বার্থে ভূকৌশলগত সামরিক চিন্তার দক্ষতাই তাকে জাতীয় বীরে পরিণত করেছিল। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ গোলযোগ মেটাতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ধারণা করা হয় সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ সামাল দিতে সোলাইমানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরান হারাল সময়ের এক সাহসী মহানায়ককে, একজন আপাদমস্তক যোদ্ধাকে, সুদূরপ্রসারী একজন স্বপ্নদ্রষ্টাকে, যিনি স্বপ্ন দেখতেন মধ্যপ্রাচ্যের সবটুকু আসবে ইরানের প্রভাব বলয়ের মধ্যে।


ঢাকা/তারা