ঢাকা, শনিবার, ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্বকে কতটা নিরাপদ রাখবে?

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-১৬ ২:৫১:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-১৬ ৭:৩০:২৫ পিএম

সামরিক খাতে নতুন অস্ত্র যোগ করা এবং নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা এখন প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের প্রবণতা। প্রত্যেকেই যে যার মতো নিজের সুরক্ষায় ব্যস্ত। এক্ষেত্রে কোনো দেশ পিছিয়ে থাকতে চাইছে না।

প্রতিটি দেশেরই বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার থেকেই তারা নিজেকে সুরক্ষার প্রচেষ্টা করে। দুর্বল বা সবল কোনো দেশ এক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি নয়। প্রয়োজনে মিত্র দেশের সাথে জোটভূক্ত হয়েও নিজেকে সুরক্ষার কথা তারা চিন্তা করে। দেশগুলো নিজেদের ব্যয়িত অর্থের একটি বড় অংশ এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার পেছনে ব্যয় করে। অনেক দেশ আছে যাদের সামরিক খাতে ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু কেন এই প্রতিযোগিতা? আমরা কার কাছ থেকে নিরাপদে থাকতে চাইছি? আমাদের প্রধান শত্রু কে?

এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা আবশ্যক। সময় এসেছে আমাদের আত্মবিশ্লেষণ করার। নিজেকে সুরক্ষিত রাখা বা অন্যকে ভয় দেখানো যদি আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয় তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই  মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। পৃথিবীর অস্তিত্ব যদি হুমকির সম্মুখীন হয় তাহলে নিজেকে সুরক্ষিত করার কোনো অর্থ হয় না। আজকের যে আক্রমণাত্মক প্রবণতা তা অতীতেও ছিল। তখন রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতো, উলুখাগড়ার প্রাণ যেত। তারাও তাদের শক্তি জানান দিতে অন্যদেশ আক্রমণ করত। যুদ্ধের নতুন নতুন কৌশল বের করত। নতুন নতুন অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করত।

মানুষকে মারার জন্য মানুষের এত কৌশল! সে সময়ও ছোট ছোট রাজ্যগুলো একজোট হয়ে বড় রাজ্যকে প্রতিহত করত। সেই কৌশলের আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু অস্ত্রের। যুক্ত হয়েছে আরো বেশি মরণঘাতি অস্ত্র। মানুষের এ ধরনের হঠকারী কাজে পৃথিবীর কতটুকু উপকার হয়েছে? আজ নিজেকে এই প্রশ্ন করার সময় এসেছে। মাঝখান থেকে মানবজাতি আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। পৃথিবীতে যদি মানুষই না থাকে তাহলে কার জন‌্য এই সুরক্ষা?

যে শ্রম, অর্থ কাজে লাগিয়ে মানুষ বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন করেছে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তা অবিশ্বাস‌্য। এজন‌্য মানবতা পায়ে দলতেও তারা কুণ্ঠিত হয়নি। আজ বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত রূপ দেখা দিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যদি আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তাহলে এই পৃথিবী নামক গ্রহ টিকবে কি না সন্দেহ। যদি পৃথিবীই না থাকে তাহলে যুদ্ধে জয় পরাজয় দিয়ে কি লাভ? অস্ত্র প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্যই হলো স্থল, আকাশ ও নৌপথে নিজের দেশকে সবার চেয়ে এগিয়ে রাখা। নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করা। অন্য দেশের ওপর খবরদারি করা। এসব মানব জাতির জন্য হুমকি হলেও সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ ভাবছেন না অস্ত্র প্রতিযোগিতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। নিজেকে রক্ষার এই কৌশল একদিন বুমেরাং হবে।

ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের মধ্যে পারমাণবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমার কথা বলা হয়। প্রতিটি অস্ত্রই মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট। যুদ্ধাংদেহি মনোভাব নিজেদের ভেতর জিইয়ে রেখে আমরা যে মারাত্মক বোকামি করছি তা এই মুহূর্তে বুঝতে পারছি না। এ বিষয়ে সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে মাহাথির মোহাম্মদ বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, অস্ত্রের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া। যুদ্ধ করতে হবে একটা স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে। যে পৃথিবীতে কয়েক হাজার বছর ধরে আমরা বসবাস করছি। অস্ত্র উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যদি মানুষ হত্যার (অস্ত্র কেনা) বাজেট হ্রাস করি তবেই গবেষণা ও প্রস্তুতির জন্য তহবিল থাকবে। এত চমৎকার একটা সত্য বিশ্ব নেতাদের সামনে তুলে ধরার পরেও তাদের  মনোভাব পরিবর্তন হয়েছে কি? হয়ত না। কারণ যুগ যুগ ধরে চলে আসা ক্ষমতাকেন্দ্রীক মনোভাব এত তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হবে না। ফলে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্ব হুমকি মুক্ত হবে এটাও আশা করা ঠিক হবে না। তাহলে বিশ্বের পরিণতি কী? আমরা কি নিজেদের রক্ষা করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলব?

এরচেয়ে অনেক বেশি জরুরি পৃথিবী বসবাসযোগ্য করা। পৃথিবীতে বহু মানুষ আজ আশ্রয়হীন, খাদ্য নিরাপত্তায় ভুগছে তারা। বহু শিশু তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো পুর্নগঠন করা জরুরি। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া বিশ্ব নেতাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন। অগ্রাধিকারভিত্তিতে যেসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন তাই করা উচিত। কিন্তু আজ নিরাপত্তার নামে এই দাবিগুলো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। উল্টো তৈরি হচ্ছে মারাত্মক সব অস্ত্র। আপনি যখন আপনার নিরাপত্তা বিবেচনায় এসব অস্ত্র তৈরি করবেন, তখন অন্যের বসে থাকার সুযোগ নেই। নিজেকে রক্ষার অধিকার সবার আছে। সুতরাং সেও আপনার চেয়ে আরো মারাত্মক অস্ত্র তৈরি করবে।

আমরা চাইলেই আত্মঘাতি এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। কিন্তু তা সহজে সম্ভব বলে মনে হয় না। কারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে পৃথিবীতে সমীহ আদায় করার একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতা। তাই যে যার যার মতো ক্ষমতা অর্জনে ব্যস্ত। অস্ত্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অস্ত্রের জন্ম হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবী আজ যেসব কারণে হুমকিতে তা ঠেকানোর মতো কোনো অস্ত্র আবিষ্কৃত হয়নি। কথা হলো নগর যদি পুড়ে যায় তাহলে দেবালয় কি বাঁচবে?

যুদ্ধ এবং শান্তি পরস্পর বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বর্তমান বিশ্বে দুটো বিষয়ই পাশাপাশি চলছে। একদিকে একে অন‌্যের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে, অন‌্যদিকে ওই একই মুখে উচ্চারিত হচ্ছে শান্তির বুলি। মানুষ আসলে কি চায় তা মনে হয় নিজেও জানে না। যুদ্ধ না শান্তি? অস্ত্র না মানবতা? এসব তো পাশাপাশি চলতে পারে না। এশিয়ায় শক্তিমত্তা বাড়িয়ে চলেছে চীন ও ভারত। দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ ও টহলের পরিমাণ বাড়িয়ে এরই মধ্যে চীন তাদের সামরিক অগ্রগতির প্রমাণ দিয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীনে বৃহৎ সামরিক প্রদর্শনীর খবর গণমাধ্যমে এসেছে। বিষয়টি চীনের পক্ষ থেকে পেশিশক্তি নয় বরং দায়বদ্ধ চীনকে উপস্থাপন করা হয়েছে- বলা হচ্ছে।

ভারত, চীন, উত্তর কোরিয়া সবাই সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার প্রতিবেদনে সামরিক শক্তিতে কার কী অবস্থান এ বিষয়ে একটি জরিপ চালায়। এতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত ও ফ্রান্স প্রথম পাঁচে অবস্থান করছে। পাকিস্তানের অবস্থান ১৭। এ অঞ্চলের দেশগুলো হঠাৎ করেই সামরিক শক্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান। ফলে আমাদের হাতেও বিকল্প নেই। নিজেকে রক্ষার জন্যই এদিকে মনোযোগ দিতে হবে। কিন্তু এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্বকে নিরাপদ করতে সক্ষম হবে তো?

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট

 

ঢাকা/তারা

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও