ঢাকা, সোমবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

উনসত্তরের অমর নায়ক শহীদ মতিউর

শিহাব শাহরিয়ার : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৪ ৫:৩৩:৫৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২৪ ৫:৪৬:৪৩ পিএম

বয়স কত হবে? ষোল। মাত্র ষোল বছরের এক কিশোর, যে কিনা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে নিজের নাম লেখাল! ১৯৬৯ সাল। এই কিশোর দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করল! সেদিন ছিল ২৪ জানুয়ারি। দিনটি বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের দিন। এই দিনেই পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের পেটুয়াবাহিনীর নির্মম বুলেটের আঘাতে ঢাকার রাজপথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এই সাহসী কিশোর। তার লাশ নিয়ে মিছিল হয়, ফুঁসে ওঠে পূর্ববাংলা।

কিন্তু মৃত্যুই চিরসত্য। শহীদ এই কিশোরের জানাযায় শতশত জনতা শরিক হলেন। অবশেষে মাটির নিচে তাকে চিরদিনের মতো শুইয়ে দেয়া হলো। ইতিহাসের সোনালি পাতায় উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা হলো তার নাম। আমরা তাকে স্মরণ করি পরম ভালবাসা, শ্রদ্ধা আর গৌরবে।

কে এই ইতিহাসের অমর বালক? কী তার নাম? কী পরিচয়? কোথা থেকে এসে এই মৃত্যু-উপত্যকায় নিজের নাম লেখালেন? জীবন দিয়ে আলো জ্বালালেন বাংলা নামক দেশের? বাংলাদেশের। যে বাংলাদেশ নির্যাতিত হয়ে, অত্যাচারিত হয়ে, সন্তান হারানোর বেদনায় কেঁদে কেঁদে চোখের জলবিধৌত যমুনা, পদ্মা আর মেঘনার সঙ্গে গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে! এই হারানো সন্তানেরই একজন এই অমর বালক।

জননী ও জন্মদাতা বাবা এই মৃত্যুঞ্জয়ী বালককে আদর করে ডাকতেন ‘মতি’। পুরো নাম মতিউর রহমান মল্লিক। জন্ম ঢাকায়। ১৯৫৩ সালের ২৪ জানুয়ারি। কি আশ্চর্য- মৃত্যুদিনও ২৪ জানুয়ারি। বাবা আজহার আলী মল্লিক। নিজের নামের শেষ অংশ পুত্রের নামের সাথে যুক্ত করে দিয়েছিলেন। বাবা ছোট্ট একটি চাকরি করতেন-ব্যাংক কর্মচারী। সামান্য বেতন। দারিদ্র্যের সংসার। তবু সন্তানদের শিক্ষিত করার অটুট মনোবাসনা তার। আদরের মতিকেও তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার বাসনা নিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। শ্যামলা রঙের পাতলা গড়নের ছোট্ট মতিউর ভর্তি হলেন নবকুমার ইন্সটিটিউশনে। দেখতে দেখতে সে উঠে গেল নবম শ্রেণিতে। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। মেধাবীরা বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করে। মতিউরও নবম শ্রেণিতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো। তখন বাংলাদেশে চলছে রাজনীতির উত্তাল সময়। এই সময়ের শুরু মতিউরের জন্মের কয়েক বছর আগে। সেটি মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির পরপরই বাঙালিরা নতুন উদ্যোমে জেগে ওঠে। এই দিনের ১১ মাস পরে জন্ম নেয়া মতিউর, শৈশব থেকেই দেখে আসছে ঢাকার রাজপথের উত্তাল তরঙ্গ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে শহীদ মিনার, আর সেগুলো গুড়িয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানি স্বৈরবাহিনী।

ষাটের দশকের তৎকালীন পূর্ববাংলা এককথায় উত্তাল। ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৮’র আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা- এসব আন্দোলনের উত্তাপ কিশোর মতিউরকে ভিতরে ভিতরে আন্দোলিত করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে মহান সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। সে হয়ত জানালা দিয়ে কিংবা পথে হাঁটতে হাঁটতে অথবা স্কুলের বারান্দা থেকে শুনতে পেত জয়বাংলা ধ্বনি। যা তাকে দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বেলিত করেছে। তা না হলে পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে চুপি চুপি কেন সে রাজপথে নেমে আসত? যোগ দিত মিছিলে? স্বাধীনতার দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দমন করার প্রয়াসে পাকিস্তানি শাসক নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়েছে। অকাতরে গুলি বর্ষণ করেছে। পাখির মতো হত্যা করেছে নিরীহ মানুষকে।  

বাঙালির মুক্তির এই আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ’৬৯’র গণ-আন্দোলনের মহানায়ক তুখোড় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ঐ বছরেরই ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার এক জনসভায় বাংলার এই অবিসংবাদিত নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে ছয় দফা ঘোষণা করলেন, তখন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান শেখ মুজিবের ওপর ক্ষুব্ধ-ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। বাঙালির ন্যায্য দাবি ছয় দফাকে পদদলিত করার প্রয়াসে শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করে এবং তাঁকে জেলখানায় বন্দী করে। আইয়ুব খানের উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলাবে। কিন্তু বাংলার মানুষ প্রিয় নেতাকে জেলাখানা থেকে মুক্ত করতে দুর্বার আন্দোলন গড় তুলল। তারা কণ্ঠে স্লোগান ধরল: ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ এবং ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। এভাবে আন্দোলন এগিয়ে যায়। আসে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস। আন্দোলনের উত্তাল জোয়ার রুখতে আরও মরিয়া হয়ে ওঠে স্বৈরচারী আইয়ুব সরকার। দেশের এই টালমাটাল অবস্থায় মতিউর চুপ করে থাকতে পারল না। টগবগে কিশোর মতিউর এখন অনেক সচেতন। বাঙালিদের প্রতি আইয়ুব সরকারের বৈষম্য আর দমন-পীড়নের ঘটনা মতিউরকে দগ্ধ করে, ক্ষুব্ধ করে। তার ভেতরে ঘৃণা আর প্রতিবাদের আগুন ধিকিধিকি জ্বলে। এক সময় সেও একাত্ম হয়ে যায় আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে। মিটিং-মিছিলে যোগ দিতে থাকে বড়দের সাথে। প্রায়ই মিছিলের সামনের সারিতে দেখা যায় তাকে।

২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা অর্থাৎ কারফিউ ভেঙে ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। এতে শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র নরসিংদীর আসাদুজ্জামান আসাদ। মতিউরও ছিল সেই মিছিলে। নিজের দেশের পুলিশ কী নৃশংসভাবে গুলি চালিয়ে পাখির মতো মানুষ মারতে পারে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য খুব কাছে থেকেই দেখেছিল মতিউর। এই ঘটনায় সে ভীত বা আতঙ্কিত হয়নি বরং তার মধ্যে প্রতিবাদী মনোভাব আরও জোরালো হয়। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের প্রতি তার ঘৃণা আরও তীব্র হয়। সে যেন রাতারাতি হয়ে ওঠে আন্দোলনের এক লড়াকু সৈনিক। পড়াশোনায় মনোযোগী ছাত্র মতিউর বইপত্র শিকেয় তুলে আন্দোলনের কাফেলায় শামিল হলো। সারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আসাদ হত্যার ঘটনায় প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে ২৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে হরতাল ডাকা হয়। ঢাকার রাজপথ সেদিন মিছিলে মিছিলে উত্তাল।

এই ২৪ জানুয়ারিই ছিল মতিউরের জন্মদিন। কিন্তু সেদিকে তাকাবার তার সময় কোথায়! সে যোগ দেয় বিক্ষোভ মিছিলে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার মিছিল চলছে। মুখে তাদের নানা স্লোগান। আকাশ-বাতাস কাঁপানো প্রতিবাদ আর বিক্ষোভের অগ্নিঝরা ধ্বনি। এই দুর্বার গণ-অভ্যুত্থান আইয়ুবের চামচাদের একেবারেই ভালো লাগেনি। পুলিশ গুলি চালায় মিছিলে। আর তাতেই শহীদ হয় কিশোর মতিউর। গুলিতে ঝরে পড়ে আরও ক’টি তাজা প্রাণ। তৎকালীন সচিবালয়ের সামনের রাজপথে নির্মম বুলেটের আঘাতে মতির বুক ঝাঝরা হয়ে রক্তে রঞ্জিত হয়ে ঢলে পড়ে। তাঁর নির্জীব দেহ নিয়ে যাওয়া হয় মতিঝিল কলোনিতে। তাঁর বাবার কাছ থেকে শুনেছি- ‘মতিউর সেদিন খুব ভোরে পরিবারের কাউকে কিছু না বলে চুপিচুপি বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। এরকম আগেও গেছে, কিন্তু আজকের যাওয়াই শেষ যাওয়া- এটি আমরা বুঝতে পারিনি, আজ সে লাশ হয়ে ফিরে এলো..’।

শহীদ মতিউরের লাশ আসার সাথে সাথে পুরো মতিঝিল কলোনি জনারণ্যে পরিণত হলো। সেখানে জানাজা হলো, তারপর পরিবার, প্রতিজন এবং শোকাহত জনতা শহীদ মতিউরের লাশ বহন করে গোপিবাগ গোরোস্থানে দাফন করে। মতিউর হারিয়ে যান অনন্তের পথে। যে পথ থেকে আর ফিরে আসা যায় না...।

এই নৃশংস ঘটনা যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালল। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ক্ষোভ আর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ এত তীব্র হয়ে উঠল যে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ক্ষমতার মসনদ বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল। মূলত শহীদ আসাদ ও শহীদ কিশোর মতিউরের আত্মদানের দিনটিই বাঙালির স্বাধীনতা বেগবান করে তোলে। এরপর ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়। কিন্তু আইয়ুব খান ক্ষমতা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ভাবী প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর না করে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। আসে ১৯৭১।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ল মহান মুক্তিযুদ্ধে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে আমরা বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকা অর্জন করি। এই যে অর্জন, এই মহান অর্জনের এক অবস্মরণীয় অমর নাম শহীদ কিশোর মতিউর রহমান মল্লিক। কিন্তু প্রশ্ন, শহীদ মতিউরের স্মৃতি সমাধি কী হয়েছে?

আমি একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের শহীদ মতিউর দিবসের একটি বিশেষ প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়েছিলাম গোপিবাগের সেই কবর স্থানে। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছে শহীদ মতিউর। পরিবারের সদস্যরা ছাড়া সেখানে আর কেউ যায় কী? কিম্বা গোপীবাগের এই কবরস্থানে ইতিহাসের স্মৃতিময় কোন বালক শুয়ে আছে- অনেকে হয়ত জানেনই না? কিম্বা আমি বিটিভি’র এই প্রামাণ্য প্রতিবেদন করতে না গেলে আমিও জানতাম না বা দেখতাম না শহীদ মতিউরের কবর? সমাধি তো আর বলা যাবে না- কারণ কেউ তাঁকে মনে রেখেছে বলে মনে হয় না। আমি বিটিভি’র উপস্থাপক হিসেবে তিন বার ২৪ জানুয়ারি তারিখে তিনটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছি-শহীদ মতিউর দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠান। এই সূত্রে পরিচয় হয়েছে মতিউরের বাবা, মা আর ভাইদের সঙ্গে। খুব অভাবের সংসার তাদের। তারা তখন থাকতো বাসাবো। এখন কোথায় থাকে জানি না। বাসার ভিতরে ঢুকে দেখলাম সত্যি নিম্নবিত্তের সংসার। শুনলাম সংসারে আয় করে তার একটি ছেলে, তাকে সোনালি ব্যাংকে চাকরি দিয়েছে রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন মন্ত্রী জনাব তোফায়েল আহমেদ। সেদিন সাক্ষাৎকারে বললেন, সরকারের কাছে একটি বাড়ি চান মতিউরের বাবা। এজন্য কয়েকজন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের কাছে আবেদনও করেছেন, দেখাও করেছেন। ছিপেছিপে লম্বা গড়নের মানুষ মতিউরের বাবা আজহার আলী মল্লিক আমার অফিস বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে বহুদিন এসেছেন। অনেক দুঃখের কথা বলেছেন। এটি বলছি ২০০০ সালের কথা। তখন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উদ্যোগে শহীদ মতিউরের স্কুল বকশি বাজারের নবকুমার ইন্সটিটিউশনে একটি বিজ্ঞানাগার তৈরি করা হয় মতিউরের নামে। যে কাজটির সঙ্গে আমি জড়িত হই। সে সময় প্রায় প্রতিদিনই মতিউরের বাবা আসতেন আমার কাছে। আমাকে খুব স্নেহ করতেন এবং সম্মান করতেন। আমাকে তিনি দিয়েছেন শহীদ মতিউরের ওপর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ। এগুলো এখনও আমার কাছে আছে। এগুলো দুটো কারণে আমাকে দিয়েছেন। এক. নবকুমার ইন্সটিটিউশনের কাজের জন্য এবং দুই. ভবিষ্যতে যাতে মতিউরকে নিয়ে লিখি। সেই তাগিদে এই লেখা বটে।

কাজী আবু জাফর সিদ্দিকীর কথা এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে- যিনি আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করার জন্য। সেটি ১৯৮৫ সালের কথা। আমাকে তিনি তালিকাভুক্ত উপস্থাপক করেছিলেন এবং নানামাত্রিক অনুষ্ঠান আমাকে দিয়ে করিয়েছেন। বিশেষ করে জাতীয় দিবস, বিশেষ দিবস, স্মরণীয়-বরণীয়দের নিয়ে অনুষ্ঠান করার জন্য এসাইনমেন্ট দিতেন। একদিন আমি বললাম, জাফর ভাই, শহীদ মতিউরের বাবা আমার কাছে আসেন এবং মতিউরকে নিয়ে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করলে ভালো হয়। তিনি একবাক্যে বললেন, একদিন তাঁকে নিয়ে এসো টেলিভিশনে। আমি নিয়ে গেলাম। জাফর দারুণ খুশি হলেন। এবং বললেন, সামনের ২৪ জানুয়ারি মতিউরকে নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান করতে। যথাবিহীত আমার সঞ্চালনায় শহীদ মতিউর উপলক্ষ্যে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হলো। পরের বছর আবারো। এবার অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ, শহীদ আসাদের বড়ভাই প্রকৌশলী রাশেদুজ্জামান এবং শহীদ মতিউরের বাবা জনাব আজহার আলী মল্লিক। শুনেছি এই অনুষ্ঠানটি তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখেছেন।

এরপরও শহীদ মতিউরের বাবা আরও বেশ কিছুদিন আমার কাছে এসেছেন, কিন্তু হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিলেন। আর দেখি না তাঁকে। না আসুক, কিন্তু তাঁর সুখের কথা দিয়েই শেষ করি। তিনি বলেছেন, ‘আমি একজন গর্বিত পিতা, কারণ মতিউর এদেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমি চাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হোক, তাহলেই শহীদ কিশোর মতিউরের আত্মা চির শান্তি পাবে।’

সর্বশেষ বলি, আজহার আলী মল্লিক ঢাকায় একটু ঠাঁইয়ের জন্য এরশাদ, খালেদা জিয়ার কাছে পরপর ধর্না দিয়েছেন, কিন্তু তাঁকে কেউ কিছুই দেয়নি। অবশেষে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাকে ১০০১ টাকার বিনিময়ে ঢাকার উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডে ৫ কাঠার একটি জায়গা দিয়েছেন। যেখানে তিনি ডেভেলপারকে দিয়ে ৬ তলা একটি বাড়ি বানিয়েছেন এবং পেয়েছেন ৭০ লক্ষ টাকা। 

উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মহানায়ক জননেতা তোফায়েল আহমেদ গত সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থায় শহীদ মতিউর রহমান মল্লিককে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ খেতাব ‘স্বাধীনতা পদক’ দেয়ার জন্য প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মতিউর রহমান মল্লিককে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করেছেন।


ঢাকা/তারা