ঢাকা, সোমবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নির্বাচনী দূষণ

বিনয় দত্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২৭ ২:১৪:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-২৭ ৫:৫৪:০৯ পিএম

‘এই শহর আমার নয়, আমার বসবাস অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো নগরে...’ কথাটি আমার নয়। এটি আমার এক কাল্পনিক চরিত্রের কথা। শহর ও নগর নিয়ে আমার নিরীক্ষাধর্মী দুটি বই আছে। সেখানে আমি এই শহর এবং নগরের সমস্যা এবং সংকট নিয়ে গল্পের ঢঙে আলোচনা করেছি এবং সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা এই কারণে বলছি, সমস্যা খুঁজে সেই সমস্যার সমাধান আমি করতে পারব না, সেই ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়নি। আমি শুধু কেন সমস্যা হচ্ছে, এই পথে গেলে সমস্যাটি সমাধান হবে এই অনুসন্ধানটুকু করেছি এবং আবেগ নয় যৌক্তিক জায়গা থেকে তা দেখিয়েছি।

যে সমস্যার কথা আমি এখন বলব- সেই সমস্যাটা আসলে সমস্যার পর্যায়ে ছিল না। সমস্যাটা আমরা ইচ্ছে করেই তৈরি করেছি। সবচেয়ে অবাক এবং বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই যে সমস্যাটা সবাইকে পীড়িত করছে তা এখনো অনেকের মাথায় আসছেই না! কেন আসছে না আমি জানি না।

যেহেতু অনেকেই সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পারেননি তাই সমস্যায় প্রবেশের আগে আসুন একটি তথ্য জেনে নেই। ২০২০ সালের শুরুতেই ‘তীব্র শব্দদূষণের কবলে ঢাকাবাসী’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাপা ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। তারা একটি সমীক্ষা বের করে এই উপলক্ষ্যে। তাতে বলা হচ্ছে, নীরব, আবাসিক ও মিশ্র এলাকার ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা ১০০ ভাগ সময় আদর্শ মানের ওপরে ছিল (নীরব এলাকার আদর্শ মান ৫০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকার আদর্শ মান ৫৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকার আদর্শ মান ৬০ ডেসিবেল)। বাণিজ্যিক এলাকায় শব্দের মাত্রা আদর্শ মানের চেয়ে ৯৭ দশমিক ৫৮ ভাগ সময় বেশি মাত্রায় ছিল (বাণিজ্যিক এলাকার আদর্শ মান ৭০ ডেসিবেল)। শিল্প এলাকায় শব্দের মাত্রা আদর্শ মানের চেয়ে ৭১ দশমিক ৭৫ ভাগ সময় বেশি মাত্রায় ছিল (শিল্প এলাকার আদর্শ মান ৭৫ ডেসিবেল)।

গবেষণার তথ্যানুযায়ী, সাধারণত বাসা, স্কুল, বাণিজ্যিক এবং শিল্প এলাকায় যে পরিমাণ শব্দ হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক বেশিমাত্রায় শব্দ উৎপন্ন হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, বেশি মাত্রার শব্দ হলে সমস্যা কী? শব্দ তো শব্দ। তার আবার কম বা বেশি কী?

শব্দের একটি মাত্রা আছে। সেই নির্দিষ্ট মাত্রার শব্দ আমরা শুনতে পাই। আবার নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় শব্দ উৎপন্ন হলে তখন আমাদের অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়। এখন প্রশ্ন হলো, বেশি মাত্রার শব্দ হলে সমস্যা কী? সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেকক্ষণ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শব্দ শুনতে থাকবেন তখন আপনি কোনো কারণ ছাড়াই রেগে যাবেন। খিটমিটে হয়ে যাবেন। আর রাগের মাথায় মানুষ অনেককিছুই করে ফেলেন যা পরে অনুশোচনা তৈরি করে। কিন্তু এই হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারণই হলো অত্যধিক মাত্রায় উৎপন্ন শব্দ বা তীব্র শব্দ।

ঢাকা সিটিতে এখন উৎসব আর উৎসব। নির্বাচনী আমেজে সবাই এখন মাতোয়ারা। মাতোয়ারা জাতিকে উৎসবের গন্ধ, রূপ, রহস্য, আমোদ দিয়েছে নির্বাচন! আবার এই উৎসব আয়োজন করা কিন্তু সহজ কথা নয়। উৎসব আয়োজনের কিছু নির্ধারিত সময় লাগে। নির্বাচন এই জাতির জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের একটি উপলক্ষ্য। এই নির্বাচন সরস্বতী পূজার দিন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন, সচেতন মানুষের প্রতিবাদ, ছাত্রদের আমরণ অনশন এবং জাতীয় হিন্দু ঐক্যজোটের ভোট বর্জনের ঘোষণার মুখে নিবার্চন কমিশন বাধ্য হয়ে তারিখ পরিবর্তন করে। এই তারিখ পরিবর্তনের জন্য আবার এসএসসি পরীক্ষা পিছাতে হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, নির্বাচনের তারিখ পেছানোর জন্য অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনও একদিন পেছাতে হয়েছে। গত ২২ বছরের ইতিহাস বদলে দিয়ে এবারই প্রথমবারের মতো ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে প্রাণের একুশে গ্রন্থমেলা।

যে নির্বাচনের জন্য এতো কিছুর পরিবর্তন, সেই নির্বাচন আসলেই অনেক বড় উৎসবের এবং আনন্দের। আমরা সাধারণত আনন্দ উদযাপন করি কীভাবে? উল্লাস প্রকাশ করে। ধরুন বিয়েবাড়িতে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে আমরা আনন্দ প্রকাশ করি। নির্বাচনেও আনন্দ প্রকাশের জন্য উচ্চশব্দে মাইকিং করে বা গান বাজিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, বাজার, মসজিদ-মন্দির ও আবাসিক এলাকাসহ সবখানেই প্রার্থীদের পক্ষে মাইকিং চলছে। এমনকি যানজটে দাঁড়ানো অবস্থাতেও থামছে না মাইকের শব্দ। এই উচ্চশব্দের কারণে সাধারণ জনগণের অসুবিধা হলেও অসুবিধা হচ্ছে না প্রচারকারীদের। অবশ্য নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় এই বিষয়ে বলা আছে। সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৬-বলা হয়েছে− ‘কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনও রাজনৈতিক দল, অন্য কোনও ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান একটি ওয়ার্ডে পথসভা বা নির্বাচনী প্রচারের কাজে একের অধিক মাইক্রোফোন বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী অন্যবিধ যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন না। কোনও নির্বাচনি এলাকায় মাইক বা শব্দের মাত্রা-বর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার দুপুর ২টার আগে এবং রাত ৮টার পরে করা যাবে না।’

এই বিধিমালা কি মানা হচ্ছে? প্রশ্নটি আপনাদের কাছে।

যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে প্লাস্টিক এখন আমাদের মনে, মননে। কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না? নগর সভ্যতা বা পণ্য সভ্যতা এখন সবাইকে গিলে খেয়ে ফেলেছে। তারা সবকিছুকে প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছে। আমার ধারণা ভবিষ্যতে প্লাস্টিকের মানুষ তারা উপহার দিবে! প্লাস্টিক পণ্যের প্রসারে আমি, আপনি সবাই প্লাস্টিক ভাবাপন্ন হয়ে যাচ্ছি। প্লাস্টিকের প্যাকেট, ব্যাগ, বোতল, বালতি, ক্যান, কাপ, মগ, গ্লাস, স্ট্র ইত্যাদি নানান ধরনের নিত্য ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। শুধু তাই নয়। পানির ট্যাঙ্ক, দরজা, চেয়ার, টেবিলসহ ঘর সাজাতে প্লাস্টিকের রমরমা সমাহার। সুবিধাও অনেক। দামে সস্তা, ওজনে হাল্কা, মজবুত এবং পানিতে নষ্ট হয় না। রং মিশিয়ে যেমন খুশি তেমন আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়।

এতো সব প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে নির্বাচনী প্রার্থীরা শুধু প্লাস্টিক দিয়ে তাদের পোস্টারটা মুড়িয়েছে, আর কিছুই করেনি। তারা প্লাস্টিকের নতুন পণ্য আনেনি, প্লাস্টিকের গাছ, রাস্তা, ঘর-বাড়ি, স্কুল, কলেজ কিছুই বানায়নি। শুধু নিজেদের নির্বাচনী পোস্টারটা প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে সারা ঢাকাশহর ছেয়ে ফেলেছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ২০১৯ সালে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লেট, গ্লাস, কাপ, স্ট্র, বেলুন স্টিক, কটন বাড, চা-কফিতে চিনি বা দুধ মেশানোর দণ্ড ইত্যাদির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ২০২১ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা। জলাভূমি, সমুদ্র এবং উপকূল-সৈকতের দূষণ নিয়ন্ত্রণে একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তারা প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক দিকটা জেনেছে তাই এই পরিকল্পনা বা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা হয়তো জানি না! আর জানলেও আমরা নিতাম কিনা সন্দেহ। কারণ শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধিমালা কেউই মানছে না আর পরিবেশ দূষণ। লেমিনেটেড পোস্টার বা প্লাস্টিক মোড়ানো পোস্টার লাগানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট। সেই নিষেধাজ্ঞাটি দেওয়ার আগে যে পরিমাণ ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে।

পুরো ঢাকা শহরে যে পরিমাণ প্লাস্টিক মোড়ানো পোস্টার ঝুলানো হয়েছে সেই প্লাস্টিক মোড়ানো পোস্টারগুলো পুনঃ ব্যবহার বা রিসাইকেল বা ধ্বংস করার কোনো পরিকল্পনা কারো নেই। এমনকি সেই প্লাস্টিক মোড়ানো পোস্টারগুলো ধ্বংস করতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে তার অংকও বিশাল। সেই বিশাল অংকের টাকা আসলেই কে দিবে এইটা আমার জানার আগ্রহ।

পুরো পৃথিবী সভ্যতার শুরু থেকে অনেক এগিয়েছি। এই এগিয়ে যাওয়াটা উন্নতির। নির্বাচন একটি দেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই নির্বাচন প্রয়োজন। কিন্তু সেই নির্বাচন প্রচারণায় যেভাবে দূষণের সুবাতাস বইছে,এই সুবাতাস কি আরো দেশে বইছে? উন্নত দেশগুলো এতো বিশাল বিশাল সাউন্ডবক্স এনে বা প্লাস্টিক মোড়ানো পোস্টার দিয়ে পুরো শহর ছেয়ে ফেলে না। কিন্তু আমরা করছি, কারণ কী? কারণ হলো, আমরা একটু বেশি বেশি করতেই পছন্দ করি। এই বেশি করাটা সমর্থনযোগ্য, যদি একজন ব্যক্তি বিশেষে হয়, কিন্তু সেই বেশি করাটা যদি পুরো পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে অবশ্যই সেই বেশি করাটা বর্জন করা প্রয়োজন। না হয়, উচ্চশব্দে বধির হয়ে, দূষিত বাতাসে আগামী প্রজন্ম নিয়ে আমাদেরকেই দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এই দুর্ভোগ অন্য কারো নয়, আমার এবং আপনার দুর্ভোগ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক


ঢাকা/তারা