ঢাকা, সোমবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনা ভাইরাস নিয়ে গুজব এবং বাস্তবতা

শাহিদুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-০২ ৮:১৮:১৩ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১২ ১:১৪:১২ পিএম

করোনা ভাইরাস। এরইমধ্যে বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছে আতঙ্ক, উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠা। প্রতিনিয়ত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর হার। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী চীনের বাইরে ১৯টি দেশে শতাধিক মানুষের শরীরে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে। চীনে ইতোমধ্যেই দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এই ভাইরাসের কারণে এবং আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে।

পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এর আগে সোয়াইন ফ্লু, পোলিও, জিকা ভাইরাস এবং সর্বশেষ ইবোলা ভাইরাস মোকাবেলায় বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল ডব্লিউএইচও।

চীন এবং বর্হিবিশ্বের বিশেষজ্ঞরা রাত-দিন এক করে এই ভাইরাসের প্রতিষেধক ও বাহক খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তবে এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক কোনো খবর শোনা যায়নি। তবে বিশ্বের বেশ কয়েকজন গবেষক এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী করেছেন চীনকেই। তারা আঙুল তুলেছেন চীনের সামরিক গবেষকদের দিকে। তাদের অভিযোগ- চীন জীবাণু অস্ত্র বানাতে গিয়ে পৃথিবীর জন্য এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে এনেছে। বেশ কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত নানা তথ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। 

ইসরায়েলের একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারের বরাত দিয়ে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ চলতি সপ্তাহে দুটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে- এই ভাইরাসের জন্মদাতা উহানের ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ‘ডেইলি স্টার’ও একই ধরনের একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে চলতি সপ্তাহে। সেখানে বলা হয়েছে, গোপন জৈব রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কারখানায় এই ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছিল চীন। অসাবধানতাবশত সেই গবেষণাগার থেকেই ছড়িয়েছে ভাইরাসের সংক্রমণ। জৈব রাসায়নিক অস্ত্রের উপর গবেষণা করতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন চিনের বিজ্ঞানীরা। তবে এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের পর  প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসরাইল। তাছাড়া সংবাদ দুটির নির্ভরযোগ্য সূত্রও নেই।

আবার অনেকেই করোনা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য চীনাদের খাদ্যাভাসকেও দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও এই দাবি জোরাল করে তুলেছে। ভিডিওতে একজন চাইনিজ নারীকে পোড়ানো বাদুড় হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি বাদুড় খাওয়ার আগে এটি সুস্বাদু মুরগির মাংসের সঙ্গে তুলনা করছেন। ভিডিওটি যিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন তিনি ওই নারীকে চীনের উহান প্রদেশের বাসিন্দা বলে উল্লেখ করেছেন। ভিডিওটি দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক লোক তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

চীনারা পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা পোকামাকড়সহ পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের প্রাণির মাংস খায়। তাদের এই অদ্ভুত খাদ্যাভাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞরা নানা ধরনের মত দিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে সতর্কবার্তা শুনিয়ে আসছিল তাদের। তবে চীনাদের খাদ্যাভাস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও যে ভিডিওটি নিয়ে এত হইচই সেটি আসলে চীনে ধারণ করা নয়। ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র পালাউতে। ২০১৬ সালে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন জনপ্রিয় ফুড ব্লগার মেনজিয়ান অং। ইতোমধ্যে গুজব ছড়ানোর দায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ভিডিওটি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আর মেনজিয়ান অং তার এই ভিডিওর মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

তবে ভিডিওটি মিথ্যা হলেও চীনাদের খাদ্যাভাস নিয়ে যে বিতর্ক সেটি আরও একবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। কারণ করোনা ভাইরাস নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন- উহানের একটি ‘সি ফুড মার্কেট’ থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। উহানের এই বাজারটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রজাতির বিরল প্রাণি এবং সাপের মাংস বিক্রির জন্য কুখ্যাত। ফলে চাইনিজদের খাদ্য নিয়ে যে বৈশ্বিক বিতর্ক তা যে এত সহজে খারিজ হয়ে যাবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। এছাড়া করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে গোয়েন্দা কার্যক্রম তত্ত্ব, রোগ প্রতিরোধী ভাইরাস আবিষ্কার করতে গিয়ে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া তত্ত্বসহ নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অর্ন্তজালে ভেসে বেড়াচ্ছে। তবে এসব বিতর্ক চীন প্রথম থেকেই অস্বীকার করে আসছে। তাদের ভাষ্যমতে,  এটা দোষারোপ করা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সময় নয়। এখন বিশ্বের উচিত চীনকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস মোকাবেলায় সহায়তা করা।

করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি এর চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েও বিস্তর গুজবের ডালপালা মেলছে। ফিলিপাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একজন নাগরিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। পোস্টে তিনি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে গলা ভিজিয়ে রাখাসহ, মশলাযুক্ত খাদ্য এড়িয়ে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি খাওয়ার পরমর্শ দিয়েছেন। ‘ফর চেঞ্জ’ নামক একটি ফেইসবুক পেজ থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আইসক্রিম এবং দুগ্ধজাতীয় খাদ্য পরিহার করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুটি পোস্ট হাজার হাজার ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন। রীতিমতো পোস্ট দুটি ভাইরাল হয়েছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে এই ধরনের পরামর্শ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা ইতোমধ্যে এটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ডাব্লিউএইচও এক বার্তায় বিশ্ববাসীকে এসব গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সঠিক প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি অবলম্বনে


ঢাকা/তারা