ঢাকা, সোমবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৬, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধুর চীন সফর ও বাংলা ভাষায় বক্তৃতা

ইমাম মেহেদী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-০৫ ১:৪৭:১১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১২ ১:১৩:২৯ পিএম

হাজার বছরের বাঙালির মুখের ভাষা বাংলা। রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু ছাত্র রাজনীতির সময় থেকেই ভাষণ, নেতৃত্ব ও বাঙালির অধিকার আদায়ে বাংলা ভাষাতেই সোচ্চার ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি যখন অনুধাবন করলেন, বাঙালি অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখন থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে ভাষা ও স্বাধীকার আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। কলকাতা ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশেও তিনি বাংলায় বক্তৃতা, সভা ও সাংবাদিক সম্মেলন করতেন।

বাংলা ভাষাকে ‘অন্যতম রাষ্ট্রভাষা’র মর্যাদা দেয়ার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দামাল ছেলেরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল। দেশভাগ-পরবর্তী পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের প্রথম ভাষা হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার ন্যায্য সম্মান দিতে চায়নি। সেই বাংলা ভাষা আজ বাংলাদেশের বাইরেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জন করেছে। বাংলা এখন বিশ্বের তিনটি দেশের দাপ্তরিক ভাষা। বাংলাদেশ, ভারত ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে এখন দৈনন্দিন মৌখিক এবং কাগজে কলমে বাংলা ভাষা ব্যবহার হচ্ছে। তারপরই রয়েছে যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষার ব্যবহার। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সরকারিভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে সেখানে বাংলা ভাষাকে এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে বঙ্গবন্ধুর রয়েছে অসামান্য কৃতিত্ব। একথা আজ সবাই জানেন দেশ স্বাধীনের পর জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য ও মহত্তর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশন চলছিল। দিনটি ছিল ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। বঙ্গবন্ধুই প্রথম জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় সেদিন ৪৫ মিনিট বক্তৃতা দেন। বক্তৃতার পর ‘ডেলিগেট বুলেটিন’ বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ আখ্যায়িত করে। জাতিসংঘ বিবৃতি দেয়: ‘বক্তৃতায় ধ্বনিত হয়েছে মুজিবের মহৎকণ্ঠ’।

এরপর আরো অনেক দেশে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ১ অক্টোবর চীনের স্বাধীনতা দিবস। এ উপলক্ষে ১৯৫২ সালের ২-১২ অক্টোবর চীনে শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু আমন্ত্রতি হন। পূর্ববাংলা থেকে আতাউর রহমান খান, ‘ইত্তেফাক’ সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, ঊর্দু লেখক ইবনে হাসান ও বঙ্গবন্ধু চীনের শান্তি সম্মলনে যোগ দেন। বিশ্বের সাঁইত্রিশটি দেশের তিনশ আটাত্তরজন সদস্যের মাঝেও পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু সেদিন বাংলায় বক্তৃতা করে সবার দৃষ্টি কেড়েছিলেন। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ২২৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন:

‘...সাঁইত্রিশটা দেশের পতাকা উড়ছে। শান্তির কপোত এঁকে সমস্ত হল সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। প্রত্যেক টেবিলে হেডফোন আছে। আমরা পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা একপাশে বসেছি। বিভিন্ন দেশের নেতারা বক্তৃতা শুরু করলেন। প্রত্যেক দেশের একজন বা দুইজন সভাপতিত্ব করতেন। বক্তৃতা চলছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান খান ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করবো না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। পূর্ববাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। কিন্তু আমার মাতৃভাষায় বলাই কর্তব্য।’

সেসময় বঙ্গবন্ধু চীনে কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাত করেন।  পঞ্চাশের দশকে দুবার তিনি চীন গিয়েছিলেন। চীন সফরকালে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সাক্ষাতের সুযোগ পান। ঐসময় তিনি পূর্ববাংলার জনগণের মাতৃভাষা এবং ভৌগলিক বিষয়াদি নিয়েও আলোচনা করেন। এবং সদ্য স্বাধীন নয়া চীনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা নিগুঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। সদ্য একটি স্বাধীনদেশের মানুষের স্বাধীনতার স্বাদ তিনি উপলব্ধি করেন। এবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় গ্রন্থ ‘আমার দেখা নয়া চীন’ প্রকাশ করেছে। দেশটি সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন: ‘চীন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।’ তাঁর কথা আজ সত্য হয়েছে। 

বাংলা ভাষার আন্দোলন, ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর রয়েছে অসামান্য অবদানের ইতিহাস। যে ইতিহাস শুধু আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় না বরং উজ্জীবিত করে। বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে বঙ্গবন্ধুই প্রথম ব্যক্তি যিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মাথা উঁচু করে মাতৃভাষাকে তুলে ধরেছেন। ১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধুর চীনসফর ও বাংলায় বক্তৃতা তারই প্রমাণ। 
 

তথ্য সহায়ক:
০১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান
০২. আমার দেখা নয়া চীন, শেখ মুজিবুর রহমান

 

ঢাকা/তারা