ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ চৈত্র ১৪২৬, ৩১ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষা নিয়ে উদ্বেগ: নকল ও আসল

মোহাম্মদ আজম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৩ ১২:১৯:৫৪ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-২৩ ৮:১৯:২৪ এএম

ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষার হালচাল নিয়ে অনেককেই উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়- এটা খারাপ না। এই উদ্বেগের দরকার আছে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার বিপর্যস্ত অবস্থাটা খালি চোখে দেখা যায় না। কানে শুনেও মালুম হয় না। কারণ, এই জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে একভাষী। ফলে সর্বত্র বাংলা কথা শোনা যায়। কিন্তু ভাষার ব্যবহারের যেগুলো কার্যকর ও অভিজাত এলাকা- শিক্ষা, আইন ও অফিস আদালত- সেগুলোতে বাংলার অবস্থা এত শোচনীয় যে, উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। ফলে যাঁরা অন্তত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষার ব্যাপারে সচেতন হন, তাঁদের প্রশংসা করতে হয়।

আজকাল বাংলা ভাষাপ্রশ্নে সাধারণত দুই ধরনের উদ্বেগের কথা শোনা যায়। এক. ‘শুদ্ধ’ বাংলার চর্চা বেশ কমে গেছে। বিশেষত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা লেখেন, তাঁদের ভাষায় সচেতনতা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। দুই. লোকে ইংরেজি ব্যবহার করতে পছন্দ করে; এমনকি বাংলা বলার সময়েও দেদার ইংরেজি শব্দ মেশায়। আমরা এ লেখায় প্রস্তাব করছি, এই উদ্বেগ ‘নকল’ উদ্বেগ। অন্তত কাজের উদ্বেগ নয়।

‘নকল’ বলার মূল কারণ, এ দুটোই আসলে আমাদের ভাষা-ব্যবহারের অন্য দশ কর্মকাণ্ডের ফল মাত্র। ফলে ওই কর্মকাণ্ডের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ না করে ‘ভাষাদূষণ’ ও ‘ভাষা-মিশ্রণ’ নিয়ে যদি কথা বলা হয়, এবং একেই যদি দায়িত্ব-পালন ভাবা হয়, তাহলে তাকে নকল না বলে উপায় নাই।

লোকে সামাজিক ব্যবহারে কোন ভাষায় অভ্যস্ত হবে তা নির্ভর করে প্রধানত শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে সে কোন ভাষা পড়ছে তার উপর। প্রথম ভাষা মানুষ শেখে অসচেতনভাবে, বেড়ে ওঠার অংশ হিসাবে। ওই ভাষায় পড়াশোনা যখন শুরু হয়, তখন সে ভাষাটির ব্যাপারে সচেতন হয়। বলা যায়, ভাষাটি সে লেখার ভাষা হিসাবে সচেতনভাবে রপ্ত করতে থাকে। পড়াশোনার ভাষা যেখানে বাংলা নয়, সেখানে লিখিত ভাষায় কেউ একজন পারঙ্গমতা দেখাবে, এমন চিন্তা হাস্যকর। তদুপরি সমাজে একথা জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত আছে যে, বাংলা ভাষা অন্য কোনো কাজে তো নয়ই, এমনকি শিক্ষার কাজেও অপারগ।

এমতাবস্থায় লোকে যদি ইংরেজি রপ্ত করার চেষ্টা করে, আর কথাবার্তা সে ভাষাতেই বলতে চায়, তাহলে তাকে দোষ দেয়া যায় না। এরকম পরিস্থিতিতে যে ভাষা-মিশ্রণ খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে, দুনিয়ার সর্বত্র ভাষাশাস্ত্রীরা তা বাস্তব তথ্য-উপাত্ত থেকে বহুবার দেখিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে বাংলা ভাষার যে দুই সমস্যা নিয়ে আমাদের ভদ্রলোকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তা আসলে অন্য অবস্থার স্বাভাবিক ফল। যদি তাঁদের উদ্বেগ আসল হতো, তাহলে তাঁরা কথা বলতেন শিক্ষার ভাষা নিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক নানা কাজে ভাষা-ব্যবহারের বাস্তবতা ও ফল নিয়ে। তা না করায় তাঁদের উদ্বেগ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।

প্রশ্ন হলো, লোকে এই অকাজের উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন? প্রথম কারণ অজ্ঞতা। ভাষা যে বদলে যায়, আর নতুন রূপগুলো খুব ধীরে-সুস্থে মানভাষায় স্থান করে নিতে থাকে, অধিকাংশ মানুষ সে হদিশ রাখে না। সে ছোটবেলায় ভাষার যে রূপে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল তাকেই চিরন্তন রূপ মনে করে। ফলে উদ্বিগ্ন হয়। একে এক ধরনের অজ্ঞতাই বলতে হবে। অন্যদিকে, ভাষা-মিশ্রণকে লোকে খারাপ চোখে দেখে এ চিন্তা থেকে যে, ভাষার একটি ‘শুদ্ধ’ রূপ আছে, আর মিশ্রণের ফলে ওই শুদ্ধরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাষার এই শুদ্ধতার ধারণাও একটা কুসংস্কার। আদতে কোনো ভাষাই শুদ্ধ নয়, অশুদ্ধও নয়। ভাষামাত্রই মিশ্র। ফলে ভাষামিশ্রণ ভাষার অস্তিত্বের মতো স্বাভাবিক ঘটনা। বাংলায় ইংরেজি বেশি মিশছে বাংলাদেশের বিশেষ ভাষা-পরিস্থিতির কারণে, যে কথা আগেই বলেছি। মুখের ভাষা নিয়ে উদ্বেগ অকারণ ও অর্থহীন। এদিকটা দুনিয়ার যে কোনো ভাষার ক্ষেত্রেই খাটে- কোথাও কম কোথাও বেশি। বাংলাদেশের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাংলা নিয়ে অকাজের উদ্বেগ প্রকাশের আরেকটি বড় কারণ আছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল ভাষার নামে। যে রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার কারণে বহুলোক করে-টরে খেতে পারছে, বাড়তি রোজগারে ভর করে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ‘উন্নত বিশ্বে’ গড়ে নিতে পারছে, সে দেশটি গঠিত হয়েছিল বাংলা ভাষার নামে- এ সত্য নিশ্চয়ই অনেককে আকুল করে। এ কারণে বছরের অন্তত কয়েকটা দিন তারা বাংলা ভাষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার জোর তাগিদ বোধ করে। এগুলো নকল উদ্বেগ তো বটেই।

তাহলে আসল উদ্বেগ কোনটা? ভাষা সম্পর্কে প্রকৃত উদ্বেগ ও তৎপরতা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত; রাষ্ট্রের সাথে জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের সাথে যুক্ত; জনসাধাণের ভবিষ্যৎ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সাথে যুক্ত। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা নিয়ে কাজের আলাপ যে এখনো শুরুই হয়নি, তার কারণ, আমরা রাষ্ট্রগড়ার আলাপটা এ পর্যায়ে উন্নীত করতে পারিনি। কথাটা উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। আমরা যে বাংলাদেশে ইংরেজি নিয়ে পরম আবেগ বোধ করি তার অন্তর্গত কারণ যাই হোক প্রকাশ্য প্রধান যুক্তিটি তো উন্নয়ন বা উন্নতি। কিন্তু দুনিয়ায় এমন দেশ তো একটাও নাই, যাদেরকে লোকে উন্নত দেশ বা জনগোষ্ঠী নামে চেনে, এবং তারা উন্নতিটা করেছে দ্বিতীয় ভাষা ব্যবহার করে। অন্য দেশের কথা তুলে লাভ নাই।

আমাদের বহু পরে উন্নয়নের দৌড়ে শামিল হয়ে যারা আমাদেরকে ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেল, সেই ভিয়েতনাম-লাওসের উদাহরণই নেয়া যাক। এরা তো নিজেদের শিক্ষা বা অফিস-আদালতের কাজে নিজেদের ঔপনিবেশিক ভাষা ফরাসি বা দুনিয়ার প্রধান ভাষা ইংরেজি ব্যবহার করেনি। তাদের নিজেদের ভাষার শিক্ষা তো তাদের দেশের উন্নয়নও ঠেকাচ্ছে না, আবার বিদেশে মর্যাদার সাথে ব্যাপক হারে অভিবাসী হওয়াও ঠেকাচ্ছে না। যে ভাষা দরকারে শেখার প্রয়োজন হচ্ছে, তা সে ইংরেজিই হোক আর অন্য যে ভাষাই হোক, তা তারা পদ্ধতিমাফিক শিখে নিচ্ছে। তাহলে আমাদের এখানে এমন গীত কিভাবে এত জনপ্রিয় হলো, যা দুনিয়ার কোথাও নেই?

এ ব্যাপার নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াই আসলে বাংলা ভাষা নিয়ে প্রকৃত উদ্বেগ। যদি রাষ্ট্র গঠন করতে হয়, যদি জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিত শিক্ষার মধ্য দিয়ে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে হয়- বিস্তর টাকা খরচ করে যাদের ইংরেজি শেখার ক্ষমতা আছে কেবল তাদের নয়, দেশের সমস্ত মানুষের, যদি বিদেশে সন্তানদের পাঠিয়ে ‘সেটেল্ড’ করাই জীবনের পরম লক্ষ্য না হয়ে ‘শিক্ষা’টা লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তাহলে আলাপ শুরু হবে বাংলা ভাষা নিয়ে। ওই ধরনের পরিকল্পনা গৃহীত হলেই কেবল বাংলা ভাষা নিয়ে উপযোগিতামূলক কার্যকর ডিসকোর্স গড়ে উঠবে। তখন আমরা বুঝতে পারব, ভাষার শুদ্ধতা-রক্ষা এবং ভাষা-মিশ্রণের আলাপ কেবল উপরিতলের ফেনাই নয়, বিনোদনমূলক ফানি আলাপও বটে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


ঢাকা/তারা/নাসিম