ঢাকা, শনিবার, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৬ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করতে মসজিদের মাইক ব্যবহার   

কাজী জা‌হিদুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-৩১ ২:২২:৩০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০১ ১:১৪:১৫ এএম

করোনাভাইরাস বা কোভিড -১৯ এই সময়ে সমগ্র বিশ্বে সবচেয়ে বড়ো আতঙ্কের নাম৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষের মধ্যে মৃত্যুভয় জাগিয়ে তুলেছে এই রোগ৷ ইতোমধ্যে দুইশতাধিক দেশ ও অঞ্চলের আট লক্ষাধিক মানুষ এ রোগে আক্রান্ত৷ মৃত্যুবরণ করেছে আটত্রিশ হাজারের অধিক৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও নগর প্রধানরা রাষ্ট্র/নগর লকডাউন ঘোষণা করে জনগণকে করোনাভাইরাসের কবল থেকে রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন৷ কোনো কোনো শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস তার ভয়াল থাবা বিস্তার করেছে৷ সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৩১শে মার্চ ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫১জন৷।

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে এবং করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে৷ করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুকি থেকে রক্ষা পেতে মানুষকে ঘরে থাকতে আহ্বান জানানো হয়েছে৷ এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস ছুটি ঘোষণা করে সব ধরনের গণপরিবহণ বন্ধ রাখাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে৷ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সারাদেশে সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা করছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা৷ সরকারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য মানুষকে সচেতন করা যাতে তারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেকে সুরক্ষা করতে পারে৷ দেশের সকল প্রিন্টমিডিয়া, ইলেক্ট্রনিকমিডিয়া এবং সোশ্যালমিডিয়ায় প্রতিনিয়ত করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে আমাদের করণীয় সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চলছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল সচেতনতামূলক আলাদা অনুষ্ঠান প্রচার করছে। পত্র-পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন এ-বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের লেখা নিবন্ধ প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও মানুষের মধ্যে কতটা সচেতনতাবোধ তৈরি হয়েছে? এটা ঠিক যে, সারদেশে মানুষের মধ্যে এই রোগ নিয়ে একধরনের চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। কিন্তু মানুষ যতটা আতঙ্কিত ততটা সচেতনতা মানুষের মধ্যে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছ না৷ তাই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে করণীয় সম্পর্কে দেশের জনসাধারণকে আরো সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

বাংলাদেশে আড়াই লক্ষাধিক সমজিদ রয়েছে৷ যেখান থেকে প্রতিদিন পাঁচবার মাইকে আজান প্রচার করা হয়৷ সারাদেশে মসজিদগুলোর অবস্থান এমন যে এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদের আজান শোনা যায়৷ অর্থাৎ সারা বাংলাদেশ এই মসজিদগুলোর মাইকের আওতার মধ্যে৷ করোনাভাইরাস সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য মসজিদের মাইকগুলো ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন মসজিদের ইমামদের জন্য এ-সম্পর্কিত একটি নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন৷ যেমন : করোনাভাইরাস রোধে বাড়িতে কী কী করতে হবে, হোমকোয়ারেন্টাইন কী?

হোমকোয়ারেন্টাইনে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, কীভাবে হাঁচি-কাশির নিয়ম মেনে চলতে হবে, সোশ্যাল ডিসটেন্স কী ইত্যাদি। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবার আজানের পূর্বে বা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর মাইকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের করণীয় সম্পর্কে এবং দুস্থ-অসহায়দের সাহাযার্থে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাবেন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনগণ। যদিও সোশ্যালমিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্টমিডিয়ায় সচেতনতামুলক নানারকম প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে৷ এমনকি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও হ্যান্ডমাইকের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করে চলছে৷  বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানিও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করছে৷ প্রচার-প্রচারণার কাজে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে৷ এগুলোর পাশাপাশি সারাদেশের মসজিদের মাইকগুলো ব্যবহার করে পাঁচলক্ষাধিক ইমাম ও মুয়াজ্জিনের মাধ্যমে বিনা খরচে আরো তাড়াতাড়ি এবং একই সময়ে সারাদেশের মানুষের কাছে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব৷ আর একটি বিষয়, আমরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার ক্ষেত্রে এমন সব শব্দ ব্যবহার  করছি যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝতে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে৷ হোম কোয়ারেন্টাইন কী এবং কীভাবে করছে তা দেখতে মানুষের ভিড় লেগে যাওয়ার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে৷ সোশ্যাল ডিসটেন্স কী তা এখনো অনেকেই বুঝতে পারছেন না৷ প্রচার-প্রচারণার  প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, হ্যান্ডস্যানিটাইজার ইত্যাদি শব্দ বারবার দেখে এবং শুনে অনেকেরই হয়তো শিবরাম চক্রবর্তীর বিখ্যাত গল্প 'গুরুচণ্ডালী'র কথা মনে পড়ে যাচ্ছে৷ ‘পণ্ডিত সীতানাথবাবু তাঁর ছাত্রদের বুঝাতে চেষ্টা করে ছিলেন ভাষা ব্যবহারের সময় সাধুভাষা ও কথ্যভাষার মিশ্রণের অর্থাৎ গুরুচণ্ডালীর দোষ  সম্পর্কে৷ তিনি গুরুচণ্ডালী দোষ একদম সহ্য করতে পারতেন না৷ তাই ছাত্ররা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকত৷ পারতপক্ষে পণ্ডিত মশাইয়ের ধারে কাছে আসত না৷ তো একদিন গণেশ নামের একজন ছাত্র সরকারি রেশনের দোকানে এসে দেখল রেশনের জন্য এক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন পণ্ডিত মশাই৷ গণেশও লাইনে দাঁড়াল অনেকটা পিছনে৷  সে দেখল যে এক পকেটমার পণ্ডিত মশাইয়ের পকেট মেরে নিচ্ছে৷ তা দেখে গণেশ চিৎকার করে সাধু ভাষায় বলে উঠে,' স্যার স্যার! ব্যগ্র হোন কল্য! ব্যগ্র হোন কল্য৷' ভাষা শুদ্ধ না-হওয়ায় পণ্ডিত মশাই কোনোকিছু বুঝতে পারেননি৷ এদিকে পকেটমার চম্পট দিয়েছে৷ ততক্ষণে গণেশ সামনে এসে বলল যে গুরু মশেইয়ের সামনে পকেট মারছে উচ্চারণ করলে গুরুচণ্ডালী হবে ভেবে সে ওভাবে সাবধান করেছিল৷ কিন্তু গুরু মশাই সেটা বুঝতে পারলেন না৷

করোনাভাইরাস সম্পর্কে যে সকল বিশিষ্টজন বিভিন্ন মিডিয়াতে কথা বলছেন বা লিখছেন তাঁরা যে খুব কঠিন ভাষায় বা দুর্বোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করছেন তা কিন্তু নয়৷ বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞগণ অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং প্রমিত ভাষায় উপস্থাপন করছেন৷ লিখিত বা আনুষ্ঠানিক ভাষা এমন শুদ্ধ এবং প্রমিত হওয়াটাই বাঞ্চনীয়৷ কিন্তু জনমানুষের ভাষা বলেও তো একটা কথা আছে৷ যে ভাষা দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো সম্ভব৷ যেমনট আমরা দেখি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে৷

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহৃত ভাষার ভিন্নতা  রয়েছে৷ তাই যার যার অঞ্চলের ভাষায় করোনা সম্পর্কিত সতর্কবার্তা যদি তাদের জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় তা অধিক কার্যকর হবে বলে মনে করি৷ তাছাড়া রোগটা নতুন৷ আগে এ সম্পর্কিত কোনো ধারণাই আমাদের ছিল না৷ এ রোগের কারণে অনেকগুলো নতুন নতুন শব্দ আমাদের সামনে এসেছে৷ হয়তো আরও আসবে৷ আস্তে আস্তে এসব শব্দের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়ে যাবো। একদিন হয়তো এ সব শব্দের পরিভাষাও তৈরি হবে৷ কিন্তু তার আগে আমাদের এই মুহূর্তে দরকার জনগণকে এ রোগ থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে সচেতন করা৷ আর এ কাজে সারাদেশের সমজিদের মাইক ব্যবহার করে  ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের দিয়ে বারবার সচেতনতামূলক ঘোষণা দিলে কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে৷

মনে রাখতে হবে করোনার ঝুকিতে শুধু শহরের এবং শিক্ষিত মানুষেরা নন৷ দেশের সর্বস্তরের মানুষ৷ কাজেই প্রচার-প্রচারনার কাজে এমন শব্দ ব্যবহার করতে হবে যা সবাই সহজেই বুঝতে পারে৷ সাধারণ মানুষের কাছে তাদের উপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উপযোগী করে আলাদা আলাদা ভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে৷ ফলে সমাজের সবস্তরের মানুষ সহজেই বুঝতে পারে কী কী করতে হবে এবং কী কী করা যাবে না৷ আর সেটা মসজিদের ইমাম সাহেবদের দিয়ে  খুব সহজেই সম্ভব৷ কারণ ইমাম সাহেবরা নিজ নিজ এলাকার মানুষের উপযোগী ভাষায় প্রতিনিয়ত তাদের সামনে কথা বলেন৷

আরেকটি বিষয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান, খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ, সাধারণ জনগণ যখন করোনা প্রতিরোধের জন্য একযোগে কাজ করছে, তখন বাংলাদেশে একটি মহল নানা ধরনের মিথ্যা-বানোয়াট-আজগুবি তথ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। যা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে বড়ো বাধা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ গুজব ছড়ানো হচ্ছে ধর্মের নামে। এ গুজবে যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হয় সে জন্যও সারেদেশে পাঁচ লক্ষাধিক ইমাম এবং মুয়াজ্জিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। আর সেটা সম্ভব মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বারবার সঠিক ও সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের মাধ্যমে। আশা করি যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভেবে দেখবেন৷


ঢাকা/তারা